ঢাবির হলে গণরুমেই তিন বছর, ছাত্রলীগ কর্মীদের ফেসবুকে ‘বিদ্রোহ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল  © ফাইল ছবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের শিক্ষার্থীরা বৈধ সিটের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোর দাবি তুলেছেন। সিট দেওয়ার জন্য ফেসবুকে পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা। তাদের অধিকাংশই ছাত্রলীগের মাধ্যমে হলে উঠে গণরুমে অবস্থান করছেন দীর্ঘদিন।

জানা গেছে, বুধবার (৬ আগস্ট) সকাল থেকে ‘কর্মীদের প্রতি যারা উদাসীন, নেতৃত্ব তাদের জন্য বেমানান’ স্লোগানে তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা তাদের ইমিডিয়েট সিনিয়র (চতুর্থ বর্ষের) নেতাদের প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করতে থাকেন। পরে অনেকে পোস্ট ডিলিট করলেও বেশ কয়েকটির স্ক্রিনশট ডেইলি ক্যাম্পাসের হাতে আসে।

জানা গেছে, পোস্ট দেওয়া শিক্ষার্থীরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। হলে তারা সেক্রেটারি ব্লকের শিক্ষার্থী। ছাত্রলীগের রাজনীতিতে তারা কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন ও সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকতের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

হল সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরেই ইমিডিয়েট সিনিয়রদের কাছে সিটের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিছু হলে তাদের বন্ধুরা দ্বিতীয় বর্ষের শুরুতেই সিট পেয়েছে। সেখানে তৃতীয় বর্ষে এসেও গণরুমে থাকাটা মানতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। নেতাকর্মীরা সিঙ্গেল রুমে বা সিটে থাকলেও তারা এক রুমে এখনো ২০ জন করে অবস্থান করছেন। সেজন্য সিনিয়রদের বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছিলেন তারা। সিনিয়ররাও বিভিন্ন তারিখ বলছিলেন, সিট দেওয়ার জন্য। সর্বশেষ নেতারা সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখ সবাইকে সিট দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করেন।

কিন্তু ৬ তারিখ আসলেও নেতারা তালবাহানা করলে শিক্ষার্থীরা একজোট হয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিতে থাকেন। এ সময় তারা ৬ সেপ্টেম্বরকে হ্যাশ ট্যাগ (#) দিয়েই পোস্ট করেন। তবে হলগুলো ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তারা প্রভোস্টের ওপর দায়িত্ব দিয়ে এ ঘটনা থেকে পার পাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ কর্মীদের।

নিজের পোস্টে একজন বলেন, ‘সিটের দাবি করেছিলাম আমরা, ভিক্ষা চাইনি। নেতৃত্বের অধিকার আর জুনিয়রদের প্রতি কর্তব্য সমান্তরাল। কর্তব্য পালন করলে নেতৃত্ব আপনার অধিকার। লজ্জাজনক মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল।’

‘আমরা তৃতীয় বর্ষে উঠেছি, কিন্তু আমাদের এখনো সিট দেওয়া হয়নি। আজ দেবে, কাল দেবে বলে আমাদের ঘুরানো হচ্ছে। চতুর্থ বর্ষের ক্যান্ডিডেটরা সবাই সিঙ্গেল সিট নিয়ে থাকছে। সেখানে আমাদের এক রুমে ২০ জন করে ফ্লোরিং করে থাকতে হয়।’- নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী

অন্য আরেক শিক্ষার্থী, ‘কিরে, আজ কি সিট দিবে?’ স্ক্রিনশট শেয়ার করে লেখেন, ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে খ্যাত সো কল্ড (--) বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের একটা সিটের জন্য অসহায়ত্ব। কর্মীদের প্রতি যারা উদাসীন, নেতৃত্ব তাদের জন্য বেমানান' #৬ সেপ্টেম্বর।’ একজন শিক্ষার্থী হলের লোকেশন শেয়ার করে লেখেন, ‘কথা ছিল প্লাবনের পর মুক্ত হবে এই দেশ। বৈধ সিট আমার অধিকার।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা তৃতীয় বর্ষে উঠেছি, কিন্তু আমাদের এখনো সিট দেওয়া হয়নি। আজ দেবে, কাল দেবে বলে আমাদের ঘুরানো হচ্ছে। চতুর্থ বর্ষের ক্যান্ডিডেটরা সবাই সিঙ্গেল সিট নিয়ে থাকছে। সেখানে আমাদের এক রুমে ২০ জন করে ফ্লোরিং করে থাকতে হয়।’

আরো পড়ুন: কেন্দ্র ও ঢাবি ছাত্রলীগের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে, ‘সাংগঠনিক’ বিশৃঙ্খলার শঙ্কা

অন্য আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের বারবার আশা দেওয়া হচ্ছে সিট দেওয়ার জন্য। আমরা আর কতদিনই থাকব হলে? এখন সিট পেলে সর্বোচ্চ দু’বছর বৈধভাবে থাকতে পারব। হলে আমরা সক্রিয় রাজনীতি করছি। কিন্তু আমাদের প্রতি তারা অবহেলা করছ। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

ওয়ালী আসিফ ইনানের অনুসারী আব্দুল্লাহ বলেন, ‘করোনার পর যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে তাদের সেমিস্টার চার মাসে হওয়ায় তারা দ্রুতই তৃতীয় বর্ষে উঠে গেছে। স্বাভাবিকভাবে চললে তারা এখনো দ্বিতীয় বর্ষেই থাকতো। প্রশাসন সিট দিতে গাফিলতি করছে। সেখানে আমাদের তেমন কিছু করার নেই। আমরা চেষ্টা করছি খুব দ্রুতই এটার সমাধান করতে।’

এ বিষয়ে মাজহারুল কবির শয়নের অনুসারী রনি মাহিম শিশির বলেন, ‘আমরা বিষয়টি গতকাল রাতে সমাধান করেছি। তাদের সিট দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আপনারা জানেন মুক্তিযোদ্ধা হল অনেক ছোট, সিটও অনেক কম। সেজন্য আমাদের ম্যানেজ করে চলতে হয়। আমরা প্রাধ্যক্ষ স্যারের সাথে কথা বলেছি। আশা করি দ্রুতই তাদের সিট দেওয়া হবে।’

হলের  অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘ছাত্ররা আমাকে না বলে ফেসবুকে সারাদিন স্ট্যাটাস দিলে আমার তো কিছু করার নেই। তারা কেউ আমার কাছে আসেনি। অথচ হলের সিট দেওয়ার দায়িত্ব আমার। তারা আমার কাছে আসলে আমি তাদের সিটের ব্যবস্থা করে দিতাম ‘

তিনি আরো বলেন, ‘তারা যদি ছাত্রলীগের ওপর ভরসা করে তাহলে তারা করুক, তাতে আমার তো কিছু করার নেই। আমি কিছুদিন আগ থেকেই হাউজ টিউটরদের মাধ্যমে সিট এসেসমেন্টের কাজ করে যাচ্ছি। কাজ শেষ হলে সিট এলটমেন্টের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেব।’


সর্বশেষ সংবাদ