ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় অস্বস্তিতে বিশ্ব অর্থনীতি

১৯ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫৮ PM , আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫৮ PM
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত

তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আগ্রাসন মুলক হামলা। তবে এখনও অব্দি যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য ইরান বলছে তিন শর্তে তারা যুদ্ধ বন্ধে রাজি হবে। যেই শর্তগুলো তেহরান ওয়াশিংটনের দিকে ছুড়ে দিয়েছে সেটা মেনে নিলে যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে কিনা সেটা জানার আগে আমাদের জানতে হবে ওই শর্তগুলো যুক্তরাষ্ট্র কতটুকু মেনে নিবে। তবে বিশ্ব অর্থনীতি এইসব শর্তের দ্বার ধারছে না। পারদ ছড়েছে তেলের বাজারে সেই সঙ্গে বাড়ছে উদ্বেগ।

বাড়ছে তেলের দাম
বিশ্বের তেল পরিবহণের করিডোর খ্যাত হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম। কারণ এই পথে পৃথিবীর মোট ব্যবহৃত তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।

আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) খুচরা জ্বালানি মূল্য ট্র্যাকার ‘এএএ ফুয়েল প্রাইসেস’ এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন রেগুলার পেট্রোলের দাম ফেব্রুয়ারিতে গড়ে ছিল ২ দশমিক ৯৪ ডলার, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৫৮ ডলারে অর্থাৎ দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্য তাদের নিজস্ব পেট্রোলের দাম নির্ধারণ করলেও, বেশ কিছু রাজ্যে প্রতি গ্যালনের দাম ৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় এই দাম ৫ ডলার অতিক্রম করেছে, যা গত দুই বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বিশ্বের প্রায় ১৫০টি দেশের খুচরা জ্বালানি মূল্যের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশকারী প্ল্যাটফর্ম ‘গ্লোবাল পেট্রোল প্রাইসেসের’ (জিপিপি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রাথমিক হামলার পর অন্তত ৮৫টি দেশে পেট্রোলের দাম বেড়েছে। কিছু দেশ কেবল মাসের শেষে দাম পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়, তাই এপ্রিল মাসে আরও অনেক দেশে উচ্চমূল্যের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

খাদ্যপণ্যের দাম ক্রমেই বাড়ছে
জ্বালানি তেলের দাম এবং খাদ্যের দাম একে অপরের পরিপূরক হিসেবে চলে। কৃষিজমিতে ব্যবহৃত সার থেকে শুরু করে ক্ষেত থেকে সুপারমার্কেটের তাকে খাবার পৌঁছে দেওয়া ট্রাক পর্যন্ত খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের সব স্তরেই জ্বালানির দাম প্রভাব ফেলে।

তেলমূল্য বৃদ্ধি সরাসরি জাহাজ চলাচল ও পরিবহন ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলে। অর্থনীতিবিদ ডেভিড ম্যাকউইলিয়ামস বলেন, ‘পরিবহন হলো বিশ্ব অর্থনীতির জীবনরক্ত। এটি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার বিষয় এটি একটি লজিস্টিক সমস্যা, সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা এবং পরিশেষে পরিবহনই হলো বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি।’

বর্তমানে 'স্ট্যাগফ্লেশন' অর্থাৎ ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং বেকারত্ব বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, যা ঐতিহাসিকভাবে বড় ধরনের তেলের সংকটের সময় দেখা দেয়। অর্থনীতিবিদরা ১৯৭৩, ১৯৭৮ এবং ২০০৮ সালের সংকটের উদাহরণ টেনে বলছেন যে, অতীতে তেলের দামের সব উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফনের পরই কোনো না কোনো রূপে বিশ্বমন্দা দেখা দিয়েছে।

নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে, যেখানে মানুষ তাদের আয়ের একটি বড় অংশ খাবারের পেছনে ব্যয় করে এবং প্রচুর পরিমাণে শস্য ও সার আমদানি করে, সেখানে তেলের দাম বৃদ্ধি দ্রুত খাদ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।

তেল ও গ্যাস কেবল জ্বালানি হিসেবেই নয়, আরও অনেক কাজে ব্যবহৃত হয়। এগুলো হাজার হাজার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কাঁচামাল।

প্লাস্টিক জাতীয় নানান পণ্য যেমন- পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট, ফোনের কেসিং এবং চিকিৎসার সিরিঞ্জ সবই অপরিশোধিত তেল থেকে তৈরি। পলিয়েস্টার, নাইলন ও অ্যাক্রিলিকের মতো সিন্থেটিক কাপড়েরও গোপন উপাদান হলো এই অপরিশোধিত তেল, যা খেলাধুলার পোশাক থেকে শুরু করে কার্পেট তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। এটি প্রসাধনী শিল্পেরও মূল ভিত্তি, কারণ পেট্রোলিয়াম জেলি (ভ্যাসলিন), লিপস্টিক এবং কনসিলার তৈরিতে এটি ব্যবহার করা হয়।

গৃহস্থালির বিভিন্ন পণ্যও তেল-ভিত্তিক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল; যেমন লন্ড্রি ডিটারজেন্ট, ডিশওয়াশিং লিকুইড এবং পেইন্ট সবই পেট্রোলিয়াম পণ্য থেকে তৈরি।

বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা মূলত সারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপাদিত হয়। এই সার ফসলের ফলন বাড়াতে এবং খাদ্যের চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়। ফলে তেলের বাড়ার শুধু যে জ্বালানি খাত চাপে আছে বিষয়টা এমন নয় বরং ক্রমেই অস্থির হয়ে পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতি।  

বাড়ছে বিমানভাড়াও  
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ৪৬ হাজারেরও বেশি ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা ঘটেছে। এভিয়েশন ডাটা বিশ্লেষক সংস্থা ‘সিরিয়াম লিমিটেড’-এর তথ্য অনুযায়ী, এ সংকটের ফলে চলতি মাসের শুরুর দিকে বিশ্বজুড়ে এয়ারলাইনসগুলোর প্রায় ১০ শতাংশ সক্ষমতা (ক্যাপাসিটি) ধসে পড়েছে। করোনা মহামারির পর এভিয়েশন খাতে এটিই সবচেয়ে বড় ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হঠাৎ করে আসন সংখ্যা কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে টিকিটের দামের ওপর। ব্লুমবার্গের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সিডনি থেকে লন্ডনগামী রুটে ৩-১০ এপ্রিলের একটি ইকোনমি ক্লাস রিটার্ন টিকিটের দাম গত দুই সপ্তাহে ৮০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। একই রুটে বিজনেস ক্লাসের টিকিটের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।

গুগল ফ্লাইটসের ১২ মার্চের তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্লুমবার্গ এ ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় দীর্ঘ পাল্লার রুটগুলোতে এই অস্থিরতা আরও কিছুদিন বজায় থাকতে পারে। 

স্টক মার্কেটে অস্থিরতা
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আগামী এক থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারগুলো চরম আতঙ্ক ও অস্থিরতার সম্মুখীন হতে পারে। আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থা ‘অ্যালপাইন ম্যাক্রো’।

সংস্থাটি জানায়, যুদ্ধের ভয়াবহতা বৃদ্ধি, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা এবং লোহিত সাগরে নৌ-চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।

অ্যালপাইন ম্যাক্রো এর আগে ধারণা করেছিল এই সংঘাত সর্বোচ্চ তিন সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা বলছে, যুদ্ধটি প্রায় দুই মাস পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

সংস্থাটির প্রধান ভূ-রাজনৈতিক কৌশলবিদ ড্যান আলামারিউ বলেন, ‘প্রাথমিক অবস্থায় আমরা সংঘাতটি এক থেকে তিন সপ্তাহ স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা দেখেছিলাম। তবে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এখন নির্দেশ করছে যে এটি প্রায় দুই মাস পর্যন্ত চলতে পারে। যদিও পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি প্রবণতা রয়েছে।’

এই যুদ্ধের সম্ভাব্য সমাপ্তি নিয়ে অ্যালপাইন ম্যাক্রো জানায়, শেষ পর্যন্ত একটি ‘অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হতে পারে, যেখানে সব পক্ষই নিজেদের বিজয়ী দাবি করার সুযোগ পাবে।

এদিকে কর্মী ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও অডিট ফার্ম তাদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। মূলত ইরানের একটি সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

ইরান পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সাথে সংশ্লিষ্ট যেকোনো আর্থিক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। আর্থিক খাতে এই আতঙ্কের জেরে দোহায় অবস্থিত এইচএসবিসি (HSBC) তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে সিটি ব্যাংক এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড তাদের অফিস বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে।

তবে শুধু ব্যাংক নয়, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অডিট ও কনসালটেন্সি ফার্মগুলোও এই তালিকায় রয়েছে প্রাইসওয়াটারহাউসকুপারস (PwC) সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। একই ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছে আরেক নামী প্রতিষ্ঠান ডিলয়েট (Deloitte)।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই কৌশলের মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সংঘাতের ভয়াবহতা সরাসরি এসব দেশের অর্থনীতিতে ছড়িয়ে দিয়ে ওয়াশিংটনকে পিছু হটতে বাধ্য করাই তেহরানের মূল লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।

ঈদযাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন হাসনাত আবদুল্লাহ
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ভোলার ইলিশা ঘাটে চরম পরিবহন সংকট, ভাড়া গুণতে হচ্ছে ৫-৬ গুণ
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ভোলায় সিএনজি-পিকআপ সংঘর্ষে প্রাণ গেল চালকের, আহত ৫
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বাড়তি ভাড়ায় ভোগান্তি যাত্রীদের
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভাবির দায়ের কোপে দেবর নিহত
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ঈদের আনন্দ এবং আমাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতা
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence