আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা শুরুর দিনে গ্র্যান্ড মোসাল্লায় শোকাহতদের সমাবেত © সংগৃহীত
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায়কে কেন্দ্র করে রাজধানী তেহরানে নজিরবিহীন প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, আগামী কয়েক দিনের শোকানুষ্ঠানে শুধু তেহরানেই এক কোটি ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষের অংশগ্রহণ হতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি ও নেতারাও এই অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান নয়, বরং ইরানের জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক অবস্থান প্রদর্শনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। ১৯৮৯ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাড়ে তিন দশক ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ৮৬ বছর বয়সী আলী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রথম দিন নিহত হন। তাকে স্মরণে ছয় দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত তার মরদেহ তেহরানে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। এরপর সোমবার শোক মিছিল রাজধানী তেহরান অতিক্রম করবে। মঙ্গলবার মরদেহ নেওয়া হবে ধর্মীয় নগরী কুমে। পরে বুধবার প্রতিবেশী ইরাকের শিয়া ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র শহর কারবালা ও নাজাফে নেওয়ার পর বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্মস্থান মাশহাদে তাকে দাফন করা হবে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির একাধিক প্রতিবেদক জানান, গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে খামেনির কফিন গ্রহণের অপেক্ষায় হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছেন। তাদের অনেকের হাতে ছিল প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত লাল পতাকা। এ সময় সেখানে ‘আমেরিকার মৃত্যু’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান ধ্বনিত হয়। অনেকে কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই শত শত মানুষ সেখানে অবস্থান নেন।
অপেক্ষমাণ এক শোকাহত নারী সোমাইয়ে হামেদি বলেন, ‘আমরা আমাদের নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে এসেছি। তাই এতক্ষণ অপেক্ষা করাও আমাদের কাছে কষ্টকর বা কঠিন মনে হচ্ছে না।’
শোকানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল সীমিত করা হয়েছে, বিভিন্ন এলাকা অবরুদ্ধ রাখা হয়েছে এবং আকাশসীমায় সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির দাফনের পর এটিই ইরানের সবচেয়ে বড় জনসমাগমের অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হওয়ার পূর্বাভাস থাকায় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের স্বস্তি দিতে বিভিন্ন সড়কে পানিবাহী ট্যাংকার থেকে পানি ছিটানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে। অতীতের বড় জনসমাগমে পদদলিত হওয়ার ঘটনার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে নিরাপদে অংশগ্রহণের নির্দেশনাও সম্প্রচার করছে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন।
আরও পড়ুন: খামেনির শেষকৃত্যে যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী স্লোগানে মুখর তেহরানের আকাশ
শোকানুষ্ঠানটি রাজনৈতিকভাবেও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে খামেনির ছেলে ও উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া মোজতবা খামেনির উপস্থিতির দিকে নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল। বাবার মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর তাকে সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হলেও তিনি এখনো জনসমক্ষে আসেননি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই হামলায় তিনি আহত হয়েছিলেন, যদিও তার আঘাতের মাত্রা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। এখন পর্যন্ত তিনি শুধু লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে যোগাযোগ করেছেন।
একই হামলায় নিহত খামেনির পরিবারের অন্য সদস্যদেরও দাফন করা হবে। তাদের মধ্যে তার এক শিশুনাতনিও রয়েছেন।
শুক্রবার থেকেই বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা তেহরানে পৌঁছাতে শুরু করেন। তাদের মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ উপস্থিত ছিলেন। তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়া ফিলিস্তিনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের প্রতিনিধিরাও শোকানুষ্ঠানে অংশ নেন। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া, চীন, ইরাক, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা সপ্তাহব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন।
ইরানের কর্মকর্তারা এই শোকানুষ্ঠানকে জাতীয় ঐক্যের প্রদর্শন হিসেবে তুলে ধরছেন। পার্লামেন্ট স্পিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ শুক্রবার শোক প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘প্রতিশোধের আহ্বান পুরো বিশ্বের কানে পৌঁছাতে হবে।’ তিনি জনগণকে ব্যাপকভাবে শোকানুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামিও বলেন, ‘শহীদ নেতা এবং দেশের সব শহীদের রক্তের মূল্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে হবে।’
তবে পাঁচ সপ্তাহের সংঘাতের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির একটি প্রাথমিক সমঝোতা কার্যকর থাকলেও ইরানি কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, প্রয়োজন হলে তেহরান আবারও যুদ্ধে ফিরতে প্রস্তুত। একই সময়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির কাঠামোগত সমঝোতার পরও ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর বিভিন্ন অবস্থানে একাধিক হামলা চালিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির শেষ বিদায়ের পর এটিই ইরানের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, এই আয়োজন কেবল শোক প্রকাশের নয়, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইরানের ঐক্য, প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্রীয় অবস্থান প্রদর্শনেরও প্রতীক।