রাবি ক্যাম্পাসে হেমন্তের সাজ—নেই শুধু সেই আড্ডাটা!

রাবি ক্যাম্পাসে হেমন্তের সাজ
হেমন্তের সাজে সেজেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস  © টিডিসি ফটো

রোকেয়া হলের ভাপা-চিতই, খালেদা হলের কুশলি, শেখ রাসেলের ভর্তাবাটি আর প্যারিস রোডের র‌্যালি। হেমন্তের আগমনে নব সাজে যেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাস। রকমারি নামের বাহারি পিঠা-পুলির উৎসবে মেতে ওঠে ক্যাম্পাস চত্বর। চিরসবুজ ক্যাম্পাসের গন্ধরাজ, শিউলি আর কামিনী ফুলের গন্ধ ঋতুর রাণী হেমন্তকে বরণ করে।

অন্যদিকে শাহী ভাপা, ভাপা কুলি, দুধ কুলি, পাকান কুলি, তেল কুলি আর নারকেল কুলিসহ রকমারি পিঠা-পুলিতে ক্যাম্পাস চত্বর হেমন্তের আমেজে মেতে উঠে আপন মনে। যেথায় পদ্মার চিংড়ি আর মাছের শুঁটকি, বেগুন, কাঁচামরিচ, ধনিয়া পাতা এবং কালিজিরার ভর্তা বাটি শিক্ষার্থীদের নজর কাঁড়ে!

প্রতি বছর কৃষি অনুষদের হেমন্ত বরণ উৎসবে মুখরিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। হলুদ শাড়ি, কপালে লাল টিপ আর আলতা রাঙা পায়ে রঙিন কুলা ও সোনালি ধান হাতে প্যারিস রোডের বুক যেন ফের নব সাজে মেতে ওঠে মুহুর্তেই। দিনভর হৈ-হুল্লোড় আর গানের তালে হেমন্তকে বরণ করা হয়। বিকেলে রকমারি সব বাহারি পিঠা-পায়েসে ভরে ওঠে ক্যাম্পাসের স্টলগুলো।

সন্ধ্যা গড়াতেই গিটারের তালে মেতে উঠে ইবলিশ চত্বর। এভাবেই প্রতিবার বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে নবান্ন উৎসবের মধ্য দিয়ে বরণ করা হয় ঋতুরাণী হেমন্তকে। হেমন্ত বরণের মধ্য দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে দোকানগুলোতে পড়ে পিঠা বিক্রির ধুম। কথায় আছে- ‘শীতের পিঠা, খেতে ভারি মিঠা’। কিন্তু এবার সে আয়োজন নেই। কোথায় যেন না পাওয়া আর হারানোর সুর। হেমন্ত নিয়ে জীবনানন্দ দাস লিখেছেন-

‘এ দেহ-অলস মেয়ে
পুরুষের সোহাগে অবশ!
চুমে লয় রৌদ্রের রস
হেমন্ত বৈকালে... কবির চোখে হেমন্ত কী অসাধারণ...

ঋতুর রাণী হেমন্তের আগমনে বাঙালি মেতে ওঠে নবান্ন উৎসবে। নবান্ন মনে করে দেয় শীতের আগমনী বার্তাকে। আর বাঙালির শীতকালে পিঠা খাওয়ার রীতি তো কোটি প্রাণের চিরায়ত সংস্কৃতির এক অবিনশ্বর অংশ।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শীতের আগমনী বার্তায় ক্যাম্পাস মেতে ওঠে পিঠাপুলির আমেজে। শিক্ষার্থীরা ভিড় জমায় পিঠার দোকানগুলোতে। গ্রাম বাংলার চিরচেনা সেই অমৃত স্বাদে জিভ ভিজিয়ে খাওয়ার পাশাপাশি গল্প-গুজব ও আড্ডায় মেতে ওঠে ক্যাম্পাসের দোকানগুলো।

হেমন্তে এভাবেই আড্ডায় মেতে ওঠেন রাবি শিক্ষার্থীরা

নরম নমর হাতে গরম গরম পিঠা খেতে খেতে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প-গুজব হাসি-তামাশা আর খুনসুটিতে মুখরিত থাকে চারপাশ। গিটারিস্ট ও শিল্পীদের মায়াবী গানের কণ্ঠে আড্ডা গুলো সকাল গড়িয়ে বিকেলে, বিকেল গড়িয়ে হয় সন্ধ্যা। সন্ধ্যায় কেউ আবার দক্ষিণা হিমেল হাওয়ায় চাদর জড়িয়ে এসে আড্ডাকে করে মুখরিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইবলিশ চত্বর, শেখ রাসেল স্কুল মাঠ, খালেদা জিয়া হল এবং রোকেয়া হলের সামনে বসে পিঠাপুলির এই দোকানগুলো।

তবে সবচেয়ে বেশি আসর জমে ওঠে রোকেয়া হলের সামনের দোকানগুলোতে। বিকাল হলেই পিঠার দোকানের আশপাশে বসে ছোট ছোট আড্ডার আসর। ক্যাম্পাসের ছোট্ট পিঠার দোকানে বন্ধুরা মিলে যখন একসঙ্গে পিঠা খায়, তখন নিজের অজান্তেই ক্ষণিকের জন্য মনে পড়ে যায় গ্রামের বাড়িতে মায়ের হাতের সেই পিঠা খাওয়ার কথা। তাই তো পরিবার-পরিজন থেকে শত শত মাইল দূরের ক্যাম্পাস যেন মনে করে দেয় আরেকটা পরিবারের কথা।

চল্লিশ হাজার রাবিয়ান আজ চুলার ধারে বসে মায়ের হাতের পিঠা-পায়েস খেতে পারছেন ঠিকই, কিন্তু মিস করছে ক্ষনিকের সেই বৃহৎ পরিবারকে। মিস করছে স্মৃতি বিজড়িত সেই মুহুর্তগুলোকে। করোনাভাইরাস এবার এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কবে এ ধরা সুস্থ হবে তাও জানা নেই কারো। শিক্ষার্থীদের অপেক্ষায় এখন ক্যাম্পাস।

আজ চির সবুজ ক্যাম্পাসজুড়ে শুধুই প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যের ছায়া। গন্ধরাজ, শিউলি, কামিনী আর বকফুলের সুগন্ধিগুলো সেথায় দখিনা হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। অতিথি পাখিগুলো লেক, ডোবা ও পুকুরে শোভা ছড়াচ্ছে। চিরচেনা প্যারিস রোডের হালকা কুয়াশায় সূর্যের সোনালী আলো গগনচুম্বী গাছের ফাঁক দিয়ে মাটি স্পর্শ করছে। কিন্তু সেখানে নেই শুধু রাবিয়ানের পদচারণা, নেই পিঠাপুলির আমেজ, নেই সেই আড্ডাটা।

তাদের শুষ্ক হাতের কোমল স্পর্শ পেতে আজ যেন প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে কামিনী, শিউলি আর চামেলি ফুলগুলো। জনশূন্য প্যারিসের বুক আজ হাহাকার করছে একটু আলতা রাঙা পায়ের স্পর্শ পাবে বলে! হেমন্তের এই সোনালী দিনে ৭৫৩ একরের নীলাভূমি জুড়ে আজ শুধুই প্রতীক্ষার প্রহর!


মন্তব্য