সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হামলা © সংগৃহীত
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। শনিবার রিয়াদ ও লোহিত সাগরের উপকূলে সৌদি জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রিয়াদ লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ধ্বংস করেছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ রাজধানীতে আর কোনো হামলা বা হতাহতের খবর নিশ্চিত করেনি। তবে শনিবার রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি জ্বালানি ট্যাংক থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। এ ঘটনায় কিছু সময়ের জন্য বিমান চলাচল ব্যাহত হয়।
জুলাইয়ে হুতিদের সৌদি আরববিরোধী হামলা বাড়ার পর শনিবার প্রথমবারের মতো রিয়াদে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজে। পরে সৌদি সিভিল ডিফেন্স রিয়াদসহ কয়েকটি অঞ্চলের বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠায়। শনিবার সকালে সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া আল-সারিয়া অনলাইনে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, রিয়াদের ‘গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা’ এবং লোহিত সাগরের উপকূলীয় শহর ইয়ানবুতে রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস কোম্পানি আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করে ‘বিপুলসংখ্যক ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন’ ব্যবহার করা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, ইয়েমেনের রাজধানী সানায় সৌদি আরবের ‘অপরাধমূলক হামলার প্রচেষ্টার’ জবাবে এসব হামলা চালানো হয়েছে। সানা বর্তমানে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর আগে আল-সারিয়া অভিযোগ করেছিলেন, গত এক সপ্তাহে সৌদি আরব ইয়েমেনজুড়ে ৩০০টি হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিশ, তায়েফ, ফারাসান ও ইয়ানবু শহরে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে চালানো ‘শত্রুতামূলক হামলার চেষ্টা’ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঠেকিয়ে দিয়েছে।
রিয়াদে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। সম্ভাব্য ফ্লাইট বাতিল ও অন্যান্য ভ্রমণ বিঘ্নের জন্য প্রস্তুত থাকতেও বলেছে তারা।
এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, ‘ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে, বেসামরিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছে। এই সামরিক সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মার্কিন নাগরিকদের ‘এই অঞ্চলে এবং এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে ভ্রমণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পুনর্বিবেচনা করা উচিত’।
শনিবার সকালে রিয়াদে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট বিলম্ব ও বাতিলের খবরও পাওয়া যায়। ফ্লাইট চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪ এ তথ্য জানিয়েছে।
এএফপির এক সাংবাদিক জানান, আরামকোর একটি পুড়ে যাওয়া জ্বালানি ট্যাংকের আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে দমকলকর্মীদের দেখা গেছে। রিয়াদের কয়েকজন বাসিন্দাও বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন।
রিয়াদের উত্তরের এক ২৭ বছর বয়সী বাসিন্দা বলেন, ‘আমি সতর্কসংকেত শুনেছি, এরপর আমার জানালাগুলো কেঁপে ওঠে। এটি সত্যিই ভয়ংকর ছিল। আমি এমনটা আশা করিনি।’
হুতিরা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে গৃহযুদ্ধে জড়িত। সৌদি আরব ওই সরকারকে সমর্থন করছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি আরবের ভেতরে বেশ কয়েকটি হামলার দায়ও স্বীকার করেছে হুতিরা। চলতি সপ্তাহে ইয়েমেনের আকাশে একটি সৌদি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবিও করেছে তারা।
এএফপির এক অসমর্থিত প্রতিবেদনে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে জড়িত দুই পক্ষের সামরিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, শনিবার হুতি ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর লড়াইয়ে ৪৮ জন নিহত হয়েছেন। হুতিরা জানিয়েছে, তাদের ৩১ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে সরকারি বাহিনীর সূত্রের দাবি, তাদের ১৭ সেনা নিহত হয়েছেন।
শুক্রবার জাতিসংঘের সংস্থা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৪ হাজার ৭৯৬ ছাড়িয়েছে।
সম্প্রতি হুতিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা ও পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এসব এলাকা উপসাগরীয় দেশগুলোর এশিয়া ও ইউরোপে পণ্য রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের প্রবেশদ্বার।
হুতিরা জানিয়েছে, সৌদি আরব হুতিদের নিয়ন্ত্রিত উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনের বন্দর ও বিমানবন্দরে অবরোধ আরোপ করায় তার জবাবে তারা নৌ অবরোধ চালু করেছে।
ইরান ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি জাহাজগুলো তেল রপ্তানির জন্য লোহিত সাগরের এই নৌপথের ওপর নির্ভর করছে।
এদিকে, বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধের কারণে তেলের দামের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা অনুমান করতে তারা হিমশিম খাচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের দেওয়া এক বিরল নোটে ব্যাংকটি বলেছে, ‘এই সংঘাতের শেষ পরিণতি কী হবে, তা কীভাবে হিসাব করব, আমরা সত্যিই জানি না।’