ইউজিসি © ফাইল ছবি
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের একাধিক নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে ধারাবাহিক অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। এসব অনিয়ম নিষ্পন্ন করেনি অধিদপ্তর। ফলে অনিয়ম করে দীর্ঘদিন ধরে নেওয়া বেতন-ভাতা বাবদ ৭ কোটি ৬৩ লাখ ৬৩ হাজার ৪৪১ টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে এসব অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে শিক্ষা অডিট।
এর আগে বিষয়গুলো নিয়ে হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (সিজিএ) এস এম রেজভীর সঙ্গে তার অফিসে গিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ। বৈঠকে চেয়ারম্যান ইউজিসিতে পরিচালিত অডিট রিপোর্টের ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখাতে অনুরোধ জানান। যদিও সে সময় নিয়মের বাইরে গিয়ে তিনি কোনো কাজ করতে করতে পারবেন না বলে জানান। মূলত সেই ধারাবাহিকতার আলোকেই ইউজিসির অডিট আপত্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসছে অডিট অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে।
তথ্যমতে, ইউজিসির ২০২২-২০২৩ থেকে ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষায় মোট ছয়টি গুরুতর অর্থনৈতিক অনিয়মের (এসএফআই) ক্ষেত্রে অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়। এর মধ্যে একটি অনুচ্ছেদ খসড়া পাণ্ডুলিপির অনর্ভুক্ত হওয়ায় গত ৪ জানুয়ারি সেটি পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য রিপোর্ট সেক্টরে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি ইউজিসিকেও চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. কামরুল আলম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ইউজিসির অডিট আপত্তি নিয়ে যে কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো বিশ্লেষণ করার পর দুটি আপত্তি নিষ্পন্ন করা হয়েছে। বাকিগুলো অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। বিষয়টি ইউজিসিকে অবহিত করা হয়েছে।’
প্রথম হওয়া প্রার্থী বাদ, ষষ্ঠকে নিয়োগ
অনিষ্পন্ন অডিটগুলোর মধ্যে অনুচ্ছেদ ৩৩ নম্বরের কথা প্রথমেই উল্লেখ করেছে শিক্ষা অডিট অডিট অধিদপ্তর। অধিদপ্তর জানিয়েছে, ইউজিসির একটি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বরং পরীক্ষায় ৬ষ্ঠ অবস্থানে থাকা ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ইউজিসির এমন সিদ্ধান্ত নিয়োগ বিধি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অনিয়মের ফলে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরে ৫ কোটি ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ৫৯৮ একীভূত টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। নিয়োগ পরীক্ষার পূর্ণ মেধাতালিকা, প্রথম থেকে ষষ্ঠ পর্যন্ত প্রার্থীদের নাম ও প্রাপ্ত নম্বর ইউজিসি দেখাতে পারেনি।
‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তথা ইউজিসির অডিট আপত্তি নিয়ে যে কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো বিশ্লেষণ করার পর দুটি আপত্তি নিষ্পন্ন করা হয়েছে। বাকিগুলো অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। বিষয়টি ইউজিসিকে অবহিত করা হয়েছে।’-মো. কামরুল আলম, মহাপরিচালক, শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর
প্রবিধান লঙ্ঘন করে পদোন্নতি
অডিট অনুচ্ছেদ ৩৪ ও ৬১-তে ইউজিসির প্রধানমালা ১৯৮৭ এর ১৯(১) ও (২) ধারা লঙ্ঘনের মাধ্যমে অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে নবম বা তদূর্ধ্ব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। যদিও প্রবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শ্রেণি পদে পদোন্নতির কোনো সুযোগই ছিল না। এরপরও তাকে একাধিকবার পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে প্রথম শ্রেণির পদে পদোন্নতির সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও ইউজির একাধিক কর্মকর্তাকে নিয়ম ভেঙে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর এসব পদোন্নতিকে স্পষ্টভাবে বিধিবহির্ভূত বলে জানিয়েছে। বিষয়টি সমাধানে ভূতাপেক্ষভাবে প্রবিধান সংশোধন করে বিষয়টি নিরীক্ষা অধিদপপ্তরকে জানাতে বলা হয়েছে।
দ্বৈত নাগরিককে পরিচালক পদে নিয়োগ
অনুচ্ছেদ ৩৫ অনুযায়ী, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও মোহাম্মদ মাকছুদুর রহমান ভূঁইয়াকে পরিচালক পদে নিয়োগ দিয়ে ২০২২-২০২৩ থেকে ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়েছে। এতে সরকারের ৩০ লাখ ৫৯ হাজার ৮০২ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নিয়োগ ইউজিসি প্রবিধানমালা ১৯৮৭-এর ৯(২) ধারা লঙ্ঘন করে করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পুরো অর্থ আদায় করে ইউজিসির তহবিলে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপত্তিটি এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে।
যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার প্রমাণ ছাড়াই পদায়ন
অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তির অনুচ্ছেদ ৩৬-এ ইউজিসির তিন কর্মকর্তার পদোন্নতি ও পদায়নে নির্ধারিত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার প্রমাণ না পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। আপত্তিতে তদারক সংস্থার উপসচিব মো. শাহীন সিরাজের ক্ষেত্রে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ৬ষ্ঠ ও ৭ম গ্রেডে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার কোনো প্রমাণক দাখিল করা হয়নি।
অতিরিক্ত পরিচালক মুহম্মদ নাজমুল ইসলামের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার প্রমাণ নেই। এছাড়া অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে উপপরিচালক পদে (৫ম গ্রেড) ন্যূনতম চার বছরের অভিজ্ঞতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অডিট কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ে প্রমাণসহ জবাব চেয়েছে।
বয়স-যোগ্যতা না মেনেই নিয়োগ, ফেরত দিতে হবে কোটির বেশি টাকা
অনিষ্পন্ন অডিট রিপোর্টের অনুচ্ছেদ ০৫-এ সংস্থাটির পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোছা. জেসমিন পারভীনের বয়স নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করলেও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির অভিজ্ঞতা গ্রহণযোগ্য না হলেও তা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এডহক ভিত্তিতে চাকরিকালকেও স্থায়ী অভিজ্ঞতা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যা প্রবিধান অনুযায়ী অনুমোদিত নয়।
তার ক্ষেত্রে আপত্তিকৃত অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ৩০ লাখ ৪০ হাজার ২৫০ টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে অডিট দপ্তর। এই অর্থ জমা দেওয়ার প্রমাণক এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
একইভাবে ইউজিসির আরেক কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামানের বয়সও নির্ধারিত সীমার বেশি ছিল। দীর্ঘদিন এডহক ভিত্তিতে কাজ করলেও তা প্রবিধান অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়। তার ক্ষেত্রে আপত্তিকৃত অর্থের পরিমাণ ৪৬ লাখ ৩৪ হাজার ৭৯১ টাকা।
অডিট কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব অনিয়মের অর্থ আদায় ও দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে ইউজিসির নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজের ব্যবহৃত নাম্বারে কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এর আগে বিষয়গুলো নিয়ে বক্তব্য জানতে চেয়ারম্যানের অফিসিয়াল ইমেইলে প্রশ্ন পাঠিয়েও উত্তর পাওয়া যায়নি।