ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমি © সংগৃহীত
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির হোস্টেলে অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সাত কর্মদিবসের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। নিহত শিক্ষার্থীর ওপর দ্বাদশ শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এদিকে এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে তীব্র বিক্ষোভ, হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আজ বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে একাডেমির অধ্যক্ষ স্বাক্ষরিত এক অফিসিয়াল বিবৃতিতে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
নিহত মেহেদী হাসান (১৪) রামগঞ্জ উপজেলার সোনাপুর বাজার এলাকার ব্যবসায়ী জিয়া উদ্দিনের ছেলে। তিনি ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির অষ্টম শ্রেণির ‘খ’ শাখার আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ক্যাম্পাসের আব্দুর রহমান হলে থেকে পড়াশোনা করতেন।
একাডেমির বিবৃতি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার (১৫ জুন) দিবাগত রাতে আব্দুর রহমান হলে অবস্থানরত দ্বাদশ শ্রেণির (এইচএসসি পরীক্ষার্থী ব্যাচ-২০২৬) কয়েকজন শিক্ষার্থী কোনো একটি চুরির সন্দেহের ভিত্তিতে মেহেদী হাসানের ওপর প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। পরদিন মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে মেহেদী একাডেমি কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে তার ওপর চালানো নির্যাতনের বিস্তারিত তুলে ধরে।
অভিযোগ পাওয়ার পর গতকাল সকাল ৯টা থেকে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের ডেকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে কর্তৃপক্ষ এবং তাদের লিখিত বক্তব্যও গ্রহণ করা হয়। তবে তদন্ত চলাকালীনই মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে মেহেদীকে আব্দুর রহমান হলের ৬১৪ নম্বর কক্ষ সংলগ্ন বারান্দায় ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রাথমিক তথ্য মতে, দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ‘এ’ শাখার শিক্ষার্থী তাহসিন সিরাজী তাকে প্রথম ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান এবং নামিয়ে আনেন। পরে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মেহেদীকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে, শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্যাম্পাসে দফায় দফায় বিক্ষোভ, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বিক্ষুব্ধ জনতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কক্ষ, আসবাবপত্র ও স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায়, যাতে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলেও জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
একাডেমি কর্তৃপক্ষ তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, মেহেদীর লিখিত অভিযোগ ও প্রাথমিক তথ্য পর্যালোচনায় তার প্রতি শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক নিপীড়নের অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। অভিযোগে বর্ণিত পরিস্থিতির কারণে সে চরম মানসিক চাপে ছিল, যা তাকে আত্মহননের মতো সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে থাকতে পারে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে। অন্যদিকে, স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের অভিযোগ, মেহেদী হাসানকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী জানান, নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা, সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। বর্তমানে বিষয়টি রামগঞ্জ থানা পুলিশ ও লক্ষ্মীপুর জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) যৌথভাবে তদন্ত করছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছে একাডেমি কর্তৃপক্ষ।