নাজমুল হাসান সিয়াম © টিডিসি সম্পাদিত
নাজমুল হাসান সিয়াম। একই সঙ্গে দেশের শীর্ষ দুই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তিনি। মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে একটি মাদ্রাসার আলিমের সনদ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের স্নাতকে ভর্তি হয়েছেন। তার আগের শিক্ষাবর্ষে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে নটর ডেম কলেজের এইচএসসির সনদ দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর (জাবি) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হয়েছেন ২০২২–২৩ শিক্ষাবর্ষের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগে।
সিয়াম বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষে আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষের অধ্যয়ন করছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ক্লাস রোল ১১৮০ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজি নজরুল ইসলাম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবেও অবস্থান করছেন। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ক্লাস রোল ৩১ এবং তিনি কবি জসিমউদ্দীন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নাজমুল হাসান সিয়াম ২০২২ সালে নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর ঢাবিসহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা অংশ নেন। তবে ঢাবিতে চান্স না পেলেও পেয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে।
এবার প্রশ্ন আসে, কীভাবে তিনি ২০২২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ২০২৩-২৪ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ ভর্তি হয়। যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শুধু মাত্র একবারই দেওয়া যায়।
জানা গেছে, নাজমুল হাসান ২০২২ সালে নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা ও ২০২৩ সালে নারায়ণগঞ্জ বন্দর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে আলিম ও ২০২১ সালে দাখিল পাস করেন।
২০২২-২৩ সেশনে প্রথমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষাও দেন তিনি। তবে সে বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলেও পরের বছর, ২০২৩ সালে নারায়ণগঞ্জ বন্দর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে পাস করা আলিমের সনদ দিয়ে আবারও ভর্তি ফর্ম তোলেন তিনি এবং দ্বিতীয়বারের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
‘‘হাউই ইজ দিস পসিবল? এটা তো আমার নলেজে নেই। আমি আশ্চর্য হচ্ছি। যেহেতু ভর্তির বিষয়, আমাকে তথ্যটা আগে জানতে হবে। কোথায় কীভাবে হলো, কোন ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছে ইত্যাদি, এটা তো সেনসিটিভ বিষয়। আমরা অফিশিয়ালি ইনভেস্টিগেশন করব—মুনসী শামস উদ্দিন আহাম্মেদ, ঢাবির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার
শুধু তাই নয়, একই সাথে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করার সুযোগ পান তিনি। এরপর ঢাবিতে নিয়মিত প্রথম বর্ষের ক্লাস ও পরীক্ষা সব কিছুতেই অংশগ্রহণ করেন তিনি। প্রথম বর্ষের ফলাফলে সিজিপিএ ৩.০০ (ফাস্ট ক্লাস) অর্জন করেন তিনি। তবে দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস শুরু হলে তাকে আর নিয়মিত ক্লাস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়নি।
দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে একসাথে পড়াশোনার বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী সিয়াম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি কলেজে পড়াশোনা করার পাশাপাশি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছি। প্রথমে ২০২২ সালে নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। আবার ২০২৩ সালে মাদ্রাসা বোর্ড থেকে আলিম পরীক্ষা দিয়েছি। আমি শুরু থেকেই স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা সব বোর্ড থেকে পরীক্ষা দিয়েছি। দুইটা আলাদা বোর্ডে পড়াশোনা করা যায়, কোনো সমস্যা হয় না।
তিনি বলেন, আমার সনদ হচ্ছে দুইটা। তো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে ইলিগ্যাল কিংবা লিগ্যালের কোনো বিষয় নাই। আমি মাদ্রাসার থেকে ২০২৩ সালে পরীক্ষা দিয়েছিলাম, তো আমার যেহেতু আলাদা রেজিস্ট্রেশন, তারপর আলাদা আলাদা শিক্ষা বোর্ড হওয়ার সুবাদে ওই সার্টিফিকেট দিয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে অ্যাডমিশন টেস্টে জাস্ট কিউরিয়াস হয়ে রেজিস্ট্রেশন করছি এবং আমার রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। এবং হওয়ারই কথা, যেহেতু আমার সবকিছু আলাদা। ২০২৩-২৪ সেশনে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টা সেকেন্ড টাইম। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে সেকেন্ড টাইম পরীক্ষা দিয়া মোটামুটি চান্স পেয়েছি।
ঢাবির কেন্দ্রীয় ভর্তি অফিসের সদস্য অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, একবারের বেশি কেউ পরীক্ষা দিতে পারে না। এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মে নেই। আমাদের সিস্টেমে তো এসএসসি বা এইচএসসির রোল ও রেজিস্ট্রেশন নাম্বার দিয়ে সব চেক করা হয়। যদি বোর্ড আলাদা হয় এবং সে ভিন্ন তথ্য ব্যবহার করে, তবে ধরা কঠিন। আমরা সাধারণত নিজের নাম, পিতার নাম ও মাতার নাম মিলিয়ে দেখি। কিন্তু সে যদি স্পেলিং (বানান) পরিবর্তন করে দেয়, তবে সিস্টেমে ম্যাচিং পাওয়া কঠিন।
অভিযুক্ত নাজমুলের মাদ্রাসা ও স্কুল কলেজের সার্টিফিকেটে পিতা, মাতার নাম একই থাকলেও নিজের নামের মধ্যে ভিন্নতা খোঁজে পাওয়া যায়, স্কুল, কলেজের সনদে নিজের নাম নাজমুল হাসান সিয়াম থাকলেও মাদ্রাসার সার্টিফিকেটে তার নাম নাজমুল হাসান।
অর্থাৎ নামের ভিন্নতা থাকার কারণে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পায়।
নামের ভিন্নতার বিষয়ে নাজমুল দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি পিএসসি পরীক্ষা ব্যতীত, উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত সবগুলো বোর্ড পরীক্ষা দিয়েছি। তবে নারায়ণগঞ্জের বি, এম ইউনিয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজে জেএসসি পরীক্ষার রেজিষ্ট্রেশন করার সময় নামের সাথে ডাকনাম সিয়াম যুক্ত করা হয়, তবে পরের বছর মাদ্রাসা বোর্ডের পরীক্ষার রেজিষ্ট্রেশন করার সময় আমার আব্বু ভুলবশত নামের সাথে ডাকনাম যুক্ত করা হয়নি। যেহেতু দুইটাই আলাদা বোর্ড, সবকিছু আলাদা তাই পরবর্তীতে রেজিস্ট্রেশনের নাম আর ঠিক করা হয়নি।
তিনি বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মোটামুটি এক ব্যাচ এগিয়ে গিয়েছিলাম। আমার ইচ্ছা ছিল না আরও এক বছর গ্যাপ দিয়ে আবার ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার। বাসা থেকে বলেছিল, ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে কন্টিনিউ কর, বাসার কাছাকাছি আছে। এখানেই তো ভালো, এই জায়গায় সবকিছু। তারপরে সাবজেক্ট চয়েজও দিয়েছিলাম ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে, ভালো উপরের দিকের বিষয়গুলো যেমন: ইংলিশ, আইআর, পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, জার্নালিজমও ছিল। কিন্তু সারপ্রাইজ হওয়ার মতো সাবজেক্ট আসে জার্নালিজম আর আমি অলরেডি এদিকে সাংবাদিকতা বিভাগে আছি। সাংবাদিকতা বিভাগ আসার পরে বাসা থেকে বলে, ঢাকা ইউনিভার্সিটিতেই পড়ো। জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি বাতিল কর। বাট আমি বলতাম, জাহাঙ্গীরনগরে তো এক বছর আগায় গেছি, একই বিষয়, একই পড়াশোনা।
‘‘তাই আমি একটা কনফিউশন, কনফ্লিক্টের ভিতরে ছিলাম, তারপরেও ঢাকা ইউনিভার্সিটিতেই ভর্তি হলাম, জাহাঙ্গীরনগরে ক্যানসেল করব এরকম একটা সিচুয়েশন। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পরে মনে হয় আমার তো সার্টিফিকেট সবকিছু আলাদা, তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীরনগরে ক্যানসেল করার কোনো প্রয়োজন নাই। পরে ফার্স্ট ইয়ারে জাহাঙ্গীরনগর থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগরে মোটামুটি এক বছর পড়াশোনা করে ফেলছি, বন্ধুবান্ধব হয়েছে আবার জাবিতে ভালো ফল পেলাম, পরিবেশ ভালো। আবার প্রথম দিকে একটি প্রিন্ট পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করি। এদিকগুলো বিবেচনা করে এখানে থেকে গিয়েছিলাম।’’
ভর্তি বাতিলের বিষয়ে জানতে চাইলে নাজমুল বলেন, আমি ভর্তি ক্যানসেল করে দিতাম, ঈদের আগে থেকেই আবেদন জানাব এরকম প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সময়সাপেক্ষ বিষয় হওয়ার আমি সাথে সাথে ভর্তি বাতিল করিনি। আমার যেহেতু এই জায়গায় ক্যানসেল করার কোনো প্রয়োজন ছিল না, তাই আর ক্যানসেল করার কোনো প্রয়োজন বোধ মনে করি নাই। আমি মনে করেছিলাম ক্লাস পরীক্ষা না দিলে অটোমেটিক ভর্তি বাতিল হয়ে যাবে। তাই তৃতীয় সেমিস্টার থেকে আমি আর ক্লাস পরীক্ষা কন্টিনিউ করিনি।
তিনি আরও বলেন, আমি ডিন স্যারের বরাবর ভর্তি বাতিলের আবেদন করেছি। ভর্তি বাতিলের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ভর্তি অফিস সূত্রে নাজমুল হাসানের বর্তমান অ্যাকাডেমিক অবস্থা থেকে জানা যায়, তিনি গত ৯ জানুয়ারি দ্বিতীয় বর্ষের ভর্তির ফি আদায় করছিল।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সভাপতি মৃধা মোহাম্মদ শিবলী নোমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিসের শিক্ষা শাখা। তবে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ না আসলে বা বিষয়টি ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তাদেরও থাকে না। সম্প্রতি এ বিষয়ে আলোচনা এসেছে, প্রশাসন স্বপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখবে কিনা, সে বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষই দায়িত্বশীল উত্তর দিতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, স্বাভাবিকভাবে একই সঙ্গে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ থাকে না, পাবলিক-প্রাইভেট যাই হোক না কেন। তবে আমি মনে করি, এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের কর্তৃপক্ষেরও করণীয় রয়েছে। প্রকাশিত সংবাদ থেকে দেখা যাচ্ছে, এই শিক্ষার্থী সাধারণ শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষার আলাদা সনদপত্র ব্যবহার করে ভিন্ন দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। দেশে প্রচলিত বিভিন্ন ধারার শিক্ষাব্যবস্থার ভেতর সমন্বয় ছাড়া এ ধরনের পরিস্থিতির আইনি সমাধান দুরূহ।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) নীতিমালা অনুযায়ী, একই সময়ে একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ডিগ্রি অর্জন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ভর্তি ও অধ্যয়ন সংক্রান্ত নীতিমালায় বলা হয়েছে, একজন শিক্ষার্থী এক সময় কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি ডিগ্রি প্রোগ্রামে অধ্যয়ন করতে পারবেন। তথ্য গোপন করে একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিল, ছাত্রত্ব বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহাম্মেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, হাউই ইজ দিস পসিবল? এটা তো আমার নলেজে নেই। আমি আশ্চর্য হচ্ছি।
তিনি বলেন, যেহেতু ভর্তির বিষয়, আমাকে তথ্যটা আগে জানতে হবে। কোথায় কীভাবে হলো, কোন ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছে ইত্যাদি, এটা তো সেনসিটিভ বিষয়। আমরা অফিশিয়ালি ইনভেস্টিগেশন করব।