ভোটের প্রচারে কোমলমতি শিশুরা!

২০ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৯:১৫ AM
লালবাগ এলাকায় প্রচরণায় শিশুরা

লালবাগ এলাকায় প্রচরণায় শিশুরা

বাংলাদেশের আইনে শিশু-শ্রম নিষিদ্ধ থাকলেও খোদ জনপ্রতিনিধিরাই তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় শিশুদের ব্যবহার করছেন। আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রতিদিনই এমন অহরহ ঘটনা ঘটেছে রাজধানীসহ সারাদেশে। যা নিয়ে শুধু এলাকাবাসী নয়, ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সচেতন মহলের অনেকেই।

তারা বলছেন, আমরা যখন শিশুদের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর পরিবেশ গড়তে চাই, তখন তাদেরকে নির্বাচনী কাজে ব্যবহার সত্যিই অনুচিত। প্রার্থীরা শিশু-আইন লঙ্ঘন করছেন বলে মনে করছেন তারা। আর মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের ভাষ্য, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শিশুদের ব্যবহার বন্ধের জন্য পদক্ষেপ নিতে কয়েক মাস আগেই নির্বাচন কমিশনে চিঠি পাঠিয়েছেন তারা। তারপরও বাস্তবায়ন না হলে সেটা দুঃখজনক।

সম্প্রতি লালবাগের নতুন পল্টন লাইনের আল হেরা জামে মসজিদে জুমার নামাজ শেষে দু’পাশের প্রবেশপথে পাঞ্জাবি ও পায়জামা পরিহিত কয়েকজন শিশুকে ঢাকা-৭ আসনের এক প্রার্থীর ছবি সম্বলিত লিফলেট বিতরণ করতে দেখা যায়। শিশুদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা এলাকারই একটি মাদ্রাসার ছাত্র। নির্দিষ্ট অংকের পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তাদের কয়েকজনকে বিভিন্ন মসজিদে লিফলেট বিতরণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মুসল্লি বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ থেকে তারা লক্ষ্য করছেন এবার নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় শিশুদের বিশেষ করে মাদ্রাসার শিশুদের অধিক অংশগ্রহণ দেখা যাচ্ছে।

খোঁজে পাওয়া তথ্যমতে, শুধু রাজধানী নয়, ‘মার্কা কি আছে?’ ‘আছে।’ ‘কোন সে মার্কা?’, ‘অমুক!’ ‘এবার ভোটে জিতবে কে’, ‘অমুক ভাই ছাড়া আবার কে?’ দেশের অনেক অঞ্চলেই এভাবে গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিতে দেখা গেছে কোমলমতি শিশুদের; যাদের সবার বয়স ১০-১২ বছরের নিচে। নির্বাচনী কাজে মাইকসহ শিশুদের এ প্রচারণাকে ভালো চোখে দেখছেন না সচেতন মহল। তারা নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে শিশুদের ব্যবহারের সমালোচনা করে বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলো মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে শিশুদের ব্যবহার করছে। বিশেষ করে বস্তিতে বসবাস করা শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে বেশি। সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে তাদের দিয়ে প্রার্থীরা প্রচারণার কাজ করছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

শুধু জাতীয় নির্বাচন নয়, স্থানীয় নির্বাচনেও এমন চিত্র দেখা যায়

 

সিরাজগঞ্জের দবিরগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিম বলছিলেন, প্রার্থীরা ছেলে ও মেয়ে শিশু দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে সমালোচিত হয়েছেন। জাতীয় শিশুনীতিতে এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ। তারপরও খাবার বা টাকা দিয়ে প্রলুব্ধ করে কেবল স্বার্থ হাসিলের জন্য শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তথ্যমতে, বাংলাদেশ শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এই আইন ভঙ্গ করা হলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ পাঁচ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রচারণায় বরাবরই শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে।

মূলত এসব বিষয়কে আমলে নিয়েই ভোটের যুদ্ধে শিশুদের ব্যবহার না করার জন্য রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আহ্বান জানিয়েছে ‘শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশন’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। এই দাবিতে এই সংগঠনটির সদস্যরা বুধবার ঢাকায় মুখে কালো কাপড় বেঁধে মানববন্ধন করেন।

ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুঈদ হাসান তড়িৎ বলেন, বিগত বেশ কয়েকটি নির্বাচনী প্রচারে ও নির্বাচনের কাজে শিশুদের ব্যবহার করার সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে শিশুদের ব্যবহার না করার জন্য রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের কাছে আমরা দাবি জানাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন প্রার্থীর মিছিলের পুরোভাগেও শিশুদের রাখা হচ্ছে। হাসান বলেন, ‘আপনি দেখবেন প্রার্থীরা প্রচারের জন্য যে মিনিবাস বা ট্রাক ব্যবহার করেন সেখানেও শিশুদের দেখা যায়।’ ভোটের দিন শিশুদের দিয়ে ভোটার স্লিপও বিলি করানো হয় বলে তিনি জানান।

মানববন্ধনে সংগঠনের পক্ষ থেকে তিন দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো-নির্বাচনী প্রচার ও সমাবেশে শিশুদের ব্যবহার করা যাবে না। নির্বাচনী পোস্টারিং, মাইকিং ও প্রচারপত্র বিলির কাজে শিশুদের ব্যবহার করা যাবে না। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

জানা যায়, মূলত দরিদ্র এবং ছিন্নমূল শিশুদের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে ভোটের প্রচারে ব্যবহার করা হয়। সাধারণত এসব কাজের জন্য এদের দৈনিক ২০-২৫ টাকা এবং খাবার দেয়া হয়। প্রার্থীরা এসব শিশুদের সস্তায় কাজ করায় কারণ একই কাজে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে নিয়োগ করা হলে তাতে নির্বাচনী ব্যয় বেড়ে যায়।

নির্বাচনী প্রচারণায় শিশুদের ব্যবহার বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন

 

বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে শিশুদের ব্যবহার বন্ধ করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়ে কয়েক মাস আগেই তারা নির্বাচন কমিশনে চিঠি পাঠিয়েছেন। ‘নির্বাচন কমিশন তখন আমাদের জানায় যে তারা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রিটার্নিং অফিসার এবং সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে যে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং নির্বাচনী প্রচারণায় প্রার্থীরা যেন শিশুদের ব্যবহার না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।’

অবশ্য মানবাধিকার কমিশনের চিঠির প্রেক্ষিতে এর আগে ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, আমরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে বিষয়টি অবহিত করেছি। নির্বাচনী আচরণবিধির মধ্যে এটা আছে যে, যারা ভোটার নন এমন লোকেরা নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। আচরণবিধিতে শিশুদের ব্যবহার বন্ধে শাস্তির বিধান আছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, আচরণবিধি করার আগে এটা ব্যবহার করা হতো। এখন তেমন ব্যবহার করা হয় না। আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। আচরণবিধির মধ্যে বলা আছে যদি কেউ শিশুদের ব্যবহার করে তবে জেল জরিমানার বিধান আছে।

আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আইন কী আছে?

আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ ১৯৮৯ এর অনুচ্ছেদ ৩২ (১) অনুযায়ী, শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ অথবা শিশু শিক্ষায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী কিংবা তার স্বাস্থ্য বা শারীরিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক বা সামাজিক বিকাশের পক্ষে ক্ষতিকর কাজ করানো থেকে রক্ষার ব্যবস্থা রাষ্ট্র গ্রহণ করবে। উক্ত আইনের অনুচ্ছেদ ৩৭ (ক) অনুযায়ী কোনো শিশুই নির্যাতন বা অন্য কোনো নিষ্ঠুর, অমানবিক বা মর্যাদাহানিকর কোনো আচরণ বা শাস্তির শিকার না হয় সেটি নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র।

এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বিষয়ক আইএলও কনভেনশন ১৯৮২ এর ৩ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, শিশুদের অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উল্লিখিত আন্তর্জাতিক সনদ দুটির অনুসাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে উহার বিধান প্রতিপালনে বাংলাদেশ অঙ্গীকারাবদ্ধ। পাশাপাশি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ও শিশু আইন ২০১৩ অনুসারে শিশুর সর্বোত্তম কল্যাণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

ভোটের লড়াইয়ে শিশুদের যেসব ঝুঁকি
বিবিসি বলছে, শিশু অধিকার নিয়ে যারা আন্দোলন করেন তারা বলেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের ব্যবহার করা হলে তাদের সুরক্ষা ঝুঁকির মুখে পড়ে। শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুঈদ হাসান তড়িৎ জানান, নির্বাচনের প্রচারণায় শিশুদের ব্যবহার করা হলে পরবর্তী সময়ে তারা মাদক এবং সন্ত্রাসের দি‌কে ধাবিত হ‌তে পারে।

এছাড়া ভোটের প্রচারের সময় কোন কারণে সহিংসতা হলে শিশুরাই তার প্রধান ভিকটিম হয়- কারণ ঐ ধরনের পরিস্থিতিতে তারা অসহায় হয়ে পড়ে। এছাড়া নির্বাচনী প্রচারের যানবাহনে শিশুদের ব্যবহার করা হলে তারা নানা ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে বলেও শিশু অধিকার কর্মীরা উল্লেখ করেন।

ভোটের মাঠে শিশু ঠেকাতে কঠোর ইসি

 

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান বিশিষ্টজনদের

সম্প্রতি নির্বাচন ঘিরে মিছিল-পথসভা, শোভাযাত্রাসহ ভোটের প্রচারে শিশুর ব্যবহার বন্ধে রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও উদ্যোগী হওয়ার তাগিদ এসেছে এক গোল টেবিল আলোচনা থেকে। দেশে শিশু সাংবাদিকতার প্রথম সাইট হ্যালো ‘রাজনীতিতে শিশুকে ব্যবহার: গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক ওই গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা তাতে অংশ নিয়ে শিশুদের বিষয়ে আরও সচেতন হওয়ার, আরও নৈতিক আচরণ করার আহ্বান জানান রাজনীতিবিদদের প্রতি।

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় একাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সারা দেশে চলছে প্রচারের উৎসব। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও সমর্থকদের অসহিষ্ণু মনোভাবের কারণে তা কখনও কখনও সহিংস হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার, গণমাধ্যম ও অভিভাবকের কী করা উচিত তা উঠে আসে আলোচকদের কথায়। তারা বলেন, শিশুরা রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে বেড়ে উঠবে। কিন্তু কোনোভাবেই তাদের ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না, সহিংসতার মধ্যে ঠেলে দেওয়া যাবে না।

নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু বলেন, শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ হলেও তারা অবহেলিত। ভবিষ্যতের জন্য তাদের গড়ে তুলতে গণমাধ্যমকেও সুযোগ করে দিতে হবে।

সোনার দাম ভরিতে কমলো ৩২৬৬ টাকা
  • ২৯ জুন ২০২৬
ফের কমল স্বর্ণের দাম, ভরিতে কত
  • ২৯ জুন ২০২৬
যশোরের দুই মহাসড়কে বেপরোয়া বাস চলাচল, বাড়ছে দুর্ঘটনা
  • ২৯ জুন ২০২৬
দুই শর্ত দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করা…
  • ২৯ জুন ২০২৬
১০০ স্কুলছাত্রকে হারানোর কৌশল: ব্রাজিলের দুর্বলতা ভাঙতে জাপ…
  • ২৯ জুন ২০২৬
কলকাতায় পড়াশোনা, ঢাকায় শুরু কর্মজীবন— বহুমাত্রিক শিল্পী মুস…
  • ২৯ জুন ২০২৬