রাবিতে বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াড ২০২৬ অনুষ্ঠানে © সংগৃহীত
বর্ণাঢ্য আয়োজন ও উৎসবমুখর পরিবেশে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে আজ অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াড (BDEO) ২০২৬’-এর রাজশাহী আঞ্চলিক পর্ব। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় নয়শ’রও বেশি শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। পরীক্ষার্থীরা তাদের অর্থনৈতিক জ্ঞান ও বিশ্লেষণী দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে।
শনিবার (১০ জানুয়ারী) দিনব্যাপী এই আয়োজনে তিনটি ক্যাটাগরিতে শিক্ষার্থীরা অর্থনৈতিক জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা প্রদর্শন করে মেধার স্বাক্ষর রাখেন। দিনের শুরুতেই সকালে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন ও আসন গ্রহণের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। দেড় ঘণ্টার প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পর স্ক্রিপ্ট মূল্যায়ন ও বিরতি শেষে দুপুর ১২ টায় মূল অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণী পর্ব শুরু হয়।
অনুষ্ঠানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. সালেহ হাসান নকীব প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিতি ছিলেন। আরও ছিলেন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মাঈন উদ্দিন, অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) প্রফেসর মো. ফরিদ উদ্দিন খান। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মো. বায়েজিদ সরকারের কি-নোট স্পিচ ছিলেন। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ. এন. কে. নোমান এবং সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পূবালী ব্যাংক পিএলসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ আলী, সিটি ব্যাংকের সিনিয়র এসিট্যান্ট ভাইস প্রসিডেন্ট ও সিনিয়র ম্যানেজার রেজা ফউজুল করিম এবং বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের এম্বাসেডর মো. মানসুরুল হক।
বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের সভাপতি মো. আল-আমিন পারভেজ জানান, দেশের স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা এবং বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতার বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াড। আমরা চাই আমাদের তরুণ প্রজন্ম অর্থনীতির জটিল বিষয়সমূহ সহজে উপলব্ধি করতে পারুক, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হোক এবং সেগুলোর যুক্তিসঙ্গত ও বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে পারুক।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. সালেহ হাসান নকীব বলেন, আমাদের জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইকোনোমিকস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। লেনদেনের ক্ষেত্রে আমাদেও দেশে এখনো ক্যাশে ট্রান্সিকশন হয়, কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো সব ক্যাশলেস কার্যক্রম চালায়। আসন্ন দিনগুলোতে অর্থনীতি মেশিন লার্নিং নির্ভর হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অর্থ্যাৎ অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রন করবে প্রযুক্তি। ফলে সামনের দিনগুলো অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং এবং ইস্টারেস্টিং হবে। এই জায়গায় বাংলাদেশ ইকোনমিক অলিম্পিয়াডের মতো প্ল্যাটফর্ম ভালো অবদান রাখবে বলে মনে করি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিরেক্টর মো. বায়েজিদ সরকার বলেন, বাংলাদশের অর্থনীতির ভাষা হচ্ছে এদেশর মাটি ও মানুষ। কিন্তু আমাদের দেশে অর্থনীতি বিষয়কে খুব জটিল করে পড়ানো হয়। আসলে অর্থনীতির ডেফিনেশান এতটা কঠিন না। কারণ এই বিষয়টা অনেকটা অনুধাবনের। এই জায়গায় বাংলাদেশ ইকোনমিক অলিম্পিয়াড দেশের অর্থনীতিকে বুঝার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আমরা নিজেকে চিনবো, আমার দেশকে এবং দেশের মাটিকে চিনবো, তাহলে আমাদের অর্থনীতি হবে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সেরা অর্থনীতি।
পূবালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও বাংলাদেশে ডিজিটাল কারেন্সির গুরুত্ব সম্পর্কে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেন। ডিজিটাল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে এর কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের এম্বাসেডর মো. মানসুরুল হক কর্তৃক পরিচালিত ইন্টারেক্টিভ সেশন শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। এই সেশনে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার, বাস্তব জীবনের অর্থনৈতিক সমস্যা সম্পর্কে জানার এবং ক্যারিয়ার পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
পরীক্ষামূলক বাছাই পর্ব শেষে তিনটি ক্যাটাগরিতে শীর্ষ বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। জুনিয়র ক্যাটাগরি বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন ইশরাত জাহান। দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছেন নুসরাত জাহান এবং তৃতীয় হয়েছেন তাসফিয়া আহমেদ। ইন্টারমিডিয়েট ক্যাটাগরি বিভাগে সফলতার সাথে বিজয়ীর তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন আবিদ হাসান সায়েম, আদনান আবির এবং রবিউল আওয়াল। এডভান্স ক্যাটাগরিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত এই বিভাগে শীর্ষ তিনটি স্থানই দখল করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিজয়ীরা হলেন— রওজাতুন নূর বর্ণা, তামান্না ইয়াসমিন তৈশি এবং মো: রানা ইসলাম। অনুষ্ঠানের শেষে বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট এবং তিন পর্বের চ্যাম্পিয়নদের ১০ হাজার টাকার চেক তুলে দেওয়া হয়। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বাসেডরদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন অতিথিরা।
অনুষ্ঠান শেষে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীদের মাঝে অর্থনীতি, ফিনানশিয়াল লিটারেসি এসব নিয়ে উৎসাহ ও আগ্রহের প্রকাশ পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীদের থেকে জানা যায়, এই অলিম্পিয়াড অর্থনীতির বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে চিন্তা করতে শিখিয়েছে। শুধু পাঠ্যবইয়ের সূত্র মুখস্থ করা নয়, বরং চারপাশের অর্থনৈতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে।
বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াড শুধুমাত্র একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি দেশব্যাপী অর্থনৈতিক সাক্ষরতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। অর্থনীতি বোঝা আজকের যুগে অত্যন্ত জরুরি - মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার, বেকারত্ব, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, টেকসই উন্নয়ন - এসব বিষয় সম্পর্কে সচেতন নাগরিক তৈরিতে এই ধরনের অলিম্পিয়াড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।