ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মরিয়ম বেগম © সংগৃহীত
গত ১৭ বছর বিধিবহির্ভূতভাবে ও খেয়ালখুশিমত শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের কারণে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ। আজ রবিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন প্রতষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মরিয়ম বেগম।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি কাজী মনিরুল ইসলাম মনুর বোনজামাই সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মনিরুজ্জামান হাওলাদার আওয়ামী লীগমনা কিছু শিক্ষক ও অভিভাবক দিয়ে বিদ্যালয়ের পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গণঅভ্যূত্থানের পর ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট মনিরুজ্জামানের উস্কানিতে কিছু উচ্ছৃঙ্খল সাবেক শিক্ষার্থী ও বখাটে কিশোর গ্যাঙ্গের সদস্যরা এই প্রতিষ্ঠানে ভীতিকর ও নৈরাজ্যকর পরিবেশ তৈরি করে আলমারি ভেঙ্গে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, নগদ টাকা, ল্যাপটপ নিয়ে যায়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও মনিরুজ্জমানের অপতৎপরতা, অপপ্রচার ও প্রপাগান্ডা বন্ধ হয়নি।
লিখিত বক্তব্যে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মরিয়ম বেগম বলেন, বিগত আওয়ামীলীগ সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষ থেকে তৎকালীন গভর্নিং বডি ও কিছু শিক্ষকদের অশিক্ষকসুলভ আচরনের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমতে থাকে।
একসময় যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল যা কমতে কমতে বর্তমানে ২১৪৩ জনে এসে দাঁড়িয়েছে। বিধিবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের ফলে বর্তমানে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বাবদ ব্যয় হয় ২৬ লাখ ৫১ হাজার ৯৭৭ টাকা। এর সাথে মাসিক বিদ্যুৎ, ওয়াসা, প্রিন্টিং, ইন্টারনেট, সফ্টওয়্যার বিল, মিউনিসিপ্যালিটি ট্যাক্স, উৎস ও মুষক কর এবং জেনারেটরের জ্বালানি খরচ, মেরামত ও আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র ক্রয় বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৩ লাখ টাকার মতো খরচ হয়। অথচ মাসিক একাডেমিক ফি বাবদ আদায় হয় মাত্র ১৬ লাখ ৩৪ টাকা। বছরে এই বিপুল পরিমান ঘাটতির টাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বকেয়া হওয়ার মূল কারণ।
২০২২ সালে ডিআইএ রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থীদের অনুপাত অনুযায়ী প্রায় দ্বিগুন শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত আছে। প্যাটার্ন ও বিধি বহির্ভূতভাবে ও খেয়ালখুশিমত গত ১৭ বছর যাবৎ শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের কারনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক সংকটে পড়েছে। প্রতি বছর ৩/৪ মাস করে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বকেয়া হওয়ার কারনে বর্তমানে মোট ১৩ মাসের বেতন বকেয়া হয়েছে।
তিনি জানান, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মানের ফলে প্রতিষ্ঠানের তিনটি ভবন (স্কুল শাখার পশ্চিম ভবন, স্কুলের মার্কেট ভবন ও কলেজ ভবন) এর মধ্যে একটি ভবন সম্পূর্ন ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং দুইটি ভবন এক তৃতীয়াংশ ভেঙ্গে ফেলা হয় যার ক্ষতিপূরন বাবদ সরকার সেতু ভবনের মাধ্যমে যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজকে পাঁচ কোটি নব্বই লক্ষ সতের হাজার দুইশত ষাট টাকা প্রদান করেন। ওই ক্ষতি পূরনের অর্থ থেকে শিক্ষক কর্মচারীদের নয়মাসের বকেয়া বেতন ও দুইটি উৎসব ভাতা সহ ভবন সংস্কার, সাবেক অধ্যক্ষদের বকেয়া বিল পরিশোধ ও ডিজেল জেনারেটর ক্রয় করা হয়।
মরিয়ম বেগম বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন অবস্থায় ২০০৯ সালে আমাকে বিধিবহির্ভূত ও অন্যায়ভাবে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেয়। ২০১৩ সালে বিজ্ঞ আদালতের ন্যায়সঙ্গত রায়ের মাধ্যমে আমি আবার প্রতিষ্ঠানে পূনরায় যোগদান করি। কিন্তু ২০১০ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত আমার এমপিওভুক্ত করনে নথিটি অগ্রায়ন না করে ১০ বৎসর আমাকে এমপিওভুক্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক হওয়া থেকে বঞ্চিত করেছেন। আমার নিয়োগের বৈধতা পেতে নিম্ন আদালতের দারস্থ হই এবং পাঁচ বছর মামলা পরিচালনা করার খরচ যোগাতে আমার স্বর্নালঙ্কার ও পৈত্রিক জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি), ঢাকা ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে আমাকে অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) এর দায়িত্ব প্রদান করেন।
মরিয়ম বেগম জানান, মো: মনিরুজ্জামান হাওলাদারকে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ হতে চুড়ান্ত অব্যাহতি প্রদান করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, যার বাস্তায়ন প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় আছে। কিন্তু তার অপতৎপরতা, অপপ্রচার ও প্রপাগান্ডা ছড়ানো বন্ধ হয়নি। শুধু তিনি নন, তার কিছু অনুসারী শিক্ষকরাও এসমস্ত কাজে লিপ্ত রয়েছেন। যার ফলে শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে।
তিনি বলেন, অত্র প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির যে অভিযোগ করা হয় তা সম্পূর্ন মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক এবং গভর্নিং বডির ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় একটি শিক্ষা প্রতিষ্টান সাফল্য লাভ করে। অথচ আওমামীপন্থী কুচক্রীমহলটি গত ১৭ বছর তিলে তিলে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়েও ক্ষান্ত হয়নি, বর্তমানেও শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অবিভাবকদের উস্কানি দিয়ে যাচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি রমিজ উদ্দিন আহমেদ, দিবা শাখার সহকারী প্রধান শিক্ষক মো: মফিজুর রহমান, প্রভাতী শাখার সহকারী প্রধান শিক্ষক মো: এমদাদ উল্লাহসহ শিক্ষকরা।