সাবেক গোয়েন্দা প্রধান অগাস্ট হ্যানিং © সংগৃহীত
জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের (বিএনডি) সাবেক প্রধান অগাস্ট হ্যানিংকে গুপ্তচরবৃত্তি ও রাষ্ট্রদ্রোহের চেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশটির ফেডারেল প্রসিকিউটরের কার্যালয় জানিয়েছে, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য সংগ্রহ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। খবর আল জাজিরার
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ৮০ বছর বয়সী হ্যানিংকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় প্রসিকিউটরের কার্যালয়। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক গুপ্তচরবৃত্তি, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য সংগ্রহ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে তিনি কোন দেশ বা দেশের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করেছেন, তা স্পষ্ট করেনি কর্তৃপক্ষ।
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডের শপিগেলের বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানিয়েছে, হ্যানিং আজারবাইজানের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। এর আগে ২০২৫ সালে পৃথক একটি মামলায় ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সঙ্গে তার যোগাযোগের অভিযোগও ওঠে।
প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, বেসরকারি পরামর্শক হিসেবে কাজ করার সময় হ্যানিং একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার জন্য গোপন তথ্য ব্যবহার করে বিশ্লেষণ তৈরি করছিলেন। একই সময়ে তিনি আরেকটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কয়েক বছর ধরে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালে হ্যানিং তার সাবেক দপ্তরের কর্মকর্তা ‘ম্যানফ্রেড ডি’-এর কাছ থেকে গোপন তথ্য নেওয়ার চুক্তি করেন। বিনিময়ে অর্থের বিনিময়ে ওই তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশি শক্তির জন্য একটি বিশ্লেষণ তৈরির পরিকল্পনা ছিল। তবে সেই বিশ্লেষণ শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
প্রসিকিউটরদের দাবি, ২০১০ সালের বসন্তে হ্যানিং ও ম্যানফ্রেড ডি-এর মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা হয়। এরপর ম্যানফ্রেড ডি ধারাবাহিকভাবে বিএনডির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হ্যানিংকে সরবরাহ করতেন। এর বিনিময়ে তিনি অর্থ পেতেন।
প্রায় ২ হাজার নথি হ্যানিংয়ের কাছে সরবরাহ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে প্রসিকিউটরের কার্যালয়। এসব নথির অনেকগুলোতেই গোপন তথ্য ছিল এবং সেগুলো বিএনডির অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ছিল। এর মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য তৈরি ব্রিফিংয়ের তথ্যও ছিল।
হ্যানিং এসব তথ্য তার ব্যক্তিগত পরামর্শক ব্যবসায় কাজে লাগানোর কথা ছিল বলে অভিযোগ করেছে প্রসিকিউটররা। ম্যানফ্রেড ডিকেও মঙ্গলবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের চেষ্টা ও রাষ্ট্রদ্রোহমূলক গুপ্তচরবৃত্তিতে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে।
জার্মান সংবাদমাধ্যম জুডডয়চে সাইটুং জানিয়েছে, হ্যানিংয়ের কাছে সরবরাহ করা নথিগুলোর কিছুতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও রুশ সামরিক বাহিনীসংক্রান্ত তথ্য ছিল। কিছু নথি আবার মিত্র দেশগুলোর গোয়েন্দা সংস্থার অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপন তথ্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ ছিল।
হ্যানিং ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত জার্মানির বিএনডির প্রধান ছিলেন। এরপর তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন এবং ২০০৯ সাল পর্যন্ত স্টেট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি বেসরকারি পরামর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
মঙ্গলবার সকালে জার্মান সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, মুখোশধারী কর্মকর্তারা মুনস্টারের কাছে নর্ডভাল্ডে এলাকায় হ্যানিংকে তার বাড়ি থেকে বের করে একটি বুলেটপ্রুফ গাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন।
প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, পৃথক একটি অপহরণ মামলার তদন্ত করতে গিয়ে হ্যানিং ও ম্যানফ্রেড ডির কথিত গুপ্তচরবৃত্তির বিষয়টি সামনে আসে। ওই মামলায় জার্মান ব্যবসায়ী ক্রিস্টিনা ব্লকের দুই সন্তানকে ২০২৩ সালে অপহরণের অভিযোগ ওঠে। তদন্তে হ্যানিংয়ের একটি বেসরকারি ইসরায়েলি গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিও উঠে আসে।
জার্মান পার্লামেন্টের গোয়েন্দা নজরদারি কমিটির চেয়ারম্যান মার্ক হেনরিখমান বলেছেন, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্যের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। বিএনডির বর্তমান প্রধান মার্টিন ইয়াগারও জানিয়েছেন, সাবেক প্রধানের বিষয়ে সংস্থাটি দ্রুত অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছিল এবং পরে ফেডারেল প্রসিকিউটররা তদন্তের দায়িত্ব নেন।
জার্মানিতে এর আগেও বড় ধরনের গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালে ‘কার্স্টেন এল’ নামে পরিচিত এক জার্মান গোয়েন্দা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাশিয়ার কাছে ইউক্রেন যুদ্ধ ও ওয়াগনার গ্রুপসংক্রান্ত গোপন তথ্য সরবরাহের অভিযোগ আনা হয়। তার বিচার এখনো চলমান।
এর আগে ১৯৭৪ সালে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর ভিলি ব্রান্টের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করা এক পূর্ব জার্মান গুপ্তচরের পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার পর রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত ব্রান্ট পদত্যাগ করেন। জার্মান আইনে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।