লাল পতাকা দিয়ে মোড়ানো খামেনির কফিন © সংগৃহীত
মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিনের ওপর ইমাম রেজার মাজারের প্রতীকী লাল পতাকা স্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ৯ জুলাই মাশহাদে দাফনের আগে শুরু হয়েছে রাষ্ট্রীয় শোক ও শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা। এদিকে রাজধানী তেহরানে খামেনির জানাজা ও শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রস্তুতি জোরেশোরে চলছে। দেশটির কর্তৃপক্ষের আশা, শুধু তেহরানেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষ অংশ নেবেন।
ইরানের মাশহাদ শহরের ইমাম রেজার মাজারের লাল পতাকা খামেনির কফিনে স্থাপন করা হয়। শিয়া ইসলামে এই লাল পতাকা বিশেষ প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামি রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাদের হাশেমি আল জাজিরাকে বলেন, এই লাল পতাকা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন ইবনে আলীর আত্মত্যাগের প্রতীক। সপ্তম শতকে কারবালার যুদ্ধে তার শাহাদাত শিয়া মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও ধর্মীয় অনুপ্রেরণার উৎস।
তিনি বলেন, ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র খামেনির মৃত্যু ও কারবালায় ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের মধ্যে প্রতীকী তুলনা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় খামেনির নিহত হওয়ার ঘটনাকে তারা শাহাদাত হিসেবে উপস্থাপন করছে।
আগামী শনিবার থেকে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে খামেনির মরদেহ জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। এর আগে সেখানে শেষকৃত্যের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের মধ্যেও কর্মীরা দিনরাত কাজ করে শেষ বিদায়ের আয়োজন সম্পন্ন করছেন। পুরো কমপ্লেক্সজুড়ে খামেনির বিশাল প্রতিকৃতি, শোকের প্রতীক কালো পতাকা এবং শাহাদাত ও প্রতিশোধের প্রতীক লাল পতাকা টাঙানো হয়েছে। একটি প্রতিকৃতিতে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়কার তরুণ যোদ্ধাদের সঙ্গে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট খামেনিকে দেখা যায়।
প্রস্তুতিতে অংশ নেওয়া কর্মী হোসেইন মোঘাদ্দাসি বলেন, ‘আমাদের শহীদ পথপ্রদর্শকের বিদায় অনুষ্ঠানের জন্য আমরা ফুল লাগাচ্ছি এবং গাছপালায় পানি দিচ্ছি।’
তিনি বলেন, শনিবার জাতীয় শোকের প্রথম দিনে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হতে পারে। এ কারণে শত শত বাক্স বিশুদ্ধ পানীয় পানি ট্রাকে করে আনা হয়েছে।
মোঘাদ্দাসি বলেন, ‘ইরানের সব প্রান্ত থেকে মানুষ আসবে। বিশাল জনসমাগম হবে।’
আরও পড়ুন: দুপুরের মধ্যে দেশের যে ৯ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের আভাস
নিরাপত্তার বিষয়েও সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। গ্র্যান্ড মোসাল্লার প্রধান প্রবেশপথে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। আশপাশে চলাচলকারী প্রতিটি গাড়ি তল্লাশি করা হচ্ছে এবং বিশেষ অনুমতিপত্র ছাড়া কাউকে কমপ্লেক্সে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এখনো সাধারণ মানুষের জন্য প্রবেশদ্বার খোলা হয়নি।
কমপ্লেক্সের ভেতরে জানাজা উপলক্ষে কয়েক ডজন অ্যাম্বুলেন্স ও উদ্ধারকারী যান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পুরো এলাকায় খামেনির বিভিন্ন উদ্ধৃতি সংবলিত কালো ব্যানার টাঙানো হয়েছে। পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে থাকা খামেনির ছবিও বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শন করা হয়েছে।
বিভিন্ন ব্যানারে লেখা রয়েছে, ‘আমরা শোকাহত, কিন্তু আমরা এখনো দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছি।’
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, গ্র্যান্ড মোসাল্লার মূল মসজিদ ভবনে টানা তিন দিন খামেনির মরদেহ রাখা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ও ধর্মপ্রাণ দর্শনার্থীরা শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারেন।
এরপর সোমবার রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন সড়কে মরদেহ বহন করে শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। মঙ্গলবার তা নেওয়া হবে শিয়া ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র নগরী কোমে। সর্বশেষ ৯ জুলাই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পবিত্র নগরী মাশহাদে, যা খামেনির জন্মস্থান, সেখানে তাকে দাফন করা হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক এবং দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ জনগণকে ব্যাপকভাবে শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি ইরানের সব জনগণকে আহ্বান জানাই, আপনারা উপস্থিতির মাধ্যমে ইসলামি ইরানের ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করুন। জাতির প্রতিশোধের আহ্বান যেন পুরো বিশ্বের কানে পৌঁছে যায়।’