আল জাজিরার প্রতিবেদন

কেবল আমেরিকা নয় গাজা যুদ্ধে ভারত-ব্রাজিল থেকেও অস্ত্র কিনেছে ইসরায়েল

২৩ মে ২০২৬, ০৫:৫৯ PM
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত

২০২৪ সালের জানুয়ারির শুরুতে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) বাইরে যখন গাজায় ইসরায়েলের প্রায় ১০০ দিন ধরে চলা নৃশংস সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীরা সমবেত হচ্ছিলেন, তখন হাজার মাইল দূরের ফিলিস্তিনিরা ইউটিউবের লাইভস্ট্রিমে সেই কার্যক্রম দেখছিলেন। কারণ ওইদিন গাজাবাসীর পক্ষে আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে আইরিশ আইনজীবী ব্লিন নি ঘরালাইঘ বলেছিলেন, ‘ইতিহাসে এটিই প্রথম গণহত্যা, যেখানে ভুক্তভোগীরা নিজেরাই তাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দৃশ্য রিয়েল-টাইমে সম্প্রচার করছে এই আশায় যে বিশ্ব হয়তো তাদের ওপর চলমান হত্যাযজ্ঞ থামাতে কিছু একটা করবে।

ব্লিনের ভাষ্যমতে গাজায় প্রতিদিন গড়ে ২৪৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছেন, যার মধ্যে প্রতি ঘণ্টায় দুজন মা এবং ৫ জন করে শিশু রয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য থেকে চিকিৎসকেরা এক নতুন সংক্ষিপ্ত রূপ বা অ্যাক্রোনিম তৈরি করেছেন। ‘ডব্লিউসিএনএসএফ’- যার অর্থ আহত শিশু, যার পরিবারের কেউ বেঁচে নেই।

পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারি আইসিজে রায় দেয় যে গাজায় গণহত্যার একটি বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে এবং আদালত অন্তর্বর্তীকালীন কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেয়। একই সাথে গণহত্যা সনদের স্বাক্ষরকারী ১৫৩টি দেশকে তাদের বাধ্যবাধকতা মনে করিয়ে দিয়ে গণহত্যা প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু এই সতর্কবার্তার পরও পরবর্তী ২২ মাস ধরে হত্যাকাণ্ড চলতেই থাকে এবং ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগ পর্যন্ত ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত ও ১ লাখ৭১ হাজার মানুষ আহত হন। এই পুরোটা সময় জুড়ে ইসরায়েলে অস্ত্রের প্রবাহ সচল ছিল।

সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার কয়েক মাসব্যাপী এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আইসিজে-এর ওই সতর্কবার্তার পরও অন্তত ৫১টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল থেকে সামরিক সরঞ্জাম তেল আবিবে প্রবেশ করেছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যকার ইসরায়েলি ট্যাক্স অথরিটি (আইটিএ)-এর আমদানি তথ্য, কাস্টমস রেকর্ড এবং তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে পাওয়া নথি বিশ্লেষণ করে ইউরোপ, এশিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর এই সামরিক সরবরাহ চেইনের সন্ধান মিলেছে। মজার বিষয় হলো, এই দেশগুলোর মধ্যে এমন কিছু দেশও রয়েছে যারা আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা বা আংশিক স্থগিতাদেশ জারি করেছিল।

ইসরায়েলি ট্যাক্স অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, আইসিজে-এর রায়ের পর ইসরায়েলে অস্ত্র আমদানি আরও বৃদ্ধি পায়, যার সিংহভাগই ছিল গোলাবারুদ। দেশটিতে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো শীর্ষ পাঁচটি দেশ— যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রোমানিয়া, তাইওয়ান এবং চেক প্রজাতন্ত্র— প্রত্যেকেই যুদ্ধের সময় তাদের চালানের পরিমাণ বাড়িয়েছে। 

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত গোলাবারুদ, বিস্ফোরক, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং সাঁজোয়া যানের উপাদানের মতো মোট ২,৬০৩টি সামরিক চালান ইসরায়েলে প্রবেশ করেছে। এই আমদানির মোট মূল্য ছিল ৩.২২ বিলিয়ন শেকেল (৮৮৫.৬ মিলিয়ন ডলার), যার ৯১ শতাংশই রেকর্ড করা হয়েছে আইসিজে-এর রায়ের পর। 

২০২৩ সালের অক্টোবরের আগের ২০ মাসে এই আমদানির পরিমাণ ছিল মাত্র ১.৪১ বিলিয়ন শেকেল (৩৮৮.১ মিলিয়ন ডলার)। এই তথ্য প্রমাণ করে যে, গাজায় সামরিক অভিযান টিকিয়ে রাখতে ইসরায়েল বিদেশি অস্ত্রের ওপর তাদের নির্ভরতা ব্যাপক হারে বাড়িয়ে দিয়েছিল। এমনকি ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও অস্ত্রের এই প্রবাহ থামেনি; বছরের শেষ দুই মাসে ইসরায়েল আরও ৩২৪.৯ মিলিয়ন শেকেল (৮৯.৪ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে।

ইসরায়েলি কাস্টমস আমদানি তথ্যে সুনির্দিষ্ট অস্ত্রের মডেল ব্যবহারকারীর উল্লেখ না থাকায়, কোড নম্বর ‘৯৩’-এর আওতায় আসা চালানগুলো কোন কোন প্রতিরক্ষা কোম্পানির মধ্যে লেনদেন হয়েছে তা যাচাই করতে একটি স্বাধীন অনুসন্ধান চালায় সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। অনুসন্ধানকালে ২০২৪ সালে ভারত থেকে ইসরায়েলে পাঠানো সামরিক চালানের ৯১টি কাস্টমস রপ্তানি নথি হাতে পাওয়া গেছে, যা আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাস কোড ‘৯৩১৬৯০০০’-এর অধীনে নিবন্ধিত ছিল।

আন্তর্জাতিক কাস্টমস বুক বা এইচএস (HS) কোড অনুযায়ী ‘৯৩১৬’ বলতে মূলত বোমা, গ্রেনেড, টর্পেডো, মাইন, মিসাইল এবং যুদ্ধক্ষেত্রের অনুরূপ গোলাবারুদ ও তার যন্ত্রাংশ বোঝায়। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের কাস্টমস হ্যান্ডবুক অনুযায়ী, ভারতীয় উপক্যাটাগরি ‘৯৩১৬৯০০০’ কোডটি সুনির্দিষ্টভাবে বোমা ও গ্রেনেড লেবেলযুক্ত।

প্রাপ্ত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভারতীয় বেশ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় অস্ত্র প্রস্তুতকারক কোম্পানি— ‘রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস’, ‘আইএমআই সিস্টেমস লিমিটেড’ এবং ‘এমসিটি ম্যাটেরিয়ালস’-এর কাছে বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্রের মূল উপাদান রপ্তানি করেছে।

নথির তথ্য অনুযায়ী, ভারতের ‘কল্যাণী স্ট্র্যাটেজিক সিস্টেমস’ এবং ইসরায়েলের ‘রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের যৌথ উদ্যোগে গঠিত কোম্পানিটি মোট ৫,৫৪,১২০টি ইউনিট ‘হেভি ফ্র্যাগ’ বা ভারী ফ্র্যাগমেন্টেশন যন্ত্রাংশ ইসরায়েলি অংশীদার রাফায়েলের কাছে পাঠিয়েছে। অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্র্যাগমেন্টেশন বা খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার এই উপাদানগুলো মূলত এমন বিস্ফোরক গোলাবারুদে ব্যবহৃত হয় যা বিস্ফোরণের পর চারদিকে ধাতব টুকরো ছড়িয়ে দেয়।

দুই দেশের যৌথ উদ্যোগের মূল অংশীদার এই ভারতীয় কোম্পানিটি ইসরায়েলের ‘আইএমআই সিস্টেমস’-এর কাছে ৫০টি ‘১৫৫ মিলিমিটার প্রজেক্টাইল বডি’ রপ্তানি করেছে। অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৫৫ মিলিমিটারের প্রজেক্টাইল বডি হলো একটি বিশাল কামানের গোলার মূল ইস্পাত নির্মিত খোলস বা কেসিং, যার ভেতরে বিস্ফোরক ভর্তি করার নকশা করা থাকে।

ইকোনমিক এক্সপ্লোসিভস লিমিটেড নামের ভারতীয় এই প্রতিষ্ঠানটি ইসরায়েলের ‘রেশেফ টেকনোলজিস লিমিটেড’-এর কাছে ৯৯,৪০০টি ইউনিট ‘বুস্টার পেলেট’ রপ্তানি করেছে। সামরিক গোলাবারুদে তুলনামূলক বড় আকৃতির বিস্ফোরক চার্জ বা মূল বিস্ফোরণ প্রক্রিয়াটি শুরু করতে এই বুস্টার পেলেট ব্যবহার করা হয়।

আল জাজিরা জানিয়েছে, এই নথিগুলো ভারত থেকে ইসরায়েলে হওয়া সামগ্রিক রপ্তানির সম্পূর্ণ চিত্র তুলে না ধরলেও এবং এগুলো গাজায় সরাসরি ব্যবহৃত হয়েছে কি না তা সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ না করলেও, এইচএস কোড ‘৯৩১৬’-এর আওতায় ইসরায়েল ঠিক কী ধরনের মারাত্মক যুদ্ধ উপকরণ আমদানি করছে তার একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপরেখা দেয়। এই বিষয়ে মন্তব্যের জন্য আল জাজিরার পক্ষ থেকে ভারত সরকারের সাথে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে কাউন্টি ক্রিকেটে নাম লেখালেন হাসান…
  • ১০ জুন ২০২৬
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে মামল…
  • ১০ জুন ২০২৬
সীমান্তে পুশইন বন্ধ না হলে লংমার্চ করবে ছাত্র অধিকার পরিষদ 
  • ১০ জুন ২০২৬
জুনে পে-স্কেলের গেজেট জারি নিয়ে যা বলছে অর্থ মন্ত্রণালয়
  • ১০ জুন ২০২৬
সরকারি হচ্ছে আরও একটি কলেজ
  • ১০ জুন ২০২৬
প্রস্তুতি ম্যাচে নজর কাড়লেন আর্জেন্টিনার যে ৫ ফুটবলার
  • ১০ জুন ২০২৬