পেজে লাইক দেওয়ায় ঢাবি ছাত্রের উপর যেভাবে চলে গেস্টরুমে ছাত্রলীগের নির্যাতন

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১০:৪৪ PM , আপডেট: ২৪ জুলাই ২০২৫, ১২:০৮ PM
নির্যাতিত ছাত্রলীগের নেতারা

নির্যাতিত ছাত্রলীগের নেতারা © সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের গেস্টরুমে নির্যাতনের অভিযোগ বহু পুরোনো। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এসব ঘটনা সামনে আসছে। গত ১৬ বছরে ছাত্রলীগের বিভিন্ন নির্যাতনের কথা গণমাধ্যমেও উঠে এসেছে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর ভুক্তভোগীরা তাদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। 

তেমনি একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-১৪ সেশনের আরবী বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল মা’বুদ। ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক ছাত্র। গেস্টরুমে নির্যাতনের কথা প্রকাশ করেছেন তিনি। বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ফেসবুকে তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে এক পোস্টে তিনি এ নির্যাতনের কথা বর্ণনা করেন।    

আব্দুল মা’বুদ লেখেন, একটা সময় আমার মনে হতো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে জীবনে অনেক বড় ভুল করে ফেললাম কিনা! বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়াটাই কি ভুল ছিল! দীর্ঘ সময় আমি এই চিন্তাতেই বিভোর থেকেছি। এমন অনেকবার মনে হয়েছে যে, সবকিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে আবার গ্রামে ফিরে যাই। এভাবে দাসত্বের জীবন টেনে নিয়ে বেড়ানোর চেয়ে সেটাই আমার জন্য কল্যাণকর।

গল্পের শুরুতে তিনি লেখেন, আমি আব্দুল মা'বুদ। আর এটা আমার গল্প। কখনও ভাবিনি, এভাবে জোর গলায় আমার জীবনের সবচেয়ে দুর্বিষহ অভিজ্ঞতাকে দুনিয়ার মানুষের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পাবো বা সেই হিম্মত দেখাতে পারবো। বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলের জেলা রংপুরে আমার জন্ম। যে এলাকার মানুষকে সবাই সহজ-সরল হিসেবে জানে। এমনই এক সহজ-সরল পরিবারে আমার বেড়ে ওঠা। বাবা পেশায় একজন মাদ্রাসা শিক্ষক এবং একইসাথে মসজিদের ইমাম।

তার পরিবার ও লেখাপড়ার বিষয়ে বলেন, আট ভাইবোনের বিশাল সংসারে আমি সপ্তম সন্তান। এলাকার মাদ্রাসায় পড়ালেখা করে ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন ক্লাসে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিসহ কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করেছি। ২০১২ সালে পাবনা ইসলামিয়া মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসি। সে সময় আমার বাবা এবং প্রবাসী এক বড় ভাইয়ের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করি এবং আল্লাহর অশেষ রহমতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী  বিভাগে চান্স পাই। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার তাৎপর্য আমি এভাবে অনুভব করতে পেরেছিলাম যে, পরিবারের বাইরেও গোটা গ্রামের মানুষজন আমার এই চান্স পাওয়ার ঘটনায় অনেক খুশি হয়েছিলো। কারণ, তখনো পর্যন্ত এই গ্রাম থেকে কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়নি। অর্থাৎ, আমিই ছিলাম আমার এলাকা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা প্রথম সন্তান। পরিবার, এলাকাবাসীর আশা-আকাংক্ষা আর নিজের ভবিষ্যৎ স্বপ্নকে সাথে নিয়ে ২০১৩ সালে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি আমার জীবনের পরবর্তী যাত্রা শুরু করি। 

হল লাইফের বিষয়ে তিনি লেখেন, আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক ছাত্র ছিলাম। ফার্স্ট ইয়ারের শুরুতেই আমি হলে উঠি। আমাদের জন্য তখন সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় ছিল হলের গেস্টরুম কালচার। প্রথমদিন হল-এ এসেই রাতে যখন শুনি সবাইকে গেস্টরুমে ডাকছে তখন ভেবেছিলাম কোনো গেস্ট এসে অপেক্ষা করছে হয়তো। আর গেস্টরুম হচ্ছে যেখানে বাহির থেকে গেস্ট এসে অবস্থান করে বা থাকে। কিন্তু বাস্তবের ধারণা পুরোপুরিই বদলে গেলো প্রথম রাতের গেস্টরুম অভিজ্ঞতার পর। গেস্টরুমের সাথে গেস্ট থাকার কোনো সম্পর্ক নেই আসলে। বরং এই শব্দটা দিয়ে একটা রেওয়াজ বা সংস্কৃতি বোঝায়। গেস্টরুম হচ্ছে হলের সেই খাস কামরা যেখানে প্রথম বর্ষে হল-এ ওঠা সকল ছাত্রকে একত্রিত করে মানসিক এবং ক্ষেত্র বিশেষে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। আর, এই জিনিসটা করা হয় হলের সিনিয়র কর্তৃক জুনিয়রদের ম্যানার বা উত্তম আচার-ব্যবহার শেখানোর নাম করে। যেমন – সিনিয়রকে ভুল করেও সালাম না দেওয়ার ব্যাপারটা যে এত ভয়াবহ মাত্রার অপরাধ হতে পারে, অথবা সালাম যে এভাবে জোর করে নিতে হয় বা নেওয়া যায় – এরকম কোনো ধারণা আমার এর আগে কোনোদিন ছিল না। কোন গলিতে কোন বড় ভাইয়ের সাথে দেখা হলে সালাম দেওয়া হয়নি, কে কে পলিটিক্যাল প্রোগ্রামে যায়নি, কাকে ক্যাম্পাসের কোন নিষিদ্ধ জায়গায় দেখা গেছে যেখানে ফার্স্ট ইয়ারের কোনো ছাত্রের যাওয়া সিনিয়র কর্তৃক কঠোরভাবে নিষেধ – এ সমস্ত কিছু নিয়েই মূলত বিচার বসতো প্রতিরাতের গেস্টরুমে। আর সেটা এমনই এক বিচার ব্যবস্থা ছিল যেখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ নেই। কারণ, আত্মপক্ষ সমর্থন করা মানে বড় ভাইদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, যেটা নিঃসন্দেহে আরো গুরুতর অপরাধ। রাত নয়টা/দশটায় শুরু হয়ে কখনও দুইটা/তিনটা বেজে যেতো গেস্টরুমের এই তামাশা শেষ হতে হতে। এভাবেই চলছিলো আমাদের গেস্টরুম সংস্কৃতির নিত্যদিনের উদ্‌যাপন। আর হল-এ থাকতে হলে গেস্টরুমে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক। এটাই হলের অঘোষিত নিয়ম। এর বাইরে প্রথম বর্ষের জন্য আরেক বিভীষিকার নাম ছিল গণরুমের ফ্লোরে ফ্লোরিং করে একসাথে ২০/২৫ জনের বসবাস।

একরকম বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যেই কাটতে লাগলো আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। গ্রাম থেকে ঢাকায় আসা আমার মতো অপরিপক্ব এক তরুণের জন্য প্রথম বর্ষের শুরুতেই এইসব গ্লানিময় ধকল সহ্য করা কঠিন হয়ে উঠছিলো দিন দিন। হতাশা গ্রাস করছিলো আমাকে। নিজেকে কখনও কখনও মনে হতে লাগলো – এক অসহায় দাস। যেদিন গেস্টরুম থাকতো না সেদিন দাসত্বের বেড়া ডিঙিয়ে অনেকটা স্বাধীনতার স্বাদ পেতাম। আর গেস্টরুমের দিনগুলোতে বুকে কাঁপন উঠতো প্রায় সবারই। কারণ, এটা নিশ্চিত ছিল যে সিনিয়ররা কিছু না কিছু ভুল খুঁজে বের করবেই। তারপরই শুরু হবে মা-বাপ তুলে গালিগালাজ থেকে শুরু করে অমানুষিক মানসিক নিপীড়ন। কপাল খারাপ থাকলে কারো কারো শরীরেও প্রবাহিত হতো সেই নিপীড়নের ছাপ। তখনও আমি জানি না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন আমাকে নিত্যদিনের চলমান এই নিপীড়ন ভোগ করা থেকে মুক্তি দিবে এর চেয়েও তীব্র শারীরিক নিপীড়নের শিকার বানিয়ে।

 গেস্টরুমে ছাত্রলীগের নির্যাতনের বিষয়ে তিনি লেখেন, যেদিন ঘটনা টা ঘটলো সেদিন রাতে গেস্টরুম ছিল। মুখে দাড়ি এবং পাঞ্জাবি-পায়জামা- টুপি পরিহত থাকার কারণে গেস্টরুমে আমার উপর বেশি নজর রাখা হত এবং চাপে রাখা হত। আর, কোনো এক কারণে আমি সেই গেস্টরুমে উপস্থিত হতে পারিনি। এটা নিয়ে বরিকুল ইসলাম বাঁধন সঙ্গীত (১২-১৩ সেশন) নামে সেকেন্ড ইয়ারের হলের ইমিডিয়েট সিনিয়র এক বড় ভাই আমাকে ফোন দেয়। বাঁধন পরবর্তীতে ছাত্রলীগের বঙ্গবন্ধু হল শাখার সভাপতি হয়। ছাত্রলীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতিও সে। তো সেদিন আমাকে ফোন দিয়েই জিজ্ঞেস করে যে, আমি কোথায় আছি। আমি তাকে জানালাম যে, আমি একটা জরুরি কাজে বাইরে এসেছি। তখন আদেশের সুরেই সে বললো ‘জরুরি কাজ বাদ, তোকে ইমিডিয়েটলি গেস্টরুমে আসতে হবে’। বাধ্য হয়ে আমি তখন গেস্টরুমে ফিরে আসি। যেভাবেই হোক সেদিন আসলে আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে গেস্টরুম আছে।এছাড়া ব্যক্তিগত কিছু কাজও ছিল যার জন্য মানসিকভাবে একটু প্রেশারে ছিলাম। এ কারণে সম্ভবত গেস্টরুম থাকার ব্যাপারটা আমার মাথা থেকে চলে গিয়েছিলো। তো আমি ফিরে আসার পর বাঁধন শুরুতেই আমার ফোনটা কেড়ে নেয় এবং জিজ্ঞেস করে যে, আমি ফেসবুক চালাই কিনা। এরপর আমার থেকে ফেসবুকের পাসওয়ার্ড নিয়ে আমার ফেসবুক আইডি, অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া, এমনকি আমার পুরো ফোনই সে চেক করা শুরু করে। 

পেজে লাইককে কেন্দ্র করে নির্যাতন শুরু হয় উল্লেখ করে তিনি লেখেন, দীর্ঘ সময় ঘাঁটাঘাঁটির পর ফেসবুকে ‘সোনার বাংলা’ নামে একটা পেইজে আমার ফলো দেয়া দেখে সেটা নিয়েই প্রশ্ন শুরু করে যে, এই পেইজে আমার ফলো দেওয়া কেন। তখন তার পাশ থেকে আরেকজন বলে ওঠে, ‘সোনার বাংলা তো জামায়াতের পত্রিকা, এই ছেলে নিশ্চিত শিবির করে। ওকে ধরে সাইডে রাখ।’ এরপর আমাকে একপাশে রেখে বাকিদের মধ্য থেকে আরও একজনকে এভাবে ধরে আমার পাশে আনে। তার নাম সুমন, সেও আমারই ব্যাচের, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ডিপার্টমেন্টের, জেলা পঞ্চগড়।এর কিছুক্ষণ পর সেখানে আরো কয়েকজন সিনিয়র ভাই আসে। এর মধ্যে মুনতাসির নামের একজন ছিল সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্টের, বাড়ি সাতক্ষীরায়। নাহিদ নামের আরেক সিনিয়র ফিনান্স ডিপার্টমেন্ট  (যার বাড়ি গোপালগঞ্জ  ) এসে আমার ফেসবুক আবার চেক করা শুরু করে কিছুক্ষণ পর বলে ওঠে, ‘এর ফেসবুক দেখে তো মনে হচ্ছে এ জামায়াত-শিবির করে।’

এরপর অকস্মাৎ আমার আর সুমনের চোখ বেঁধে ফেলে ওখানে টর্চারে ছিলেন ইমিডিয়েট সিনিয়র, বরিকুল ইসলাম বাধন, সঙ্গীত ১২-১৩ সেশন।, পিতা- নোহা মনিরুল ইসলাম, গ্রাম-রাজনগর, পো- আবুরী মাগুড়া,থানা- মিরপুর, জেলা-কুষ্টিয়া।স জীব পলিটিক্যাল সায়েন্স ২০১২-১৩ সেশন,যশোর  বর্তমানে জনতা ব্যাংক নোয়াখালি শাখায় কর্মরত, ছানাউল্লা সূর্য , পিতা-সাজিদুর রহমান, গ্রাম পবহাটি মোল্লাবাড়ী,পোঃ-থানা-জেলা-ঝিনাইদহ ,রাকিব হাসান, আই আর সেশন ২০১২-১৩ পিতা-আবুল হাসান ৫১৫-১  শিশুবন , গোপালগঞ্জ সদর, গোপালগঞ্জ বর্তমানে কাউন্টার টেরোরিজমে কর্মরত,আবু জাফর সোহাগ ইসলামিক স্টাডিজ, ২০১২-১৩ সেশন,পিতা মোজাম্মেল হক, শাহানাজ খাতুন, গ্রাম-চর রাখাইল,থানা-ইবি, পো- উজান গ্রাম,জেলা-কুষ্টিয়া, অন্যান্যরা। একজন কোমর থেকে চামড়ার বেল্ট খুলে সেটা দিয়েই আমাদেরকে মারা শুরু করে। আমরা ফ্লোরে গড়াগড়ি দিয়ে মার খাচ্ছিলাম। এভাবে অনেকটা সময় নিয়ে আমাদের উপর বেল্টের বাড়ি চললো। কিছু সময় পর এর সাথে যুক্ত হয় ক্রিকেট স্ট্যাম্প। ততক্ষণে প্রায় ২০ জন জড়ো হয়ে গেছে সেখানে। ক্রমাগত বেল্ট আর স্ট্যাম্প দিয়ে পিটানোর পাশাপাশি একটু পর পর চলে ঘুরেফিরে একই প্রশ্ন। ‘তোদের সাথে আর কে কে আছে?’, ‘সবার নাম বল’, ‘কার পোস্ট কী?’ ‘কে কোন হলে থাকে?’ ইত্যাদি। বাঁধন, সজিব, রাকিব, সবুজ এই নির্মম টর্চারে নেতৃত্ব দিচ্ছিলো। শুরুতে আমার মুখ দিয়ে কষ্টের চিৎকার বের হচ্ছিলো। অনেক পেটানোর পর যখন আমি আর চিৎকার করার শক্তি পাচ্ছিলাম না তখন তাদের মধ্যে কেউ একজন বললো যে, এ অনেক শক্ত, এরে আরো পিটা। সেদিন আমি গেস্টরুমে পৌঁছাই রাত পৌনে দশটার দিকে। তারপর ঘণ্টা দুয়েক চলে আমাদের দুজনের উপর এই নারকীয় নির্যাতন। সেই মুহূর্তে কেউ একজন এসে বলে, ‘ঠিক আছে আর দরকার নাই, হয়তো কোনো নাম নাই ওদের কাছে। আর তাছাড়া পুলিশ আসছে, পুলিশে দিয়ে দে ওদেরকে।’

ততক্ষণে হল ছাত্রলীগের সভাপতি পুলিশকে খবর দিয়ে নিয়ে আসে। সেসময় বঙ্গবন্ধু হলের সভাপতি ছিল দারুস সালাম শাকিল। টর্চারের সময় উপস্থিত না থাকলেও সে পুলিশ ডেকে নিয়ে আসছিলো এই খবরটুকু পরে আমরা জানতে পেরেছিলাম। আনুমানিক রাত সাড়ে বারোটার দিকে পুলিশ আমাদেরকে হল থেকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়। আমার পিঠের চামড়ায় বেল্টের আঘাতগুলো গাঢ় দাগ রেখে দিয়েছিল। পিঠের চামড়া ফেটে সেখান থেকে রক্ত বের হয়ে জমে গিয়েছিলো। শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়ার পর সেখানের এক হাবিলদার কিছু ওষুধ নিয়ে এসে আমাদের প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেন। আমরা ডেটল দিয়ে আমাদের পিঠটা পরিষ্কার করে পেইন কিলার খেয়ে নিই। এরপর দুইদিন আমাকে শাহবাগ থানার হাজতে থাকতে হয় এবং পরিবারসহ থানার কাছে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেতে হয়।

এই ঘটনার পর আমার ক্লাসমেটরা বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছিলো। ফার্স্ট ইয়ারের একটা ছেলেকে কেন এভাবে মারধর করা হবে। তাছাড়া আমার নিরীহ স্বভাবের কারণেও তাদের ক্ষোভ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক, আমি বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু কারোর কিছু করার ছিল না। তবে হল-এ আমার ইয়ারের ছেলেদের মধ্যে এই ঘটনাটা ভিন্ন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। একটা আতঙ্ক তৈরি হয় তাদের মাঝে। কার্যত তারা ক্যাম্পাসে আমাকে প্রকাশ্যে এড়িয়ে চলা শুরু করে। যদিও ক্যাম্পাসের বাইরে তাদের সাথে দেখা হলে সহজভাবেই কথা বলতো। এ থেকে আমি বুঝতে পারি – হলে থাকার কারণে তাদের মধ্যে এই ভয়টা ছিল যে আমার সাথে সখ্যতার কারণে তাদের উপরেও টর্চার নেমে আসতে পারে।

ফার্স্ট ইয়ারের এই ঘটনার পর আমি আর হলে থাকতে পারিনি। আমাকে চিরতরে হল ছেড়ে দিতে হয়েছিল। আজিমপুরের এক মেস-এ থেকে আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাকি জীবন পার করেছি। আমার নির্যাতিত হয়ে থানায় যাওয়ার ঘটনাটা সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিলো আমার বাবাকে। তিনি অনেক বেশি ভীত হয়ে পড়েন। তিনি যখন জানতে পারেন আমাকে এভাবে মারধর করে থানা হাজতে দেওয়া হয়েছে তখন কান্না করে দিয়ে বলছিলেন যে, এত পড়াশোনা করে কী হবে? আমাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেয়ার জন্যও খুব চেষ্টা করেছিলেন তিনি তখন। তার ভয়টা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে বলেছিলেন, ‘পড়াশোনার দরকার নেই, আমার ছেলে আমার কাছে ফিরে আসুক’।

যা হোক, এই ঘটনার পর আমি আর কখনো আমার হলের দিকে আর পা বাড়াইনি। এমনকি আমি আমার জিনিসপত্রগুলোও হল থেকে বের করার সাহস পাইনি। আমার যে বন্ধুর সাথে আমি পাশাপাশি ফ্লোরিং করে থাকতাম সে খুব ভোরে উঠে আমার জিনিসগুলো আস্তে আস্তে আমাকে পৌঁছে দেয়। এভাবেই আমি আমার জিনিসপত্র ফেরত পাই। নির্মমভাবে শারীরিক নির্যাতনের পরেও আমার বড় ধরনের শারীরিক ক্ষতি হয়নি যদিও। মানসিক একটা ট্রমা তৈরি হয়েছিল। সেটা আস্তে আস্তে কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলাম ক্লাসমেট আর বিভাগের শিক্ষকদের সহযোগিতাপূর্ণ আচরণে। তবে এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি যে ক্ষতির স্বীকার আমাকে হতে হয় তা হচ্ছে আর্থিক ক্ষতি। হলের বাইরে থাকার কারণে প্রতি মাসে থাকা-খাওয়ার জন্য বেশ বড় অঙ্কের একটা খরচ আমাকে বহন করতে হয়েছে। আমার মতো বড় পরিবারের সন্তানের জন্য বাবার আয়ের সংসার থেকে নিয়মিত টাকা আনা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। ফলে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমাকে ঢাকা শহরের মতো খরুচে জায়গায় আর্থিকভাবে সংগ্রাম করে দিন চালাতে হয়েছে সেই ঘটনার পর থেকেই।

বর্তমানে তিনি একটি ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে জানিয়ে লেখেন, ব্যবসায়িক ব্যস্ততার মাঝেও যতটুকু সময় পাই চেষ্টা করি আমার সমাজের মানুষের জন্য কিছু করার। বিশেষ করে আমার গ্রামের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার যাত্রাকে সহজ করার জন্য তাদেরকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতামূলক নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি এবং এখনও কাজ করে যাচ্ছি। তবে আমি চাই না, গ্রাম থেকে ঢাকা শহরে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়তে এসে আমার মতো নির্মম রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হোক কেউ। আমি চাই সবার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন নিরাপদ এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্ন পূরণের পথে সহায়ক হোক।

৩৯ পদে বড় নিয়োগ দেবে ঢাকার কর অঞ্চল-১৬
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ডাকসু থেকে জিন্নাহর ছবি সরানোর আল্টিমেটাম ছাত্রদলের, পদক্ষে…
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রতি উপজেলায় একটি মাদ্রাসা জাতীয়করণের দাবি
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
টেকনাফে মানব পাচারকারীদের ২০ আস্তানা গুঁড়িয়ে দিল পুলিশ-বিজি…
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ডোপ টেস্টে ‘পজিটিভ’ পুলিশ সুপারকে সাময়িক বরখাস্ত
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পিলারের সঙ্গে মোটরসাইকেলের ধাক্কা, প্রাণ গ…
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
FALL 2026
Application Deadline Wednesday, 16 Sept 2026
Apply Now

Admission Test Schedule

  • Test Date: Friday, 18 Sept 2026
  • Written Exam: 10:00 – 11:00 AM
  • Oral Viva: 11:30 AM onwards

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9