অনন্য গাঙ্গুলী © সংগৃহীত
পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি— তিন পরীক্ষাতেই মেধার প্রমাণ দিয়ে বৃত্তি পেয়েছিলেন অনন্য গাঙ্গুলী। কিন্তু কলেজে উঠে নানা কারণে পিছিয়ে পড়েন। ৫ বছর পর ফিরেই আবারও নিজের অনন্যতার পরিচয় দিলেন। এইচএসসি পরীক্ষাতেও কুড়িয়ে নিলেন জিপিএ-৫। আর ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাতে ঘ ইউনিটের অর্জন করলেন প্রথম স্থান। মোট ১০৩ দশমিক ৯৫ নম্বর পেয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ইংরেজি বিভাগে। কিন্তু শনিবার (৩১ জানুয়ারি) রাতে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর পৌর শহরের বাজার পাড়ার নিজ বাসা থেকে ঢাবির মেধাবী এই শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
পরিবার বলছে, অনন্য আত্মহত্যা করেছে। তার অকাল মৃত্যুতে পরিবারসহ গোটা এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষা জীবনে অনন্য মেধার স্বাক্ষর রাখা এই ‘অনন্য’ কেন আত্মহননের পথ বেছে নিলেন?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিটি পরতে মেধার স্বাক্ষর রেখে চলা অনন্যের শিক্ষাজীবন ছিল গল্পের মতোই ট্রাজিক। ৫ম শ্রেণির পিএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন অনন্য গাঙ্গুলী। কিন্তু মাধ্যমিকে উঠেই অনিয়মিত হয়ে ওঠেন তিনি। এ সময়ে শরীরে দানা বাঁধতে শুরু করে নানা অসুখ। নিয়মিত ‘অনিয়মিত’ হয়ে ওঠা মেধাবী অনন্য এসএসসির নির্বাচনী পরীক্ষাতেও খুব একটা ভাল ফল আনতে পারলেন না। কিন্তু ফাইনালে ঠিকই চেনালেন নিজেকে। কোটচাঁদপুর সরকারি মডেল পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি।
এরপর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০১৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় বসার কথা ছিল অনন্যের। কিন্তু মানসিক অসুস্থতা তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে দীর্ঘ সময়। নানা জায়গায় দৌড়-ঝাঁপ করে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর ২০২১ সালে কোটচাঁদপুরের সরকারি খন্দকার মোশাররফ হোসেন ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন অনন্য। এ পরীক্ষাতেও তিনি জিপিএ-৫ অর্জন করতে সক্ষম হন।
অনন্য তার এই সংগ্রামের গল্প একটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে নিজেই জানিয়ে গিয়েছিলেন। তার ভাষ্য— ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার গ্যাস্ট্রিক আলসারের কিছু জটিলতা দেখা দেয়। সে সময় বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলও বেশ খারাপ হয়েছিল।
এসএসসির পর এই মানসিক আরও প্রকট হতে শুরু করে। অনন্য বলেন, তখন মেজর ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার, ওসিডি ও অ্যাংজাইটিতে ভুগছিলাম আমি। প্রথমে যশোর, এরপর ঢাকায় চিকিৎসা হল। উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের তামিলনাড়ুর ভেলোরের একটি হাসপাতালেও নেওয়া হল। এসব চিকিৎসা নিয়ে মানসিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও তখনও নিজেকে আমি পুরোটা ফিরে পাইনি।
এ অবস্থায় ভারতে চিকিৎসা নেওয়ার পর দেশে নিয়মিত কাউন্সেলিং চলতে থাকে অনন্যের। কিছুটা সুস্থ বোধ করলে ২০২১ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। মাত্র কয়েক মাস আগে পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন। করোনাকালে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে এইচএসসি পরীক্ষা হওয়ায় সহজেই জিপিএ-৫ ছিনিয়ে আনেন তিনি। তার ভাষ্যে গল্পটা এরকম— রেজিস্ট্রেশনের নিয়ম অনুযায়ী সে বছরই ছিল আমার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার শেষ সুযোগ। নইলে রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে যেত। এইচএসসির পর প্রথম ভর্তি পরীক্ষা ছিল বিইউপিতে (বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস)। প্রস্তুতি ছাড়াই সেখানে পরীক্ষা দিলাম। চান্সও পেয়ে গেলাম। তখন উপলব্ধি হলো, না পড়ে যদি বিইউপিতে চান্স পাই, তাহলে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও তো পেতে পারি। তখন থেকেই ঘ ইউনিট–কেন্দ্রিক পড়াশোনা শুরু করি। একটি কোচিং সেন্টারের অনলাইন ব্যাচে ভর্তি হই। অনলাইন হওয়ার সুবাদে বাসায় থেকেই ক্লাস করতাম। নিয়মিত পড়তাম তখন। দিনের বেশির ভাগ সময়ই বইয়ের পেছনে লেগে থাকতাম। কোচিং সেন্টারের লেকচারগুলো থেকে নোট নিয়ে রাখতাম। বাংলা ও ইংরেজিতে আগে থেকে দক্ষতা ছিল বলে ব্যাপারটা আমার জন্য বেশ সহজ হয়ে গেল।
অনন্যের বাবা প্রদ্যুৎ কুমার গাঙ্গুলী কোটচাঁদপুর পৌর মহিলা ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। তার মা রাধারানী ভট্টাচার্য্য স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। তার ছোট বোন লিথি মনি গাঙ্গুলীও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। মৃত্যুর কারণ হিসেবে অনন্যের পরিবার বলছে, দীর্ঘদিনের সেই মানসিক যন্ত্রণা থেকেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। কোটচাঁদপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছি। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত হতে পারব।