ইউজিসি © টিডিসি সম্পাদিত
প্রথমবারের মতো নতুন অর্থবছরের জন্য দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বরাদ্দ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) অধীনে রাখা হয়েছে। তবে গত অর্থ বছরের মত এই খাতে আলাদা বরাদ্দ না থাকা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। এ অবস্থায় দেশের ৫৯ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় বরাদ্দ কীভাবে দেবে তা নিয়ে নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে তদারক সংস্থাটি।
ইউজিসির সিদ্ধান্ত মতে, নতুন ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের গবেষণা পরিকল্পনা ও প্রাক্কলিত বাজেট এবং বিগত দুই অর্থবছরে গবেষণা খাতে বরাদ্দ ও প্রকৃত ব্যয়ের তথ্য আগামী ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে কমিশনে প্রেরণ করতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এতে বলা হয়, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতে উপ-খাতভিত্তিক অর্থের চাহিদা, পরিকল্পনা এবং বাজেট প্রাক্কলনপূর্বক কমিশনে প্রেরণের ক্ষেত্রে ৩টি বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।
এসবের মধ্যে রয়েছে-শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে আন্ডারগ্রাজুয়েট, মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণায় অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট প্রাক্কলন; উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় সরকারের পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার প্রদান; শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ইকোসিস্টেম তৈরিতে অগ্রাধিকার প্রদান।
ইউজিসি বলছে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের গবেষণা খাতে দ্বৈততা পরিহার, সুষ্ঠু ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে গত এপ্রিলে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় সভায় বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের জন্য গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ইউজিসির অনুকূলে বরাদ্দপূর্বক তা ব্যয় করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং সে অনুযায়ী বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
‘‘এই প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের একাডেমিক স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বকীয়তা, গবেষণা অগ্রাধিকার এবং বিষয়ভিত্তিক বৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে গবেষণা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা, গুণগতমান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং আন্ডারগ্রাজুয়েট, মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করে গবেষণা সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে এ খাতে অর্থায়নের একটি সমন্বিত, কার্যকর ও টেকসই কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’’
ইউজিসি আরও বলছে, এই কাঠামো প্রণয়নের অংশ হিসেবে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে গবেষণা খাতে অর্থায়নের বর্তমান অবস্থা, উপ-খাতভিত্তিক বিনিয়োগের ধরন, সম্পদের ব্যবহার, ব্যয়ের কার্যকারিতা এবং বিদ্যমান গবেষণা ব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র পর্যালোচনার মাধ্যমে সময়োপযোগী গাইডলাইন, বাজেট কাঠামো, কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং অর্থায়নের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। দ্রুততম সময়ে গবেষণা খাতে অর্থ প্রাপ্তির নিমিত্ত আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত দুই অর্থবছর (২০২৪-২০২৫ এবং ২০২৫-২০২৬) মেয়াদে গবেষণা খাতে উপ-খাতভিত্তিক অনুমোদিত সরকারি বরাদ্দ ও এই বরাদ্দের বিপরীতে প্রকৃত ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য সংযুক্ত তথ্যছক অনুযায়ী কমিশনে প্রেরণের জন্য অনুরোধ করা হলো।
ইউজিসি বলছে, এ লক্ষ্যে আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা তহবিল ব্যবস্থাপনা, গবেষণা অনুদান প্রদান, গবেষণা প্রকল্প নির্বাচন, অর্থ ছাড়, তদারকি, মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা সংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিমালা, প্রবিধান, নির্দেশিকা, বিধিবিধান, সিন্ডিকেট/একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অথবা প্রশাসনিক আদেশ-এর অনুলিপি প্রেরণের জন্য অনুরোধ করা হলো। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে এ-সংক্রান্ত কোনো স্বতন্ত্র নীতিমালা বা নির্দেশিকা অদ্যাবধি প্রণীত হয়নি, সেসব বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণায় সরকারের অগ্রাধিকারকে বিবেচনায় নিয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নের জন্য অনুরোধ করা হলো।
‘‘গবেষণা অর্থায়নের ক্ষেত্রে কমিশন কর্তৃক প্রণীতব্য নতুন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে চলমান গবেষণা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ থাকবে-বলছে ইউজিসি।’’
নতুন অর্থবছরে গবেষণা বরাদ্দ ব্যবস্থায় আনা পরিবর্তনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। গবেষণা তহবিল সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়কে না দিয়ে ইউজিসির মাধ্যমে পরিচালনা করার নতুন এই সিদ্ধান্ত দেশের প্রাচীনতম ও শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম, একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন এবং গবেষকদের স্বাধীনতা খর্ব করবে বলছে দলটির।
এদিকে, গত সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয়টির সিনেটের বার্ষিক অধিবেশনে অংশ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব শারমীনা নাসরীন বলেছেন, ইউজিসি গবেষণা খাতে বরাদ্দ এক জায়গা থেকে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়ার কথা বলেছে, যা সরকারের সিদ্ধান্ত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম সিনেট সভায় বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা খাতে কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তাহলে আমরা যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তরের কথা বলছি, তাহলে এক টাকা বরাদ্দ ছাড়া কীভাবে করা সম্ভব?
“আর আপনারা (সরকারের প্রতিনিধি) গবেষণা খাতে বরাদ্দ ‘না দেওয়ার সিদ্ধান্ত’ নিয়েছেন, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতামত কী তা গ্রহণ করেছেন?”
এ বিষয়ে যুগ্মসচিব শারমীনা নাসরীন বলেন, “প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে গবেষণা খাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আলাদাভাবে একটা বরাদ্দ দেয়। এ বছর অর্থ মন্ত্রণালয় মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি সমন্বয় করে যে মিটিং হয়, ওখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বরাদ্দটা ‘কার্টেল করে’ (একত্র করে) এটা ইউজিসিকে দেওয়া হয়েছে। এটা সরকারি সিদ্ধান্ত।”
তিনি বলেন, “এ প্রস্তাবে যদি সরকার সফল হয়, তাহলে হয়ত ইউজিসির মাধ্যমে এই বাজেটটা বাস্তবিত হবে। আর ব্যর্থ হলে হয়তবা অন্য কোনো সিস্টেমে আসবে। কাজেই কথাটি এখানে না বললে ভুল ব্যাখ্যার অবকাশ থেকে যায়।”