প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
শুধু বড়দের জীবনেই যে ঝুটঝামেলা আর দুশ্চিন্তা থাকে, তা কিন্তু নয়। নানা কারণে আপনার ছোট্ট শিশুটি বা কিশোর সন্তানটিও মানসিক চাপে ভুগতে পারে। পড়াশোনা আর পরীক্ষার চাপ, স্কুলে বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক খারাপ, ঘরের পরিবেশ বা হুট করে ঘটে যাওয়া কোনো কষ্টদায়ক ঘটনা-যেকোনো কিছুই তাদের মনে বড়সড় হতাশা তৈরি করতে পারে। সমস্যা হলো, বড়দের মতো ছোটরা সবসময় নিজের ভিতরের কষ্টটা গুছিয়ে বলতে পারে না। তবে মন খারাপ বা অস্থিরতা লুকিয়ে রাখা কঠিন। তাদের আচরণ আর প্রতিদিনের অভ্যাসে দেখলেই আপনি বুঝবেন আপনার সন্তান কোনো হতাশায় ভুগছে কি না।
যেভাবে বুঝবেন সন্তান চাপে আছে
মানসিক চাপ একেক শিশুর ওপর একেকভাবে প্রভাব ফেলে। কেউ কেউ কথায় কথায় রাগ দেখায়, আবার কেউ একদম নিজেকে গুটিয়ে নেয়। আন্তর্জাতিক শিশু স্বাস্থ্য সংস্থা (এপিপি) এবং বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী, কিছু পরিবর্তন চোখে পড়লে সতর্ক হওয়া দরকার:
আচরণ ও মেজাজের বদল: অল্পতেই মেজাজ হারানো, কারণ ছাড়াই কান্নাকাটি করা, বা সবসময় একটা অজানা ভয়ে থাকা।
ঘুম ও খাওয়ার অনিয়ম: রাতে সহজে ঘুম না আসা, বারবার খটকা লেগে জেগে ওঠা, দুঃস্বপ্ন দেখা কিংবা হঠাৎ খাওয়ার রুচি একেবারেই বদলে যাওয়া। এছাড়া কোনো শারীরিক অসুস্থতা না থাকা সত্ত্বেও ঘন ঘন পেটব্যথা বা মাথাব্যথার কথা বলা।
পছন্দের কাজেও অমিল: আগে যে খেলাধুলা বা শখ নিয়ে মেতে থাকত, সেগুলোতে একদম মন না থাকা; বন্ধু কিংবা পরিবারের মানুষজন থেকেও দূরত্ব বাড়িয়ে দেওয়া।
পড়াশোনায় মনোযোগের অভাব: পড়ালেখায় একদম মন না বসা বা স্কুলে যাওয়ার নাম শুনলেই অজুহাত খোঁজা।
তবে মনে রাখবেন, বাচ্চা একদিন একটু মেজাজ দেখালেই যে সে বড় কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছে এমন ভেবে দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই। বাড়ন্ত বয়সে মেজাজের উত্থান-পতন হতেই পারে। দেখতে হবে পরিবর্তনগুলো কতদিন ধরে চলছে এবং তা তার পড়াশোনা বা প্রতিদিনের জীবনকে কতটা ব্যাহত করছে।
সন্তানের এই চাপে অভিভাবক হিসেবে আপনার করণীয়-
১. আগে শুনুন, বিচার করতে যাবেন না
সন্তান যখন কোনো ভয় বা কষ্টের কথা বলছে, তাকে মাঝপথে থামিয়ে দেওয়া বা 'এসব কোনো ব্যাপারই না' বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। তার অনুভূতির জায়গাটাকে সম্মান দিন, যেন সে বুঝতে পারে মা-বাবার কাছে মনের কথা নির্বিঘ্নে বলা যায়।
২. রেজাল্টের চেয়ে চেষ্টাটাকে গুরুত্ব দিন
জিপিএ-৫ বা ক্লাসে ফার্স্ট হওয়ার জন্য বাচ্চার ওপর চাপ সৃষ্টি না করে, সে কতটা মনোযোগ দিয়ে চেষ্টা করছে সেটির প্রশংসা করুন। পড়াশোনার ফাঁকে তাকে খেলাধুলা ও ছবি আঁকা বা গান শোনার মতো বিনোদনের সুযোগ দিন।
৩. পরিমিত ও গোছানো রুটিন রাখুন
ঠিক সময়ে ঘুমানো, স্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক কসরত আর পরিবারের সবাই মিলে একসাথে কিছুটা সময় কাটানো বাচ্চার মনে নিরাপত্তা তৈরি করে।
৪. চাপের আসল কারণটা বোঝার চেষ্টা করুন
স্কুলে কোনো সমস্যা, নাকি বন্ধুদের সাথে ঝগড়া বা কেউ তাকে খ্যাপাচ্ছে। নাকি ঘরের পরিবেশের কোনো কিছু তাকে ভাবাচ্ছে? এটি আগে বোঝার চেষ্টা করুন। প্রয়োজন মনে করলে স্কুলের শিক্ষকের সাথেও কথা বলুন।
৫. নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
বাচ্চারা কিন্তু চারপাশের পরিবেশ খুব দ্রুত টের পায়। পরিবারে সারাক্ষণ চেঁচামেচি বা অশান্তি থাকলে বাচ্চার মন স্বাভাবিকভাবেই অশান্ত হয়ে ওঠে। মা-বাবা নিজেরা কীভাবে কঠিন পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন, বাচ্চারা কিন্তু দেখে দেখেই শেখে।
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন?
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ’-এর পরামর্শ অনুযায়ী, যদি এই মানসিক পরিবর্তন বা লক্ষণগুলো কয়েক সপ্তাহ ধরে টানা চলতে থাকে এবং কমতে না চায়; মানসিক চাপের কারণে যদি পড়াশোনা, পরিবারের সাথে সম্পর্কের ক্ষতি হয় তাহলে একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন।