পর্যটনের স্বর্গ, দুর্যোগে যেন মৃত্যুপুরী সেন্টমার্টিন

১৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪০ AM
সেন্টমার্টিন দ্বীপ

সেন্টমার্টিন দ্বীপ © টিডিসি ফটো

কক্সবাজারের টেকনাফের সেন্টমার্টিন-বাংলাদেশের মানুষের কাছে সৌন্দর্যের এক স্বর্গ। নীল জলরাশি, প্রবাল, সারি সারি নারিকেল গাছ আর অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে প্রতিবছর লাখো পর্যটক ছুটে আসেন এই দ্বীপে। কিন্তু এই স্বর্গের বাসিন্দাদের কাছে সেন্টমার্টিনে টিকে থাকা যেন প্রতিদিনের এক কঠিন পরীক্ষা।

বর্ষা এলেই মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটি। বন্ধ হয়ে যায় নৌ যোগাযোগ। তখন টেকনাফ থেকে খাবার, ওষুধ, জ্বালানি কিংবা প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। কয়েকদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় বাজারের মজুত। বাধ্য হয়ে প্রায় ১১ হাজার মানুষকে পানি, বিস্কুট কিংবা যা পাওয়া যায় তা খেয়ে দিন পার করতে হয়।

১৯৯৭ সালে ভূমিহীন ও গৃহহীন ৫০ পরিবারের জন্য নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোও এখন জরাজীর্ণ। দীর্ঘ ২৯ বছরেও এসব ঘরের বড় ধরনের কোনো সংস্কার হয়নি। টিনের ছাউনি, বাঁশের বেড়া ও কাঠামো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বর্ষায় বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর। এসব ঘরে বসবাস করা প্রায় ৩০০ মানুষের জীবন এখন ঝুঁকিপূর্ণ।

পর্যটনের স্বর্গ, বর্ষায় দুর্ভোগের দ্বীপ
সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত একটি প্রবাল দ্বীপ। কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মিয়ানমারের উপকূল থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় এর অবস্থান। মাত্র প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপ পর্যটন মৌসুমে মুখর থাকলেও বর্ষা নামলেই নেমে আসে দুর্ভোগ।

থেমে যায় মাছ ধরা, বন্ধ আছে পর্যটন ব্যাবসা। ফলে দ্বীপবাসীর আয়-রোজগারের পথও সংকুচিত হয়ে পড়ে। সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা জাবেদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, ভারী বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে দক্ষিণপাড়া, পশ্চিমপাড়া ও গলাচিপা এলাকার অনেক জায়গা পানির নিচে রয়েছে।

তিনি বলেন, হালকা বৃষ্টি ও বাতাসেই সেন্টমার্টিনের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের নৌ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তখন খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির সংকট দেখা দেয়। এখানে কোনো সরকারি খাদ্য গুদাম নেই। প্রতিদিন টেকনাফ থেকেই এসব পণ্য আনতে হয়। সূর্যের আলো না থাকায় সোলার বিদ্যুৎও বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণত দুর্যোগের সময় জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়, কিন্তু জ্বালানি সংকটে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।

সেন্টমার্টিনে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের সংকটের শঙ্কা | NTV Online

সেন্টমার্টিন বিএন ইসলামিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী হালামিতুস সাদিয়া বলেন, ঝড়-তুফানে এখানে টাকা থাকলেও খাবার মেলে না। ঘরে কিছু না থাকায় অনেকে উপোষে থাকে। বাঁচতে চাইলে পানিও লবণাক্ত তখন প্রশ্ন জাগে, আর কী খেয়ে আমরা টিকে থাকব?দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়ায় খাদ্যসংকটের সমাধান হলে আমাদের এক নিঃশব্দ কান্না কমে যাবে। যদি এই সংকটের লাগাম টানা না হয়, তবে কোনো এক দুর্যোগে আমরা খাদ্যের অভাবে প্রাণ হারাব।

সেন্টমার্টিন দ্বীপের অনার্স পড়ুয়া ছাত্র দিলোয়ার বলেন, এটি বাংলাদেশের এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। টেকনাফ থেকে কয়েকদিন ট্রলার না এলে বাজারে নিত্যপণ্যের ভয়াবহ সংকট দেখা দেয়, তখন অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়। এভাবেই দুর্ভোগের শেষ হয় না আমাদের।

সেন্টমার্টিন দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, দীর্ঘ ৫৮ দিন মাছ শিকার বন্ধ ছিল। কয়েকদিন হলো আবার সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছি। মাছ ধরা ছাড়া আমাদের আয়ের আর কোনো পথ নেই। পর্যটন বন্ধ থাকায় বিকল্প কোনো কাজও নেই। আবহাওয়া খারাপ হলে মাছ ধরাও বন্ধ হয়ে যায়। তখন ঘরে চুলা জ্বলে না। আবার যোগাযোগ বন্ধ থাকলে বাজারের পণ্যও পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে অনেক সময় পানা (বুনো শাক) খেয়ে দিন কাটাতে হয়।

অতীতেও দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট
২০২৫ সালের জুন মাসে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগর উত্তাল থাকায় টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে ১১ দিন পর্যন্ত যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ ছিল। এতে দ্বীপে খাদ্য ও জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জাহাজে করে ১৫০ টন খাদ্যপণ্য পাঠানো হয়েছিল।

এর আগে ঘূর্ণিঝড় মোখায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সেন্টমার্টিন। ধ্বংস হয়েছিল হাজারো ঘরবাড়ি, উপড়ে গিয়েছিল অসংখ্য গাছ। মোখার পর দুই মাস পর্যন্ত খাদ্য ও পানির সংকটে কাটাতে হয়েছিল দ্বীপবাসীকে।

সেন্টমার্টিনের সাবেক ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান বলেন, প্রতিনিয়ত দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে আমরা খাদ্য সংকটে পড়ি। বিষয়টি সরকার ও দেশবাসী জানেন। কিন্তু এখনো স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সেন্টমার্টিনে সরকারি খাদ্য গুদামের জন্য জায়গা রয়েছে। সেখানে দ্রুত খাদ্য গুদাম নির্মাণ করা হলে দুর্যোগের সময় মানুষ অন্তত খাদ্য নিরাপত্তা পাবে।

ঘূর্ণিঝড় মোখা : সেন্টমার্টিনের সব হোটেল এখন আশ্রয়কেন্দ্র, তিল ধারণের  জায়গা নেই - BBC News বাংলা

সেন্ট মার্টিন দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দা ও অধিকারকর্মী তৈয়ব উল্লাহ বলেন, বর্ষাকাল এখানে জীবন নিয়ে শঙ্কার সময়। সংকটাপন্ন রোগীকে টেকনাফে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসক সংকটও রয়েছে। আমরা শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধার নিশ্চয়তা চাই। দুর্যোগের সময় হোটেল-রেস্টুরেন্টে আশ্রয় নিতে হয়, যা নিরাপদ নয়। তাই স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও পশ্চিম পাশে টেকসই বাঁধ নির্মাণ জরুরি।

সংসদে উঠেছে সেন্টমার্টিনবাসীর দুর্ভোগ
কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী জাতীয় সংসদে সেন্টমার্টিনের মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

তিনি বলেন, সেন্টমার্টিনে মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। জরুরি সময়ে রোগীদের টেকনাফে নিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অতীতে চিকিৎসার অভাবে অনেক রোগী, এমনকি প্রসূতি নারীও মারা গেছেন। সেন্টমার্টিনে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, সি-ট্রাক ও সি-অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। 

৫০ আশ্রয়ণ ঘরে ঝুঁকিতে ৩০০ মানুষ
১৯৯৭ সালে সরকার সেন্টমার্টিনে ভূমিহীন ও গৃহহীন ৫০ পরিবারের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ করে। কিন্তু নির্মাণের পর প্রায় তিন দশকে এসব ঘরের উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার হয়নি।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা আয়শা খাতুন বলেন, বৃষ্টি এলেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ঘরগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে গেছে। আমরা দিনমজুর, জেলে ও নিম্ন আয়ের মানুষ। নিজেদের টাকায় এসব ঘর সংস্কার করা সম্ভব নয়।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নুরুল আলম আরমান বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বিবেচনা করে ঘরগুলো সংস্কারের জন্য আবেদন করেছি। এখানে প্রায় ৩০০ মানুষ বসবাস করছে। উপজেলা প্রশাসন দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

আরও পড়ুন: সেপ্টেম্বরেই তীব্র হতে পারে এল নিনো, জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
সেন্টমার্টিনের মানুষের দুর্ভোগ কমাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ। স্থায়ী বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, সি-অ্যাম্বুলেন্স, সি-ট্রাক, সরকারি খাদ্য গুদাম, আধুনিক সাইক্লোন শেল্টার, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এখন সময়ের দাবি।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, দুর্যোগ বা বৈরী আবহাওয়ায় সেন্টমার্টিনের মানুষ খাদ্য সংকটে পড়ে বিষয়টি আমরা অবগত আছি। খাদ্য গুদামের জায়গা থাকলে খাদ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরো বলেন, সি-ট্রাক ও সি-অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়েও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক পাঠানোর বিষয়টি দেখা হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্র ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর সংস্কারের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।

নারী খেলোয়াড়দের উত্ত্যক্ত, প্রতিবাদ করার হামলা— যুবক আটক
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
‘তুই ফ্যাসিস্ট, ১৩ লক্ষ টাকা চাঁদা দে, না হয় এলাকা ছাড়’
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
টঙ্গীতে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় স্কুলছাত্র নিহত
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দেশের সর্বোচ্চ ৩৭ ডিগ্রি তাপমাত্রা ফেনীতে, জনজীবনে অস্বস্তি
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দীর্ঘ ৮ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর এমপির হস্তক্ষেপে মুক্ত গোবিপ…
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শীঘ্রই সমাবর্তন আয়োজনের আগ্রহ নেই কুবি প্রশাসনের
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
FALL 2026
Application Deadline Wednesday, 16 Sept 2026
Apply Now

Admission Test Schedule

  • Test Date: Friday, 18 Sept 2026
  • Written Exam: 10:00 – 11:00 AM
  • Oral Viva: 11:30 AM onwards

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9