রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়-২৪ হল। © ফাইল ছবি
অনিয়মের দীর্ঘসূত্রতা, ঠিকাদারের টালবাহানা ও লালফিতার দৌরাত্ম্যে আটকে আছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বিজয়-২৪ হলের রিডিং রুম, ওয়াশরুম, গেমস রুম ও গ্যালারি রুমের সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ। পাশাপাশি অর্থের অভাব দেখিয়ে দরপত্র ফেরত পাঠানো এবং ঠিকাদার ও প্রকৌশলের সিদ্ধান্তের গড়মিলসহ বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা জানান বিজয়-২৪ হল সংসদের ভিপি মো. রাসেল মিয়া।
ফেসবুক পোস্টে ভিপি রাসেল বলেন, হলের শিক্ষার্থীদের মৌলিক চাহিদার অংশ হিসেবে রিডিং রুম, ওয়াশরুম, গেমস রুম ও গ্যালারি রুমের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের দাবি নিয়ে হল প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কাছে বারবার যোগাযোগ করেছি। হলের অব্যবহারযোগ্য ওয়াশরুমে পড়ে গিয়ে একাধিক শিক্ষার্থী মেরুদণ্ড, হাত-পা ও চোয়ালের হাড়ে আঘাত পেয়েছেন। পাশাপাশি ১৪ আসনের রিডিং রুমে পর্যাপ্ত পড়ার পরিবেশ নেই এবং হলে কোনো গ্যালারি রুমও নেই।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এসব কাজের জন্য একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও অর্থসংকটের কারণে ফাইল ফেরত এসেছে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম এবং প্রোভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলীমের হস্তক্ষেপে কাজগুলোর অনুমোদন ও বরাদ্দ পাওয়া যায়। এতে দ্রুত কাজ শুরু হবে বলে তারা আশাবাদী ছিলেন।
এদিকে, রিডিং রুমের কাজের জন্য ৫ জুলাই ২০২৬ ঠিকাদারের সঙ্গে ওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট সম্পন্ন হলেও এখন পর্যন্ত কাজ শেষ হয়নি বলে অভিযোগ করেন ভিপি রাসেল। তাঁর দাবি, ঠিকাদারকে কয়েক দফায় কাজ শুরু করার কথা বলা হলেও ‘আজ নয়, কাল’ করে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকেও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। রিডিং রুমের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, জিয়া হল, হাবিবুর রহমান হল, সোহরাওয়ার্দী হল ও মতিহার হলের রিডিং রুমের চেয়ার-টেবিলের নকশাও সংগ্রহ করে দেওয়ার কথা জানান তিনি।
লিখিত পোস্টে রাসেল স্পষ্ট করে বলেন, সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকেও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশল দপ্তরের এক লিখিত নোটিশ থেকে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট কাজের ঠিকাদার মো. আবু হানিফ টনির সঙ্গে চলতি বছরের ৫ জুলাই কাজের এগ্রিমেন্ট সম্পন্ন হয় এবং একই বছরের ৮ জুলাই কাজের আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ঠিকাদার টনিকে উল্লিখিত আসবাবপত্রের নমুনা দেওয়ার কথা মৌখিকভাবে বেশ কয়েকবার বলা হলেও তিনি নমুনা জমা দেননি।
সংশ্লিষ্ট কাজের বিলম্ব হওয়ার কারণ জানার জন্য ঠিকাদার মো. আবু হানিফ টনি বলেন, কাজটি মূলত সিদ্ধান্তহীনতার কারণে যথাসময় সম্পন্ন হয়নি। হল সংসদ ও হল প্রাধ্যক্ষ আমাকে বলে কাজটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ডিজাইনের সঙ্গে মিল রেখে করার জন্য। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্জিনিয়ারিং দপ্তরের অতিরিক্ত প্রকৌশলী মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের কাছ থেকে নিষেধাজ্ঞা আসে এবং জানানো হয় পূর্বের শিডিউল অনুযায়ী কাজ হবে, এটি কোনোভাবেই পরিবর্তন করা যাবে না। যার ফলে আমি সিদ্ধান্ত নিতে দুটানায় পড়ে যাই।
তিনি আরও বলেন, এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এবং অতিরিক্ত প্রকৌশলী কথা হলো যে, প্রয়োজন হলে ইঞ্জিনিয়ার পরিবর্তন করা হবে কিন্তু কাজের শিডিউল পরিবর্তন করা কিংবা অন্য কোনো হলের মতো করা যাবে না। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার আমাকে কোনো মাপ ব্যতিত কাজের ডিজাইন দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে যা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
ঠিকাদার টনির অভিযোগ, তিনি যখন হল সংসদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন তারা জানায় কাজটি জিয়াউর রহমান হলের মতোই করতে হবে অপরদিকে, প্রকৌশল দপ্তর থেকে কঠোরভাবে বলে দেওয়া হয় কাজটি উল্লিখিত যথা শিডিউল অনুযায়ী হবে, তা পরিবর্তন করা যাবে না। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার আমাকে কোনো মাপ ব্যতীত কাজের ডিজাইন দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে যা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজয়-২৪ হল সংসদের ভিপি মো. রাসেল মিয়া জানান, আমাদের হলের কাজটির চুক্তি হয় ৫ জুলাই এবং চলতি বছরের আগস্টের শুরুর দিকে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অনেক দিন ধরে 'কাজটি হবে, আজকে না কালকে, করে দিচ্ছি'—এমন দীর্ঘসূত্রিতায় আটকে আছে। তবে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি এবং তিনি আমাদের ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন।
অনিয়মের তথ্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইঞ্জিনিয়ার এবং ঠিকাদার উভয়ের কারণেই কাজটিতে অনিয়ম তৈরি হয়েছে, যার ফলে যথাসময়ের পরেও কাজটি সম্পন্ন হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত প্রকৌশলী মো. আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, কাজটি নির্দিষ্ট সময়ের পরেও আমরা শেষ করতে পারিনি। তবে এ বিষয়ে ঠিকাদার টনিকে চিঠি পাঠিয়েছি। আমি মনে করি, এখানে ঠিকাদারের কারণেই সময়ের বিলম্ব হয়েছে।
বিজয়-২৪ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. জামিরুল ইসলাম বলেন, মূলত কাজটি হবে, হচ্ছে—এমন করে অনেক সময় লেগে গিয়েছে। এই কাজটির বিষয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য, দায়িত্বপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলেছি। আশাবাদী, পরবর্তীকালে প্রশাসনের সহযোগিতায় অতি দ্রুতই কাজটি শুরু হবে।