আজ বিশ্ব স্লথ দিবস
সপ্তাহে একবার নিচে নামে স্লথ © সংগৃহীত
আজ ২০ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক স্লথ দিবস। পৃথিবীর সবচেয়ে ধীরগতির ও শান্ত স্বভাবের স্তন্যপায়ী প্রাণী ‘স্লথ’-এর সুরক্ষা এবং এদের বাসস্থান রক্ষার বার্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। ২০১০ সালে কলম্বিয়ার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা ‘AIUNAU ফাউন্ডেশন’ এই দিবসের সূচনা করে। রেইনফরেস্ট ধ্বংস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা এই প্রাণীটি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতেই প্রতি বছর এই দিনটি পালন করা হয়।
দেখতে অত্যন্ত কিউট ও নিরীহ এই প্রাণীটি সম্পর্কে চলুন জেনে নেওয়া যাক কিছু চমৎকার ও চোখ কপালে তোলার মতো তথ্য।
১. অলস নয়, মেটাবলিজমই আসল রহস্য
স্লথকে দুনিয়ার সবচেয়ে অলস প্রাণী বলা হলেও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা মোটেও অলস নয়। এদের প্রধান খাবার গাছের পাতা। এই পাতা হজম করতে এবং তা থেকে শক্তি উৎপাদন করতে এদের শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতিতে কাজ করে। একটিমাত্র পাতা হজম করতে এদের কখনো কখনো এক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। মূলত শরীরে শক্তি সঞ্চয় করে রাখতেই এরা অত্যন্ত ধীরগতিতে চলাফেরা করে।
স্লথ পৃথিবীর সবচেয়ে ধীরগতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। এদের চলাচলের গতি এতটাই কম যে তা অবিশ্বাস্য। গাছের ডালে একটি স্লথ গড়ে প্রতি মিনিটে মাত্র ১০ থেকে ১৫ ফুট (৩ থেকে ৪.৫ মিটার) দূরত্ব পার হতে পারে। ঘণ্টায় হিসাব করলে এই গতি মাত্র ০.২৪ কিলোমিটার।
মাটিতে নামলে এদের গতি আরও কমে যায়। মাটিতে এরা এতটাই অসহায় যে প্রতি মিনিটে মাত্র ৫ থেকে ৬ ফুট (১.৮ মিটার) পথ বুকে টেনে টেনে চলে। ঘণ্টায় এদের গতি মাত্র ০.০৫ থেকে ০.০৮ মাইল। ফলে একটি সাধারণ মানুষ যে গতিতে হাঁটে, তাতে মানুষের এক ঘণ্টা হাঁটার দূরত্ব একটি স্লথকে পার হতে হলে একটানা প্রায় ৫ থেকে ৬ দিন হেঁটে যেতে হবে।
২. মাটিতে ধীর, পানিতে সুপারস্টার
মাটিতে বা গাছের ডালে স্লথের গতি প্রতি মিনিটে মাত্র ৩ মিটারের মতো। কিন্তু এরা অত্যন্ত দক্ষ সাঁতারু। পানির নিচে এরা স্থলের চেয়ে প্রায় তিনগুণ দ্রুত গতিতে সাঁতার কাটতে পারে। এমনকি পানির নিচে এরা প্রায় ৪০ মিনিট পর্যন্ত নিজেদের শ্বাস ধরে রাখতে সক্ষম।
৩. শরীরের ভেতরেই আস্ত এক চিড়িয়াখানা
স্লথের পশম বা লোমকে একটি ছোটখাটো বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম বলা চলে। এদের লোমে এক ধরনের বিশেষ সবুজ শ্যাওলা জন্মায়। এই শ্যাওলা একদিকে যেমন বনের সবুজ পাতার সাথে ছদ্মবেশ ধরে শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করে, তেমনি এদের লোমের ভেতর শত শত পোকা-মাকড় ও ছত্রাক বাস করে। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে স্লথের শরীরের এই ছত্রাক নিয়ে গবেষণা করছেন, যা ক্যান্সার বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ওষুধ তৈরিতে সাহায্য করতে পারে।
৪. মলত্যাগ করতে সপ্তাহে একবার নিচে নামে
স্লথ তাদের জীবনের ৯০ শতাংশ সময় গাছের ডালে উল্টো হয়ে ঝুলে কাটায়। খাওয়া, ঘুমানো এমনকি সন্তান জন্মদানের কাজও তারা গাছেই সারে। তবে মলত্যাগের জন্য এদের সপ্তাহে মাত্র একবার মাটিতে নামতে হয়। আর এই মাটিতে নামার সময়ই তারা সবচেয়ে বেশি শিকারী প্রাণীদের আক্রমণের শিকার হয়।
৫. অন্ধকারের রাজা
স্লথ দিনের বেলাতেও চমৎকার দেখতে পায় না, আর রঙের পার্থক্য তো বুঝতেই পারে না। এরা মূলত 'কালার ব্লাইন্ড' এবং এদের দৃষ্টিশক্তি খুবই দুর্বল। তবে এদের ঘ্রাণশক্তি এবং স্পর্শ অনুভূতি অত্যন্ত তীব্র, যা দিয়ে এরা রাতের অন্ধকারেও সহজে বনের মধ্যে চলাচল করতে পারে।
৬. পড়ে গেলেও কিচ্ছু হয় না
একটি স্লথ গাছ থেকে প্রায় ১০০ ফুট নিচে মাটিতে পড়ে গেলেও অলৌকিকভাবে বেঁচে যেতে পারে। এদের শরীর এমনভাবে তৈরি যে এরা হাড় না ভেঙে বা বড় কোনো আঘাত না পেয়েই এই পতন সহ্য করতে পারে। এদের কামড়ও কিন্তু বেশ শক্তিশালী।
৭. এদের কোনো ‘শরীরের গন্ধ’ নেই
শিকারী প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য এটি স্লথের একটি দারুণ প্রাকৃতিক ঢাল। এদের শরীর থেকে কোনো ঘাম বের হয় না এবং কোনো প্রকার গন্ধ তৈরি হয় না। তাই জঙ্গল চষে বেড়ানো শিকারী চিতা বা ঈগলরা সহজে এদের গন্ধ শুঁকে খুঁজে পায় না।
৮. মারা যাওয়ার পরও গাছের ডালে ঝুলে থাকতে পারে
স্লথ তাদের জীবনের ৯০% সময় গাছের ডালে উল্টো হয়ে ঝুলে কাটায়। অন্য কোনো প্রাণী বা মানুষ এভাবে দীর্ঘক্ষণ ঝুলে থাকলে তাদের লিভার, পাকস্থলী ও অন্যান্য ভারী অঙ্গ ফুসফুসের ওপর চাপ সৃষ্টি করত, ফলে শ্বাস বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু বিজ্ঞানীরা The Sloth Conservation Foundation-এর গবেষণায় আবিষ্কার করেছেন যে, স্লথের শরীরের ভেতরের অঙ্গগুলো (যেমন পাকস্থলী, লিভার, কিডনি) এক ধরণের বিশেষ শক্তিশালী টিস্যু বা আঠার মতো তন্তু (Adhesions) দিয়ে তাদের পাঁজর বা বুকের খাঁচার সাথে শক্তভাবে আটকানো থাকে। এর ফলে উল্টো হয়ে ঝুললেও অঙ্গগুলো ফুসফুসকে চেপে ধরতে পারে না এবং এরা খুব সহজে ও কম শক্তিতে নিশ্বাস নিতে পারে।
স্লথের হাতের পেশি ও থাবার গঠন মানুষের মতো নয়। আমরা কোনো কিছু আঁকড়ে ধরতে শক্তি প্রয়োগ করি, আর ছেড়ে দিলে হাত শিথিল হয়। কিন্তু স্লথের ক্ষেত্রে এটি উল্টো। এদের হাতের প্রাকৃতিক ও শিথিল অবস্থাটাই হলো কোনো কিছু শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে রাখা। ডালে ঝুলে থাকার জন্য এদের কোনো বাড়তি শক্তি খরচ করতে হয় না। এই অদ্ভুত শারীরিক গঠনের কারণে একটি স্লথ মারা যাওয়ার পরও অনেক সময় গাছের ডালে একইভাবে ঝুলে থাকে এবং মাটিতে পড়ে যায় না।
৯. মাথা ২৭০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘোরাতে পারে
পাখিদের মধ্যে প্যাঁচা যেভাবে প্রায় পুরো মাথা ঘোরাতে পারে, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে স্লথও ঠিক তেমনটাই করতে পারে। এরা শরীর না ঘুরিয়েই তাদের মাথা দুই দিকে প্রায় ২৭০ ডিগ্রি (তিন-চতুর্থাংশ) পর্যন্ত ঘোরাতে পারে। অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীর (এমনকি মানুষেরও) ঘাড়ে ৭টি কশেরুকা বা হাড় থাকে, কিন্তু তিন-আঙুল বিশিষ্ট স্লথের ঘাড়ে থাকে ৮ থেকে ১০টি হাড়। এই অতিরিক্ত হাড়ের কারণেই এরা পেছনের শত্রুর দিকে সহজেই নজর রাখতে পারে।
১০. শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না
সাধারণ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের (যেমন মানুষ বা বিড়াল) শরীরের তাপমাত্রা বাইরের পরিবেশের সাথে ওঠানামা করে না, তারা ভেতর থেকেই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু স্লথ এই ক্ষেত্রে সরীসৃপ বা লিজার্ডের মতো। এদের শরীরের মেটাবলিজম এত কম যে এরা নিজেদের শরীরের তাপমাত্রা নিজে থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাই রেইনফরেস্টে থাকা সত্ত্বেও শরীরের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে এদের প্রতিদিন টিকটিকি বা সাপের মতো গাছের মগডালে গিয়ে রোদ পোহাতে হয়।
প্রজাতি ও বিলুপ্তির হুমকি
বর্তমানে পৃথিবীতে দুই আঙুল বিশিষ্ট এবং তিন আঙুল বিশিষ্ট—এই দুই প্রধান ধরনের স্লথ পাওয়া যায়। এর মধ্যে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার রেইনফরেস্টে থাকা ‘পিগমি থ্রি-টোড স্লথ’ বর্তমানে মারাত্মকভাবে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। বন উজাড়, অবৈধভাবে পোষা প্রাণী হিসেবে পাচার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে।