দাবানল ও অনাবৃষ্টির কবলে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া © সংগৃহীত
বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিস্থিতির চরম পরিস্থিতি এল নিনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন আবহাওয়া অধিদপ্তর জাতীয় সমুদ্র এবং আবহাওয়া প্রশাসন (এনওএএ)। এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু প্যাটার্ন পাল্টে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিজ্ঞানীরা। বৈশ্বিক আবহাওয়ার এই বৈরী পরিস্থিতির কারণে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি-বন্যার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে এনওএএ। খবর আল জাজিরার
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের এল নিনোতে তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করেছে। ফলে এটি এখন খুব শক্তিশালী এল নিনোতে পরিণত হয়েছে, যাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে সুপার এল নিনো বলা হচ্ছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, এটি ২০২৭ সালের শুরুর দিকে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছাতে পারে। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এবারের এল নিনো এ পর্যন্ত রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর একটি হতে পারে।
নোয়ার ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনোর এই প্রভাব ২০২৭ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা দেয়। এটি সাধারণত মার্চ থেকে জুনের মধ্যে শুরু হয় এবং নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছায়। একটি এল নিনো পরিস্থিতি সর্বোচ্চ ১৮ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
এই এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় তুলনামূলক শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এবারও এর প্রভাবে এসব অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার পাশাপাশি তাপমাত্রা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে।
ভারত ও পাকিস্তানে চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কম হয়েছে। ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুন থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটিতে গড়ের চেয়ে ১৫ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের গ্রীষ্ম মৌসুমে (বিশেষ করে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে) দেশের ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে এবং স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আর এল নিনোর প্রভাবে সেটা অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা।
ইন্দোনেশিয়াতেও শুষ্ক মৌসুম ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে। দেশটির আবহাওয়া সংস্থা বিএমকেজির তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ নাগাদ দেশটিতে ৫ হাজার ১৯টি হটস্পট শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সুমাত্রা ও কালিমান্তান সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া ব্যুরো জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। একই সঙ্গে তুলনামূলক বেশি তাপমাত্রার কারণে এসব এলাকায় দাবানলের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, বসন্ত ও গ্রীষ্ম মৌসুমে দেশটির বেশিরভাগ এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত এবং বেশি তাপমাত্রা থাকতে পারে।
এল নিনোর প্রভাবে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বে অন্তত ৪ কোটি ৯০ লাখ মানুষ নতুন করে তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। এর ফলে ৪৫টি দেশে তীব্র ক্ষুধায় থাকা মানুষের সংখ্যা ২২ কোটি ৫০ লাখ থেকে বেড়ে ২৭ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছাতে পারে।
ডব্লিউএফপির হিসাবে, পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায় খাদ্যসংকটে মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বাড়তে পারে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, এল নিনোর প্রভাবে ভুট্টা, ধানসহ বৃষ্টিনির্ভর ফসল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা ও সাহেল অঞ্চল থেকে শুরু করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফসল উৎপাদনও হুমকির মুখে পড়তে পারে। ডব্লিউএফপির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক কার্ল স্কাউ বলেন, ‘এল নিনো এমন লাখ লাখ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি, যারা এরই মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।’