© টিডিসি ফটো
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাসের অতিথি মানেই পরিযায়ী পাখি। করোনা মহামারিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হলেও হারিয়ে যায়নি ক্যাম্পাসের রূপ। সেই রূপের টানে এবারও ছুটে এসেছে পরিযায়ী পাখিকুল। কিন্তু এবার তাঁদের সওগাতে নেই কোন আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন। রয়েছে কেবল শূন্যতা। নেই ক্যাম্পাসের প্রাণপ্রিয় শিক্ষার্থীরা। তবে শূন্যতার কোন অভাব বুঝতে দেয়না লেকের পানিতে পাখিদের জলকেলির দৃশ্য।
ক্যাম্পাসে পরিবহন চত্ত্বরের পেছনের লেকে আশ্রিত শত শত সোনালি ডানার পরিযায়ী পাখি খুনসুঁটিতে ব্যস্ত। সুইমিংপুল সংলগ্ন লেকেও এসেছে পাখি। এদের কিচিরমিচির শব্দে মাতোয়ারা হয়ে আছে আশাপাশের এলাকা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকে এখন পর্যন্ত অবস্থান করা পাখির মাত্র একজোড়া পরিযায়ী গিরিয়া হাঁস ব্যতীত সবই দেশীয় ছোট সরালি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তথ্যমতে, ১৯৮৬ সালে সর্বপ্রথম ক্যাম্পাসে অতিথি পাখি আসে। বর্তমানে ১২৬টি দেশীয় ও ৬৯টি বিদেশী প্রজাতি মিলিয়ে মোট ১৯৫ প্রজাতির অতিথি ও পরিযায়ী পাখি ক্যাম্পাসের লেকগুলোতে আশ্রয় নেয়।
এদের মধ্যে দেশীয় ৭৮টি প্রজাতি ক্যাম্পাসে নিয়মিত বাসা বাধে। সেপ্টেম্বর থেকেই অতিথি পাখিদের কিছু ডাঙ্গায় শুষ্কস্থানে এবং কিছু পাখি লেকের পানিতে আশ্রয় নেয়। তবে ডিসেম্বরের মাঝামাজি থেকে মধ্য জানুয়ারী পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংখ্যক অতিথি পাখি সাইবেরিয়া, চীনের জিনজিয়াং, মঙ্গোলিয়া, নেপাল হতে আসে।
কারণ ওই সময়ে সেসব স্থানে প্রচুর তুষারপাত হয়ে থাকে। দেশের হাওড় অঞ্চল থেকেও নিরাপদ আবাসস্থল ও খাদ্যের জন্য পরিযায়ী পাখিরা আসে। এসব পক্ষীকুলের তালিকায় রয়েছে ছোট সরালি, বড় সরালি, লেঞ্জা হাঁস, গারগেনি, রাইনেক, খঞ্জনা, টাইগা, শামুক খোল, জলপিপি, ডাহুক, জিরিয়া প্রভৃতি দৃষ্টিনন্দন পাখিদের নাম। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরেই শীতের হালকা আবহে অতিথি পাখিরা ক্যাম্পাসে আসতে শুরু করে।
আর মার্চের শেষ পর্যন্ত থাকে এদের এই পদচারণা। এই সময়টাতে শীতপ্রধান দেশগুলোতে তাপমাত্রা ব্যাপক কমে যায়। লেকের পানি পরিণত হয় বরফে। এমন বৈরী পরিবেশ ও খাদ্য সংকটের কারণে টিকে থাকতে পাখিগুলো নিজ দেশ ছেড়ে বাংলাদেশের মতো তুলনামূলক উষ্ণ আর আরামদায়ক দেশে পাড়ি জমায়।
পাখিদের নিরাপদ অভয়ারন্য ও নিরাপত্তার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় এস্টেটের প্রধান উদ্যানতত্ত্ববিদ ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এলপিআর ভোগরত) মো. নুরুল আমিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রতিবছর লেকগুলো অতিথি পাখির বাসযোগ্য রাখতে পদক্ষেপ নেয়। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে লেকের পাড়ে কাটাতারের বেড়া প্রদান, সচেতনতামূলক ব্যানার টাঙ্গানো, লেকপাড়ে যানবাহন পার্কিং রোধে ব্যবস্থা নেয়া, বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে লেকের কচুরিপনা ও আবর্জনা পরিষ্কার প্রভৃতি। এতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বছরে লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করতে হয়।
‘বার্ডস অব জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস’ বইয়ের লেখক বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসান বলেন, গত সেপ্টেম্বরের শেষার্ধে অতিথি পাখির একটি দল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। এরা প্রথমে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টারের লেকে। এরপর অক্টোবরের মাঝামাঝিতে অন্যান্য লেকে আসতে শুরু করে। এ পর্যন্ত ক্যাম্পাসের বিভিন্ন লেকে সব মিলিয়ে হাজার খানেক অতিথি পাখি দেখা যাচ্ছে। যদিও প্রায় অর্ধশত পাখি ছিল করোনার সময়েও ছিল। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাখির সংখ্যা ও প্রজাতি বাড়বে।
এছাড়াও করোনার কারণে এখন পর্যন্ত ক্যাম্পাসে দর্শনার্থীদের চাপ নেই। এজন্য ধারণা করছি এ বছর অতিথি পাখির সংখ্যা অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি হবে। তবে পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক হয় এবং দর্শনার্থীদের সংখ্যা বাড়ে তখন আমাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন কোনভাবে তাদের থাকার পরিবেশ বিনষ্ট না হয়।
পাখি মেলা আয়োজনের ব্যাপারে তিনি বলেন, প্রতিবারের মতো এবারও পাখি সংরক্ষণে গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য জানুয়ারি মাসের শুরুতে যেকোন শুক্রবারে পাখি মেলার আয়োজন করা হবে। তবে করোনা মহামারির কারণে পরিবেশ ও অবস্থা বিশ্লেষণ করা হবে।