ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন জ্বলছে এখনও © সংগৃহীত
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পর্যটন এলাকা ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন দেড় দিনের বেশি সময় ধরে জ্বলছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট কাজ করলেও উচ্চচাপে গ্যাস নির্গমনের কারণে প্রচলিত পদ্ধতিতে তা নেভানো সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি পরিদর্শন করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞ দল জানিয়েছে, আপাতত জোর করে আগুন নেভানোর চেষ্টা বিপজ্জনক হতে পারে। ভূগর্ভের গ্যাসের প্রবাহ ও মজুতের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে আগুন কত দিন জ্বলবে।
বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ধারণা, ভূগর্ভের গ্যাসের প্রবাহ অব্যাহত থাকলে আগুন আরও সাত থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত জ্বলতে পারে। তবে ঠিক কত দিন আগুন জ্বলবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। গ্যাসের চাপ, নির্গমনের পরিমাণ এবং ভূগর্ভস্থ গ্যাসের স্তরের প্রকৃত অবস্থা পরীক্ষা করেই এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
এদিকে আগুনের ঝুঁকি বিবেচনায় ঘটনাস্থলের আশপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। উখিয়া উপজেলা প্রশাসন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে নির্ধারিত এলাকায় জনসমাগম ও চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। পাশাপাশি প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে কয়েকটি গ্রামের ৮ থেকে ৯ হাজার গ্রাহক দুর্ভোগে পড়েছেন। আগুন কখন নিভবে, কীভাবে গ্যাসের প্রবাহ নিরাপদে বন্ধ করা যাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্ন এখন সামনে আসছে।
কেন নেভানো যাচ্ছে না আগুন?
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইনানীর ছোট খাল সেতুসংলগ্ন একটি আবাসিক জায়গায় গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য খননকাজ চলছিল। প্রায় এক হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত খননের পর ভূগর্ভ থেকে উচ্চচাপে গ্যাস বের হতে শুরু করে। পরে সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়। মঙ্গলবার সকাল সাতটার দিকে জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানীর ছোট ব্রিজসংলগ্ন ওই বসতভিটায় এ ঘটনা ঘটে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তবে পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে সেই তৎপরতা বন্ধ রাখা হয়। পরে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুর আরহামের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভূগর্ভের যে স্তর থেকে গ্যাস বের হচ্ছে, সেই স্তরের গ্যাসের মজুত শেষ হলে আগুন স্বাভাবিকভাবেই নিভে যেতে পারে। কিন্তু গ্যাসের প্রবাহ চলমান থাকা অবস্থায় জোর করে আগুন নেভানো হলে ভূগর্ভের অন্য কোনো ফাটল বা দুর্বল স্তর দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে নতুন স্থানে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে বিশেষজ্ঞরা আপাতত আগুনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নিরাপদ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
আগুন নেভানোর বিকল্প উপায় কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনানীর ঘটনাটি সাধারণ কোনো অগ্নিকাণ্ড নয়। এখানে মূল সমস্যা ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া দাহ্য গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। তাই শুধু আগুনের শিখা নিভিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না; গ্যাসের নির্গমন নিরাপদে নিয়ন্ত্রণ করাই মূল চ্যালেঞ্জ।
তেল ও গ্যাসকূপে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষায়িত ওয়েল-কন্ট্রোল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। তবে ইনানীর ভূতাত্ত্বিক অবস্থা, গ্যাসের চাপ ও নির্গমনের ধরন পরীক্ষা না করে কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া নিরাপদ নয়।
বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি মূল্যায়নের সময় কয়েকটি বিকল্প বিবেচনা করতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে গ্যাসের চাপ, প্রবাহের পরিমাণ ও তাপমাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ; উপযুক্ত নিরাপত্তা ও প্রকৌশল মূল্যায়নের পর বিশেষায়িত ওয়েল-কন্ট্রোল প্রযুক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা যাচাই; এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হলে বিকল্প কূপ খনন করে রিলিফ ওয়েল পদ্ধতিতে গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা পর্যালোচনা।
রিলিফ ওয়েল পদ্ধতি জটিল, ব্যয়বহুল ও বিশেষজ্ঞনির্ভর। এ ছাড়া প্রয়োজন হলে বিদেশি ওয়েল-কন্ট্রোল বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এসব পদ্ধতির কোনোটিই ইনানীর ক্ষেত্রে প্রয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভূতাত্ত্বিক ও প্রকৌশলগত মূল্যায়নের পরই উপযুক্ত পদ্ধতি নির্ধারণ করা সম্ভব।
বিদেশি বিশেষজ্ঞ আনার দাবি কেন উঠছে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়ন্ত্রণহীন গ্যাস নির্গমন, গ্যাসকূপের বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, চীন ও মালয়েশিয়ার মতো দেশের তেল-গ্যাস খাতে এ ধরনের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে।
স্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের নিজস্ব প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়া হবে কি না। বিশেষ করে আগুন দীর্ঘদিন জ্বলতে থাকলে বিকল্প পরিকল্পনা কী হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তবে বিদেশি বিশেষজ্ঞ দল আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি আপাতত স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ ও আলোচনার মধ্যেই রয়েছে।
১৪৪ ধারা জারি, ২০০ থেকে ২৫০ মিটার এলাকায় নিরাপত্তাবেষ্টনী
আগুনের ঝুঁকি বিবেচনায় ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকা নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছে বাপেক্স। অন্তত ২০০ থেকে ২৫০ মিটার এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনায় রেখে জনসাধারণের চলাচল ও জনসমাগম বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উখিয়া উপজেলা প্রশাসন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে নির্ধারিত এলাকায় জনসমাগম ও চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ, দুর্ভোগে ৮-৯ হাজার গ্রাহক
আগুনের তাপ ও সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে বৈদ্যুতিক লাইন সুরক্ষিত রাখতে মেরিন ড্রাইভের মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের সরবরাহ সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে।
উখিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) কায়সার নূর বলেন, আগুন বৈদ্যুতিক খুঁটির তারে লেগে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে ৪৫টির বেশি রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁসহ কয়েকটি গ্রামের প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার গ্রাহক দুর্ভোগে পড়েছেন। বিকল্প ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহের চেষ্টা চলছে।
এদিকে আগুনের কারণে মেরিন ড্রাইভ থেকে উখিয়ার ইনানী ও কোটবাজারে যাতায়াতের সড়কে যান চলাচলও সীমিত রাখা হয়েছে। এতে পর্যটন ব্যবসা ও স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে প্রভাব পড়ছে।
আগুনের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ
আগুনের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। আগের তুলনায় আগুনের তীব্রতা বাড়ছে এবং গ্যাস বের হওয়া নলকূপের মুখও ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উখিয়া স্টেশনের কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার সকাল সাতটার দিকে জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানীর ছোট ব্রিজসংলগ্ন একটি বসতভিটায় নলকূপ খননের সময় বিস্ফোরণের মাধ্যমে আগুনের সূত্রপাত হয়। এরপর ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তবে সফল না হওয়ায় মঙ্গলবার বেলা তিনটা থেকে সেই তৎপরতা বন্ধ রাখা হয়। বাপেক্সের নির্দেশনা অনুযায়ী, ভূগর্ভের গ্যাসের প্রবাহ ও মজুতের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
স্থায়ী সমাধানে এখন কী করা প্রয়োজন?
ইনানীর আগুনের স্থায়ী সমাধান নিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসের প্রবাহ কীভাবে নিরাপদে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। আগুনের স্থায়িত্ব, গ্যাসের প্রকৃত উৎস, ভূগর্ভে মজুতের পরিমাণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য চান স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে গ্যাসের নমুনা পরীক্ষা, ভূতাত্ত্বিক জরিপ, গ্যাসের চাপ ও প্রবাহের পরিমাণ নির্ণয় এবং ঝুঁকির বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন জরুরি। একই সঙ্গে বাপেক্স, পেট্রোবাংলা, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস এবং জেলা প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত কার্যপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুর আরহাম বলেন, নলকূপের গ্যাসের মজুত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দিতে হবে। মাটির নিচের স্তরে গ্যাসের মজুত শেষ হলে আগুন নিভে যাবে। জোর করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে মাটির নিচে গ্যাস অন্যদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ঝুঁকি এড়াতে আগুনের আশপাশের ২০০ থেকে ২৫০ মিটার এলাকা বিচ্ছিন্ন রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ওই এলাকায় লোকজনের চলাচল ও জনসমাগম করা যাবে না। আগুন নিভে যাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে ইনানীর আগুন নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্যাসের প্রবাহ ও ভূগর্ভস্থ পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ জরুরি হয়ে উঠেছে। আগুন কখন নিভবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় প্রকৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমেই এর নিরাপদ ও স্থায়ী সমাধানের পথ নির্ধারণ করতে হবে।