ইসরায়েলি পার্লামেন্টে মোদি
ইসরায়েলি পার্লামেন্টে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি © সংগৃহীত
দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরের প্রথম দিনে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট ‘নেসেটে’ দেওয়া এক ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েলের প্রতি তার দেশের দৃঢ় সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) প্রথম কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেসেটে ভাষণ দিয়ে মোদি বলেন, ভারত পূর্ণ আস্থার সাথে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছে।
ভাষণের এক পর্যায়ে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের ইসলামপন্থী দল হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলাকে ‘বর্বর’ হিসেবে আখ্যায়িত করে মোদি বলেন, ‘ভারত এই মুহূর্তে এবং এর পরেও দৃঢ়ভাবে ও পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে ইসরায়েলের পাশে থাকবে। তবে কোনো লক্ষ্য বা আদর্শই নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে পারে না।’ তার এই অবস্থানের সময় নেসেটের উপস্থিত সদস্যরা দাঁড়িয়ে তাকে অভিনন্দন (স্ট্যান্ডিং ওভেশন) জানান।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তেল আবিবের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। নেসেটে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু ভারতকে একটি ‘ভরসার প্রতীক’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং মোদিকে ‘বন্ধুর চেয়েও বেশি, একজন ভাই’ হিসেবে সম্বোধন করেন। তিনি বলেন, দুই দেশ অভিন্ন স্বার্থ ভাগাভাগি করে এবং এই মূল্যবোধই তাদের একে অপরের আরও কাছে নিয়ে এসেছে।
আরও পড়ুন: গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে হলে ‘মব-কালচার’সহ অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে
গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা সমালোচনা এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যার’ অভিযোগ থাকলেও মোদি তার ভাষণে ইসরায়েলের সাথে ভারতের অংশীদারিত্বকে বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ‘অপরিহার্য’ বলে উল্লেখ করেন। তবে একই সাথে তিনি গত নভেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অনুমোদিত গাজা শান্তি উদ্যোগের প্রতি ভারতের জোরালো সমর্থনের কথা জানান। তিনি বিশ্বাস করেন, এই উদ্যোগই মধ্যপ্রাচ্যে একটি টেকসই ও ন্যায়বিচারভিত্তিক শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ দেখাতে পারে।
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তির মতো আধুনিক খাতে দুই দেশের সমন্বয় বা ‘সিনার্জি’ আরও বৃদ্ধির অঙ্গীকার করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
ভারত বর্তমানে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বৃহত্তম ক্রেতা। তথ্যমতে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারত ইসরায়েল থেকে প্রায় ২০.৫ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ক্রয় করেছে। ২০২৪ সালে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩.৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উগ্র ডানপন্থী ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের ভারত সফরের সময় দুই দেশ বাণিজ্য সম্প্রসারণে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি সই করে।
তবে মোদির এই সফর নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কংগ্রেস নেতা ইমরান মাসুদ বলেন, ‘যদি নৈতিকতা থাকে, তবে গাজায় শিশুদের মৃত্যুর বিষয়টি তার বলা উচিত।’ অন্যদিকে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মারিয়ান আলেকজান্ডার বেবি এই ঘনিষ্ঠতাকে ভারতের ঔপনিবেশিকবিরোধী ঐতিহ্যের প্রতি ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ইসরায়েলের ‘হারেৎজ’ পত্রিকার সাংবাদিক গিডন লেভি জানান, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মোদির এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি নেতানিয়াহু ও মোদির মধ্যে মিল খুঁজে পেয়ে বলেন, ‘দুজনই জাতীয়তাবাদী এবং কট্টর অবস্থানের। যদিও গাজায় মানবিক পরিস্থিতির কারণে ভারতে জনমত বেশ সমালোচনামুখী, তবুও মোদির সশরীরে উপস্থিতি দুই দেশের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ।’
উল্লেখ্য, গাজায় ইসরায়েলি অভিযানে এ পর্যন্ত অন্তত ৭২ হাজার ৭৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই সফরের দ্বিতীয় দিনে (২৬ ফেব্রুয়ারি) নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আরও একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। সূত্র: আল জাজিরা