জিপিএ-৫ পাওয়া আরাফাত © সংগৃহীত
দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় দীর্ঘদিন রোগে ভুগে মারা যান বাবা। এরপর পাঁচ সদস্যের পরিবারে নেমে আসে আর্থিক সংকট। বাবার মৃত্যুর পর বন্ধ হতে বসেছিল পড়ালেখাও। এমন পরিস্থিতিতে সংসারের হাল ধরেন বড় বোন মোসা. রুবি আক্তার। পোশাক কারখানায় কঠোর পরিশ্রম করে একদিকে পরিবারের খরচ চালিয়েছেন, অন্যদিকে ছোট ভাইয়ের পড়ালেখা চালিয়ে গেছেন। বোনের সেই ত্যাগ আর নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় সাফল্য পেয়েছেন মো. আরাফাত খান। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় ৮৫৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একমাত্র তিনিই জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন।
আরাফাতের এই সাফল্যে আনন্দিত তাঁর পরিবার। উচ্ছ্বসিত আখতার হোসেন চৌধুরী মেমোরিয়াল কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও। তবে এই অর্জনকে কেবল নিজের সাফল্য হিসেবে দেখছেন না আরাফাত। তাঁর মতে, এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান বড় বোন রুবি আক্তারের।
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার বাজিতা চতুর্থ খণ্ড গ্রামের মৃত মো. ইসমাইল খানের ছেলে আরাফাত। বাবাকে হারানোর পর একসময় পড়ালেখা ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা তাঁর স্বপ্নগুলোকে থমকে দিয়েছিল। কিন্তু বড় বোনের সাহস ও সহযোগিতা তাঁকে আবারও পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে আনে।
নিজের সেই কঠিন সময়ের কথা বলতে গিয়ে আরাফাত বলেন, ‘বাবাকে হারানোর পর আমার জীবন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। মুহূর্তেই সব স্বপ্ন নিমিষেই মাটিতে মিশে যায়। ভেবেছিলাম, আমার আর লেখাপড়া হবে না। কিন্তু তখনই পাশে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছেন আমার বড় বোন। তাঁর আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম কখনও ভুলে যাবার মতো নয়।’
বোনের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘পোশাক শ্রমিকের কঠিন কাজ করেও আমার বড় বোন যেভাবে আগলে রেখেছেন, সেই ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারব না। আমার স্বপ্ন ও ইচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা।’
ভবিষ্যতে শিক্ষকতা করতে চান আরাফাত। উচ্চশিক্ষা শেষ করে শিক্ষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তিনি। তবে সেই স্বপ্ন পূরণে বড় বাধা পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও অর্থাভাবে সেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। এ কারণে সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন এই মেধাবী শিক্ষার্থী।
এদিকে ছোট ভাইয়ের সাফল্যে আনন্দিত হলেও নিজের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন বড় বোন রুবি আক্তার। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের পাঁচ সদস্যের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে হয় তাঁকে। সংসারের খরচ জোগাতে যোগ দেন পোশাক কারখানায়। কঠোর পরিশ্রমের মধ্যেও ভাইয়ের পড়ালেখা বন্ধ হতে দেননি তিনি।
রুবি আক্তার বলেন, ‘বাবার মৃত্যুর পর এই সংসারের হাল আমাকেই ধরতে হয়েছে, পরিবারের পাঁচ সদস্যের খরচ জোগাতে হচ্ছে। তাই পোশাক কারখানার মতো কঠিন কাজে যোগ দিয়ে চেষ্টা করছি সবার মুখে হাসি ফোটাতে। আরাফাত মেধাবী; তাঁর জন্য তেমন কিছুই করতে পারিনি। প্রবল ইচ্ছেশক্তিই তাঁকে সাফল্য এনে দিয়েছে।’
বোনের শ্রম, ত্যাগ আর নিজের অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে আরাফাতের এই অর্জন এখন পুরো পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। মির্জাগঞ্জ উপজেলার একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া এই শিক্ষার্থীর সামনে এখন নতুন স্বপ্ন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং একদিন শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।