ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প

‘আমাকে এখানে রেখে যেও না’— বাবার সেই আর্তনাদের ২০ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার করল ছেলে

০৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৮ AM
উদ্ধার হওয়া বাবা ও পাশে ছেলে

উদ্ধার হওয়া বাবা ও পাশে ছেলে © সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পগুলোর একটিতে মুহূর্তেই ধসে পড়ে ১১ তলা একটি আবাসিক ভবন। ধ্বংসস্তূপের নিচে দুই শিশুসন্তানসহ আটকে পড়েন এক বাবা। অনিশ্চিত সেই মুহূর্তে সাবেক দমকলকর্মী বড় ছেলে উদ্ধার অভিযানে নেমে টানা ২০ ঘণ্টার বেশি চেষ্টা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত বাবা ও দুই ভাইকে জীবিত উদ্ধার করেন। তবে এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচেই নিখোঁজ রয়েছেন ওই ব্যক্তির স্ত্রী।

গত ২৪ জুন সন্ধ্যায় ভেনেজুয়েলার উপকূলীয় শহর লা গুইরার সমুদ্রতীরবর্তী উপশহর কারাবায়েদায় নিজের পরিবারের সঙ্গে বাসায় ছিলেন ৪৬ বছর বয়সী গাড়ি মেকানিক হোসে গার্সিয়া। স্ত্রী ও দুই ছোট ছেলে ৭ বছর বয়সী দিয়েগো এবং ১২ বছর বয়সী সান্তিয়াগোকে নিয়ে তারা ১১ তলা রিতাসোল প্যালেস ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন।

স্থানীয় সময় সন্ধ্যা প্রায় ৬টা ৪ মিনিটে উপকূলজুড়ে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আরও শক্তিশালী আরেকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। মুহূর্তের মধ্যে কংক্রিট ও কাচে নির্মিত পুরো ভবনটি ধসে পড়ে।

ভবন ধসে পড়ার পর হোসে গার্সিয়া বুঝতে পারেন, তিনি আর দ্বিতীয় তলায় নেই; বরং ধ্বংসস্তূপের নিচে ভবনের বেজমেন্টে চাপা পড়ে আছেন। তার পাশেই আটকে ছিল দুই ছোট ছেলে।

হোসে বলেন, ‘এভাবে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়ার চেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আর কিছু হতে পারে না।’ তবে সেই দুঃসময়ে তাদের জীবনে আশার আলো হয়ে আসেন হোসের বড় ছেলে, ২৬ বছর বয়সী হেসুস গার্সিয়া।

চোখে অশ্রু নিয়ে হোসে বলেন, ‘এই যে আমার বড় ছেলে। সেও একজন নায়ক। সে-ই আমাকে উদ্ধার করেছে।’

হেসুস গার্সিয়া একসময় লা গুইরার দমকল বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। ভূমিকম্পের আগেই তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবে তার এক সাবেক সহকর্মী ও পারিবারিক বন্ধু জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য তার পুরোনো হেলমেট ও ফায়ারফাইটিং জ্যাকেট সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। ভূমিকম্পের রাতে সেই সরঞ্জামই কাজে লাগে।

পরিবারের সদস্যরা বেঁচে আছেন নাকি ধ্বংসস্তূপে মারা গেছেন— কিছুই না জেনেই তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান।

রবিবার পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৪২ জন। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মরদেহ চাপা পড়ে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ঘটনাস্থলে পৌঁছে হেসুস প্রথমে তার দমকলকর্মী বন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। তখন রিতাসোল প্যালেস ভবনের জায়গাজুড়ে ছিল কেবল ভাঙা কংক্রিটের স্তূপ, বাঁকানো লোহার রড, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আসবাবপত্র এবং ভবনের দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ।

হেসুস বলেন, ‘আমি পৌঁছানোর পর আমার বন্ধু আমাকে বলল, ‘বন্ধু, তোমার বাবা বেঁচে আছেন। তিনি দুই ছেলেকে নিয়ে নিচে আটকে আছেন।’

প্রথমে তিনি কথাটি বিশ্বাস করতে পারেননি। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বাবার কণ্ঠ শুনতে পান।

হোসে তখন চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আমাকে এখানে ফেলে যেও না।’

জবাবে হেসুস বলেন, ‘আমার ওপর ভরসা রাখুন। শান্ত থাকুন। বাচ্চাদেরও শান্ত রাখুন। আপনাদের ছাড়া আমি এখান থেকে যাব না।’

তখন পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিলেন হোসে। যদিও তিনি ও দুই ছেলে তুলনামূলক কম আহত হয়েছিলেন, তবু যে কোনো সময় ধ্বংসস্তূপ সরে গিয়ে তাদের চাপা পড়ার আশঙ্কা ছিল।

আরও পড়ুন: ‘এক দল আল্লাহর পথে, অন্য দল কাফের’— এই আয়াতের মাধ্যমে সৌদিকে কী বার্তা দিল ইরান?

হোসে বলেন, ‘প্রথমেই আমার সন্তানদের কথা মনে হয়েছিল। ছোট ছেলেটি আমার বুকের কাছে ছিল। আর বড় ছেলেটি পাশে চাপা পড়ে ছিল। আমি তার মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। শুধু একটি হাত আর একটি পা দেখতে পাচ্ছিলাম।’

নিজে আতঙ্কিত হলেও সন্তানদের সাহস জোগানোর চেষ্টা করেন তিনি। এ সময় বাইরে থেকে উদ্ধারকর্মীদের কণ্ঠ ভেসে আসে। তাদের মধ্যে ছিলেন হেসুসের সেই দমকলকর্মী বন্ধু। তিনি জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলেন এবং সঙ্গে করে হেসুসের পুরোনো উদ্ধার সরঞ্জামও নিয়ে এসেছিলেন।

বাবা ও দুই ভাই জীবিত আছেন নিশ্চিত হওয়ার পর হেসুস মরিয়া হয়ে তাদের বের করার চেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু দ্রুতই বুঝতে পারেন, ধ্বংসস্তূপ ভেদ করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্যাকহ্যামার ছাড়া উদ্ধার সম্ভব নয়। তাই সূর্য ওঠা এবং বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

পরদিন সকালে পুলিশের বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরে লা গুইরার দমকল বাহিনীর সদস্যরাও তাদের সাবেক সহকর্মীকে সহায়তা করতে যোগ দেন।

অবশেষে ২৫ জুন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে, অর্থাৎ ভূমিকম্পের ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় পর হেসুস ও উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপ থেকে হোসে এবং তার দুই ছোট ছেলেকে জীবিত উদ্ধার করেন। উদ্ধারের পর দুই ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরেন হেসুস।

তিনি বলেন, ‘ওদের দেখে আমি জড়িয়ে ধরি, চুমু দিই এবং বলি আমি তোমাদের ভালোবাসি। এরপর কিছুক্ষণ দূরে গিয়ে কেঁদে ফেলি।’

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেও এখনও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন হোসে গার্সিয়া।

তিনি বলেন, ‘জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি কৃতজ্ঞ থাকব। শুধু আমি নই, আমার দুই ছোট সন্তানও নতুন জীবন পেয়েছে।’ তবে অলৌকিক এই উদ্ধারের মাঝেও রয়ে গেছে গভীর বেদনা। ভূমিকম্পের ১১ দিন পরও তার স্ত্রী ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন।
তবুও আশা ছাড়েননি হোসে।

তিনি বলেন, ‘যেভাবে বিশ্বাস করেছিলাম আমি ও আমার সন্তানরা জীবিত বের হতে পারব, এখনও তেমনি বিশ্বাস করি আমার স্ত্রীকেও জীবিত পাওয়া যাবে।’

হোসের পরিবারের মতো হাজারো পরিবার এই দুর্যোগে বিপর্যস্ত হয়েছে। গত দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

রিতাসোল প্যালেস থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে নিজের ধসে পড়া ভবনের সামনে রাস্তায় রাত কাটাচ্ছেন আন্দ্রেইনা রে।

ভূমিকম্পের সময় তিনি জীবিকার তাগিদে প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়ার একটি কয়লাখনিতে রাঁধুনির কাজ করছিলেন। সেখানে থেকে তিনি ভেনেজুয়েলায় থাকা নিজের মেয়ে ও পরিবারের খরচ চালাতেন।

দুর্যোগের খবর পেয়ে দ্রুত দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু এসে জানতে পারেন, তার পরিবারের সবাই নিখোঁজ।

তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে, দুই নাতি-নাতনি, মেয়ের শ্বশুর, শাশুড়ি ও দেবর সবাই ওই ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছে।’ ঘটনার কয়েক দিন পরই ছিল তার মেয়ের ২০তম জন্মদিন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় একটি কেকে মোমবাতি জ্বালান তিনি। এরপর কান্নায় ভেঙে পড়েন।

আন্দ্রেইনা বলেন, ‘আমি আমার পুরো পরিবারকে হারিয়েছি। এখন এখানে আমার জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।’

ভেনেজুয়েলা সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে অন্তত ৮৫৬টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৯০টি ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে। তবে স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করে কিছু সংস্থা ধারণা করছে, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট ভেনেজুয়েলার জন্য নজিরবিহীন। হাজার হাজার মানুষ ঘরে ফিরতে পারছেন না এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

রাজধানী কারাকাসে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের মানসিক চিকিৎসা দেওয়া মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জান কস্তা বলেন, ‘মানুষের ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’

তার মতে, এই মানবিক বিপর্যয়ের পর মানুষের কষ্ট আরও বেড়েছে সরকারের দুর্বল সাড়া দেওয়ার কারণে।

সমালোচকদের অভিযোগ, সরকার দুর্যোগ মোকাবিলায় ধীরগতিতে কাজ করেছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছাতেও বাধা সৃষ্টি হয়েছে।

জান কস্তা বলেন, ‘এত বড় সংকটের সময় সরকারের কার্যকর উপস্থিতি না থাকায় মানুষ আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে।’

এদিকে ধসে পড়া রিতাসোল প্যালেস ভবনের পাশে প্রতিদিন অপেক্ষা করেন হোসে গার্সিয়া। আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো এখনও ধ্বংসস্তূপে মরদেহের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকা হোসে বলেন, ‘আমাদের আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু এর মূল্য কত হবে, আমাদের জীবনে এর প্রভাব কতটা গভীর হবে তা আমরা এখনও জানি না।’ তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

বুড়ো রোনালদোর ভেলকি নাকি ইয়ামালের ড্রিবলিং: কার ম্যাজিকে কা…
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
প্রধানমন্ত্রীর গুলশানের বাসভবনকে কেপিআই ঘোষণা
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
দেশে সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হবে শিক্ষা মেলা, থাকছে তিন শর্ত
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
বর্ণিল আয়োজনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিক…
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান জাবি শিক্ষার্থী মিফতাহুল, প্রয়োজন…
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
মেসিদের সামনে এবার ফারাওদের প্রাচীর: কতটা প্রস্তুত সালাহর ম…
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence