হালকা কুয়াশায় ঘেরা সকাল © সংগৃহীত
নীরবেই দুয়ারে এসে গেছে হেমন্ত। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ—এই দুই মাস মিলে বাংলার ষড়ঋতুর চতুর্থ ঋতু হেমন্ত। আজ শনিবার কার্তিকের প্রথম দিন। শরতের শুভ্র মেঘ এখনো পুরোপুরি বিদায় নেয়নি, এরই মধ্যে প্রকৃতিতে লেগেছে বদলের ছাপ। রাত গভীর হলে ধানের পাতা ও ঘাসের ডগায় জমছে শিশির। ভোরের বাতাসে শীতের আভাস, আর দিন ফুরোলে কুয়াশার নরম পর্দায় ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ।
হেমন্তের আগমনী বার্তা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে উত্তরের জনপদে। সন্ধ্যা নামলেই বইছে শীতল বাতাস। শেষ রাতে হালকা কাঁথা জড়িয়ে ঘুমাতে হচ্ছে অনেককে। মাঠজুড়ে হলুদে-সবুজে মিশে থাকা ধানের শিষ আর শিশিরভেজা ঘাস প্রকৃতিকে দিচ্ছে অন্য রকম সৌন্দর্য।
কবি জীবনানন্দ দাশ তার ‘অবসরের গান’ কবিতায় হেমন্তের অপরূপ চিত্র এঁকেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের ওপর মাথা রেখে/অলস গেঁয়োর মতো এইখানে-কার্তিকের ক্ষেতে; মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার/চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ তার আস্বাদ পেয়ে পেকে ওঠে ধান...।’
হেমন্ত জীবন ও প্রকৃতিতে এক আশ্চর্য সময়। বর্ষার পর এ সময়ে বৃক্ষরাজি থাকে সবুজে ভরা। খাল-বিল ও নদীনালাও থাকে পানিতে পরিপূর্ণ। বিলজুড়ে ফোটে সাদা-লাল শাপলা ও পদ্ম। তবে হেমন্তের দুই মাসের রূপ আলাদা। কার্তিকের প্রকৃতিতে একসময় ছিল অনটনের ছাপ, আর অগ্রহায়ণ নিয়ে আসে ফসলের সমৃদ্ধি।
আগে কার্তিক মাসে মাঠে পর্যাপ্ত ফসল পাওয়া যেত না। বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দিত খাদ্যাভাব। সারা বছরের জন্য জমিয়ে রাখা চাল ফুরিয়ে যেত, শূন্য হয়ে পড়ত কৃষকের ধানের গোলা। এ কারণে কার্তিক মাসের দুর্নাম হয়েছিল ‘মরা কার্তিক’ নামে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাতেও মন্দাক্রান্ত কার্তিকের সেই বিষণ্নতার আভাস পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, ‘শূন্য এখন ফুলের বাগান, দোয়েল কোকিল গাহে না গান, কাশ ঝরে যায় নদীর তীরে।’
হেমন্তের দ্বিতীয় মাস অগ্রহায়ণ বাঙালির কাছে নবান্নের মাস। এ সময় মাঠের সোনালি ধান পাকতে শুরু করে। কৃষকের ঘরে ঘরে চলে ফসল তোলার প্রস্তুতি। বাড়ির উঠোন ভরে ওঠে নতুন ধানে, বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে পাকা ধানের মিষ্টি সুবাস। ধান শুকানো, চাল তৈরি আর নতুন চালের খাবার আয়োজনের মধ্য দিয়ে গ্রামবাংলায় ফিরে আসে উৎসবের আমেজ।
একসময় কার্তিকের অনটন আর অগ্রহায়ণের সমৃদ্ধি ছিল বাংলার কৃষিজীবনের চেনা ছবি। তবে কৃষিতে পরিবর্তন আসায় এখন আগাম আমন ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হচ্ছে। ফলে কোথাও কোথাও কার্তিক মাসেই ধান কাটা শুরু হয়ে যায়। অগ্রহায়ণজুড়ে চলে নবান্নের আয়োজন। বাঙালির প্রাচীন কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্যের অন্যতম এই উৎসব নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়।
শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে আসা হেমন্তের সকালে প্রকৃতি যেন নতুন করে সেজে ওঠে। ঘাসের ডগা, ধানের শিষ ও গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরে ঝলমল করে সকালের প্রথম রোদ। নীল আকাশ, হালকা শীতল বাতাস আর মিষ্টি রোদের মেলবন্ধনে তৈরি হয় এক স্নিগ্ধ পরিবেশ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে, বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে, দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু। দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া, একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু।’
কবির এই উপলব্ধির মতোই হেমন্তের সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে বাংলার চেনা প্রকৃতিতে। একদিকে শিশিরভেজা ভোর ও হালকা শীতের আমেজ, অন্যদিকে সোনালি ধানের মাঠ ও নতুন ফসলের প্রত্যাশা সব মিলিয়ে হেমন্ত বাংলার প্রকৃতি, কৃষি ও সংস্কৃতিতে নিয়ে আসে ভিন্ন এক আবহ।