প্রতীকী ছবি © টিডিসি সম্পাদিত
কয়েক দশকের শক্তিশালী এল নিনোর কবলে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব। যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অেঞ্চলের দেশগুলোর পাশাপাশি জলবায়ুর নাজুক অবস্থায় পড়তে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়াও। বৈশ্বিক জলবায়ুর এই নেতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। মঙ্গলবার (২ জুন) বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার বরাত দিয়ে জাতিসংঘ জানিয়েছে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের আগে এল নিনো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ আর নভেম্বরের আগে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সম্ভাবনা আছে। খবর গার্ডিয়ানের
এল নিনো মুলত বৈশ্বিক জলবায়ুর প্রাকৃতিক প্যাটার্ণ বিপর্যয়ের একটি অবস্থা । যেখানে কখনো তাপমাত্রা অতিমাত্রায় বেড়ে যায় আবার কখনো অতিবৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, আসন্ন এল নিনোটি মাঝারি থেকে তীব্র শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে সতর্ক করেছেন যে এটি চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে।
এই পূর্বাভাসের পর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একে একটি জরুরি জলবায়ু সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এল নিনো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করবে, যার বিধ্বংসী প্রভাব অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়বে।
তবে ডব্লিউএমও এখনই এটিকে শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো বলে চূড়ান্ত ঘোষণা দিচ্ছে না, কারণ তাদের মতে পূর্বাভাসে এখনও কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে। ডব্লিউএমও-এর মহাসচিব চেলেস্তে সাওলো জানান, বিভিন্ন মডেলের পূর্বাভাসের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। কিছু মডেল শক্তিশালী এল নিনোর ইঙ্গিত দিলেও অন্যগুলো তেমনটি দেখাচ্ছে না। তা সত্ত্বেও সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে আগামী তিন মাস পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনোর প্রভাবে সাধারণত দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্র, হর্ন অব আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ায় ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার সৃষ্টি হয়; পক্ষান্তরে মধ্য ও উত্তর আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে তীব্র খরা দেখা দেয়।
এর আগে ২০২৩-২৪ সালে ঘটে যাওয়া এল নিনোটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম পাঁচটি শক্তিশালী এল নিনোর একটি, যা ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রার সব রেকর্ড ভেঙে দেওয়ার পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল।
সম্প্রতি পশ্চিম ইউরোপের যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডে মে মাসের সব রেকর্ড ভাঙা তাপপ্রবাহের পর ডব্লিউএমও এবং যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দফতর সতর্ক করেছে যে ২০৩০ সালের আগেই বিশ্ব আরেকটি রেকর্ড সৃষ্টিকারী উষ্ণ বছরের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, যা এল নিনোর প্রত্যাবর্তনের কারণে ২০২৭ সালের মধ্যেই ঘটে যেতে পারে।
ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’-এর কর্মকর্তা গ্যারেথ রেডমন্ড-কিং এই পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহের জন্য চরম উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন, কারণ জলবায়ু সংকট এবং ইরান যুদ্ধের ফলে সার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বিশ্বের খাদ্য ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই মারাত্মক চাপের মধ্যে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে বিশ্বজুড়ে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও চরম আবহাওয়া তৈরি হবে, তা অনেক কৃষকের জন্য ধ্বংসাত্মক হবে এবং বহু মানুষের জন্য জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। তবে কিছু বিজ্ঞানী একে সুপার এল নিনো হিসেবে আখ্যায়িত করলেও ডব্লিউএমও এই পরিভাষাটি প্রত্যাখ্যান করেছে, কারণ তাদের অফিশিয়াল শ্রেণিবিন্যাসে এই শব্দের কোনো ভিত্তি নেই। সাধারণত প্রতি কয়েক বছর পর পর এই প্রাকৃতিক চক্র দেখা দেয় এবং এটি ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা অনেক বাড়লেও আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার (আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম) কারণে বহু মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় দাতা দেশগুলো সম্প্রতি তাদের বৈদেশিক সাহায্য বাজেট কমিয়ে দেওয়ায় এই জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থার তহবিল মারাত্মক সংকটে পড়েছে।
ডব্লিউএমও-এর মহাসচিব চেলেস্তে সাওলো এই অর্থায়নের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, জলবায়ু অর্থায়ন বর্তমানে তার কাঙ্ক্ষিত চূড়ায় নেই, যদিও আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থাকে এখনো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল দেশগুলোকে সহায়তার জন্য আরও বেশি তহবিল সংগ্রহের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে এই প্রযুক্তির সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এই সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্ব নেতাদের জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর জলবায়ু পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই বিপর্যয়ের একমাত্র সমাধান হলো জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি নির্ভরতা ত্যাগ করা, দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ধাবিত হওয়া এবং ঝুঁকিতে থাকা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার আওতায় আনা।
একই সঙ্গে বিশ্বের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে জমে থাকা অস্বাভাবিক উষ্ণতার কারণেই সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে, যা আগামী বছরগুলোতে বৈশ্বিক আবহাওয়াকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দিতে পারে।