উচ্চশিক্ষা বিষয়ে ‘ঢাকা ঘোষণা’ গৃহীত
ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা’ শীর্ষক চার দিনব্যাপী সম্মেলন © সংগৃহীত
দক্ষিণ এশিয়ায় একটি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক, উদ্ভাবনী ও বৈশ্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সম্মিলিত অঙ্গীকার ব্যক্ত করে উচ্চশিক্ষা বিষয়ে ‘ঢাকা ঘোষণা’ গৃহীত হয়েছে। উচ্চশিক্ষার অর্থবহ ও টেকসই রূপান্তরের জন্য ধারাবাহিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব, কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং সকল অংশীজনের সম্মিলিত উদ্যোগকে ঘোষণাপত্রে অপরিহার্য উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ঢাকায় বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ‘দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা’ শীর্ষক চার দিনব্যাপী সম্মেলনের সমাপনী দিনে এ ঘোষণা গৃহীত হয়।
ঘোষণাপত্রটি সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীদের পাঠ করে শোনান বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। ঘোষণার বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের কোনো আপত্তি না থাকায় সর্বসম্মতিক্রমে এটি গৃহীত হয়।
এ সময় ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এসএমএ ফায়েজ, কমিশনের সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, প্রফেসর ড. মো. সাইদুর রহমান, প্রফেসর ড. মাছুমা হাবিব, প্রফেসর ড. আইয়ুব ইসলাম, পাকিস্তান হায়ার এডুকেশন কমিশনের নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর ড. জিয়া উল হক, শ্রীলঙ্কা ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান সিনিয়র প্রফেসর কে এল ওয়াসান্থা কুমারা, মালদ্বীপ কোয়ালিফিকেশন্স অথরিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মারিয়াম ফিজানা রাশীদ, নেপাল ইউজিসি’র সদস্য সচিব প্রফেসর ড. জ্ঞান বাহাদুর থাপা।
পাকিস্তানের এসএবিএস বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য/কমিশন মেম্বার প্রফেসর ড. আরবেলা ভুট্টো, বিশ্ব ব্যাংকের সিনিয়র এডুকেশন স্পেশালিস্ট ও টাস্ক টিম লিডার টি এম আসাদুজ্জামান, হিটের প্রকল্প পরিচালক প্রফেসর ড. আসাদুজ্জামানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আগত উচ্চশিক্ষার নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, শিক্ষাবিদ ও গবেষক, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, হিট প্রকল্পের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা ঘোষণায় বলা হয়, একটি কৌশলগত খাত হিসেবে উচ্চশিক্ষায় মানব নিরাপত্তা, জনকল্যাণ ও জাতীয় বিনিয়োগের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন, একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতা উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ পরিবেশগত সংকট মোকাবেলা, অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা জোরদার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ লালন এবং দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে শান্তি ও পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ঢাকা ঘোষণায় দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ- যেমন সুশাসন ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণে সীমাবদ্ধতা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ঘাটতি, শ্রমবাজারের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার দুর্বল সংযোগ, ডিজিটাল বৈষম্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ঝুঁকি এবং জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়ন সংক্রান্ত সংকট চিহ্নিত করা হয়। একই সঙ্গে অঞ্চলটির বিশাল সংখ্যক যুবসমাজ, সম্প্রসারিত বিশ্ববিদ্যালয় নেটওয়ার্ক ও বিকাশমান ডিজিটাল সক্ষমতাকে সম্ভাবনার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
ঢাকা ঘোষণায় উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ উন্নয়নে আটটি কৌশলগত ক্ষেত্রে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা জোরদার; নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের মানুষের জন্য ন্যায্য ও সাশ্রয়ী উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতকরণ; গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবন উৎসাহিতকরণ ও শিল্প-একাডেমিয়া অংশীদারত্ব জোরদার; স্নাতকদের কর্মসংস্থানযোগ্যতা বাড়াতে শ্রমবাজারমুখী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ বৃদ্ধি; ডিজিটাল রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং স্মার্ট লার্নিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা; টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু কার্যক্রমকে শিক্ষাদান ও গবেষণার মূলধারায় অন্তর্ভুক্তি; শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিনিময়সহ আঞ্চলিক সহযোগিতা, মোবিলিটি ও নেটওয়ার্কিং জোরদার; এবং সুশীল সমাজ, শিল্পখাত, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সহযোগীদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে জনআস্থা বৃদ্ধি করা।
ঘোষণায় এই সম্মেলনকে উচ্চশিক্ষা বিষয়ে টেকসই আঞ্চলিক সংলাপ ও সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং উচ্চশিক্ষায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে ‘সার্ক প্ল্যাটফর্ম’ পুনরুজ্জীবনের আহ্বান জানানো হয়। এ অঞ্চলের উচ্চশিক্ষা নেটওয়ার্ক জোরদারকরণে এ ধরনের সম্মেলন নিয়মিত আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং এ সংক্রান্ত পরবর্তী সম্মেলন মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর লো মেরিডিয়েন হোটেলে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
ঢাকা ঘোষণার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ রূপান্তরের জন্য একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মমুখী রোডম্যাপ প্রণীত হলো বলে অংশগ্রহণকারীরা মত প্রকাশ করেন।
চারদিনের এ সম্মেলনে স্বত:স্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করায় ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ফায়েজ দেশ-বিদেশের সকল অংশগ্রহণকারীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।