রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় © সংগৃহীত
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ‘সি’ ইউনিটের অবিজ্ঞান শাখার ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যেখানে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষ স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করলেও ফেল দেখানো হয়েছে শত শত শিক্ষার্থীকে। যা দেখে হতভম্ব ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা। পাশাপাশি প্রকাশিত ফলাফল বাতিলের দাবি তুলেছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ১৩ নভেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন ইউনিট, বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শর্ত প্রকাশ করে ভর্তির পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি জারি করে রাবি প্রশাসন। সেই অনুযায়ী বিজ্ঞান ও অ-বিজ্ঞান (মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা) এই দুই শাখায় ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। উভয় শাখায় পরীক্ষার পাশ নম্বর ছিল ৪০। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বিজ্ঞান শাখার পরীক্ষার্থীদের আবশ্যিক অংশে ২৫ ও ঐচ্ছিক অংশে ১০ নম্বরসহ ৪০ পেতে হবে। তবে অবিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীদের জন্য এমন কোনো শর্ত ছিল না। তবুও অবিজ্ঞান শাখার ফলাফলে বিজ্ঞান শাখার জন্য প্রযোজ্য শর্ত প্রয়োগ করে ফেল দেখানো হয়েছে কয়েকশ শিক্ষার্থীকে। যা চরম দায়িত্বহীনতার প্রতিফলন বলছেন শিক্ষার্থীরা।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১২টি অনুষদের ৫৯টি বিভাগ ও ২টি ইনস্টিটিউটে বিশেষ কোটায় আসন রয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ৬১টি, শারীরিক প্রতিবন্ধী কোটায় প্রতি বিভাগ/ইনস্টিটিউটে আসন সংখ্যার ২ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধার পুত্র/কন্যার জন্য প্রতি বিভাগের আসন সংখ্যার ৫ শতাংশ এবং খেলোয়াড় কোটায় (জাতীয় পর্যায়ে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন) প্রতি বিভাগ/ ইনস্টিটিউটে আসন সংখ্যার ১ শতাংশ ভর্তি হতে পারবে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো কোটাই শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণ হয় না বলে জানা গেছে। ফলে কোটাধারী শিক্ষার্থীরা পাশ নম্বর তুলতে পারলেই ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে থাকেন। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো ‘সি’ ইউনিটে ফেল দেখানো শিক্ষার্থীদের ভিতরে বিভিন্ন কোটাধারী রয়েছে কয়েক ডজন ভর্তি প্রার্থী।
পরীক্ষায় ৫৪ দশমিক ৫০ নম্বর পেলেও ফেল দেখানো হয়েছে হুমায়রা আক্তার লিজাকে। তার সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস। তিনি অতি আক্ষেপ করে বলেন, ‘একজন ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী হিসেবে কত যে পরিশ্রম করেছি তার ইয়ত্তা নেই। এখন পর্যন্ত কোথাও ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাইনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সি’ ইউনিটের অবিজ্ঞান শাখায় ৪০ নম্বরে পাশ হলেও আমি ৫৪ দশমিক ৫০ পেয়েছি। তবুও আমাকে ফেল দেখানো হয়েছে। আমি সত্যিই অবাক হয়েছি। আমার পাশ হয়েছে জানলে আমি শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগের ব্যাবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে হয়ত এতদিনে ভর্তির সুযোগ পেতাম। কিন্তু এখন আমি কোথায় যাব, কার কাছে অভিযোগ জানাব?’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার সাথে অন্যায় করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আমি চাই পুনরায় রেজাল্ট প্রকাশ করা হোক এবং আমাদের প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়া হোক।’
আরেক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী শেখ সাইমুজ্জামান। পরীক্ষায় পেয়েছেন ৪৬ দশমিক ৫০, আছে খেলোয়াড় কোটাও। তাকেও ফেল দেখানো হয়েছে। কথা হয় সাইমুজ্জামানের বাবা আকরামুজ্জামানের সাথে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে সাড়ে ৪৬ পেলেও তাকে ফেল দেখানো হয়েছে। আমার ছেলে প্রফেশনাল ক্রিকেটার। ফলে তার প্লেয়ার (খেলোয়াড়) কোটা রয়েছে। কিন্তু ফেল করায় তাকে প্লেয়ার কোটার জন্য নির্ধারিত সাক্ষাৎকারে ডাকা হয়নি। আমি চাই, এই ত্রুটিপূর্ণ ফলাফল বাতিল করা হোক।’
৪৪ নম্বর পেয়েও ফেল করেছেন আরেক ভর্তিচ্ছু মো. ফরহাদ হোসেন। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমাকে অবৈধভাবে ফেল করানো হয়েছে। পুনরায় রেজাল্ট প্রকাশ করা হোক। তাতে সবার মঙ্গল হবে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক মো. ছাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কাছেও এমন অভিযোগ এসেছে। এ বিষয়ে আইসিটি সেন্টার কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট ইউনিটের। তারা এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।’
৪০ পেয়েও প্রকাশিত ফলাফলে ফেল এসেছে এমন সংখ্যার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এভাবে তো দেখা হয়নি এখনো। তবে এটা কয়েকশ হতে পারে।’
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সি’ ইউনিটের কো-অর্ডিনেটর ও জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক গোলাম মর্তুজা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এটা নিয়ে কোনো সমস্যা নাই। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে একটা মিটিং ডাকা হয়েছে। মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত আমরা ইনফর্ম করব।’
সার্বিক বিষয়ে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক মোহা. ফরিদ উদ্দীন খানের সাথে। অনিয়মের বিষয়ে তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এ বিষয়ে অবগত আছি। আগামী রবিবার (১৯ এপ্রিল) এ নিয়ে মিটিং কল করা হয়েছে। সেখানে আমরা একটা সিদ্ধান্ত নেব।’