প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
কিছু পরিস্থিতিতে হঠাৎ কোনো দুঃসংবাদ শুনে সুস্থ মানুষের হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা ঘটতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, তীব্র মানসিক আঘাত শরীরে এমন কিছু প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, যা হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে কেন এমন হয়, কারা আছেন ঝুঁকিতে? এবার কারণ জানালেন চিকিৎসকরা।
সিনেমায় এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়— প্রবল তর্কাতর্কি সহ্য করতে না পেরে কেউ বুকে হাত দিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, আবার সন্তানের মৃত্যুসংবাদ শুনে কেউ অচেতন হয়ে যাচ্ছেন। পর্দার এসব ঘটনা কেবল কল্পকাহিনি নয়। বাস্তবেও আকস্মিক দুঃসংবাদ বা তীব্র মানসিক চাপের কারণে হৃদ্যন্ত্রে গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে আগে থেকেই হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা ধমনিতে ব্লকেজ রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের ঝুঁকি বেশি। হরিয়ানার একটি বেসরকারি হাসপাতালের হৃদ্রোগ বিভাগের অভিজ্ঞ চিকিৎসক অসীম ঢল্ল এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, আকস্মিক ও তীব্র মানসিক ধাক্কা হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে, বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই হৃদ্রোগ রয়েছে।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের জার্নাল সার্কুলেশন’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণার ফল অনুযায়ী, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও শারীরিক পরিশ্রম হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, আকস্মিক মানসিক চাপ এক ঘণ্টার মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম যুক্ত হলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।
কাছের কারও মৃত্যু কিংবা দুর্ঘটনার খবর শুনলে হঠাৎ রক্তচাপ ও হৃদ্স্পন্দনের গতি বেড়ে যেতে পারে। তখন হৃৎপিণ্ডকে দ্রুত রক্ত পাম্প করতে হয় এবং অক্সিজেনের চাহিদাও বেড়ে যায়। এ অবস্থায় আগে থেকেই ধমনিতে ব্লকেজ থাকলে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
আকস্মিক দুঃসংবাদে শরীরে কী পরিবর্তন হয়?
হঠাৎ কোনো খারাপ বা মর্মান্তিক খবর শুনলে মস্তিষ্ক সেটিকে বড় ধরনের বিপদ হিসেবে বিবেচনা করে। এতে অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। ফলে দ্রুত বেড়ে যায় হৃদ্স্পন্দন ও রক্তচাপ। একই সঙ্গে রক্তনালি সাময়িকভাবে সংকুচিত হতে পারে। এতে রক্তচাপ আরও বাড়ে এবং হৃদ্যন্ত্রে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ধমনিতে ব্লকেজ থাকলে ঝুঁকি বেশি
যাঁদের করোনারি ধমনিতে আগে থেকেই চর্বি বা প্লাক জমে আছে, তাঁদের জন্য তীব্র মানসিক ধাক্কা বিপজ্জনক হতে পারে। মানসিক চাপের কারণে রক্তপ্রবাহ ও রক্তচাপের আকস্মিক পরিবর্তন ঘটলে ধমনিতে জমে থাকা প্লাক ফেটে যেতে পারে। এর ফলে রক্ত জমাট বেঁধে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
‘ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম’ কী?
তীব্র মানসিক চাপের কারণে হৃদ্যন্ত্রে সমস্যা দেখা দিলেই সেটিকে হার্ট অ্যাটাক বলা যায় না। চরম মানসিক আঘাতের কারণে কারও কারও ক্ষেত্রে ‘ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম’ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি ‘তাকোৎসুবো সিনড্রোম’ নামেও পরিচিত।
হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সাধারণত রক্তনালি বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে, ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোমে হৃদ্যন্ত্রের পেশি সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে দুই অবস্থার লক্ষণ প্রায় একই রকম হতে পারে। তাই মানসিক ধাক্কার পর বুকে ব্যথা হলে সেটিকে শুধু মানসিক চাপ ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।
কাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?
যাঁদের করোনারি ধমনিতে ব্লকেজ রয়েছে, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা আছে, তাঁদের ঝুঁকি বেশি। তবে বয়স কম কিংবা আগে থেকে কোনো রোগ না থাকলেও গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা করা যাবে না।
কোন লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হবেন?
দুঃসংবাদ শোনার পর বা তীব্র মানসিক চাপের সময় বুকে অস্বস্তি, অতিরিক্ত ঘাম কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে। এ ছাড়া কয়েকটি লক্ষণও অবহেলা করা উচিত নয়। যেমন—
- বুকে চাপ অনুভব করা বা তীব্র ব্যথা হওয়া।
- শ্বাসকষ্ট ও অতিরিক্ত ঘাম হওয়া।
- বমি বমি ভাব বা মাথা ঘোরা।
- অস্বাভাবিক দুর্বলতা অনুভব করা।
- বুকের ব্যথা হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড় কিংবা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া।
এসব লক্ষণের কোনোটি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। বিশেষ করে বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট হলে জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়া জরুরি।