আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ কোটি টাকার অনিয়ম

যোগ্যতা ছাড়াই ৫ সহকারী অধ্যাপক, এক খাতের অর্থ আরেক খাতে, বড় অনিয়ম পদায়ন-পদোন্নতিতেও

  • অনলাইন মিটিংয়েও পূর্ণ সম্মানী
  • নির্দেশনা লঙ্ঘন করে পদোন্নতি 
  • প্রাপ্যতা না থাকলেও ইনক্রিমেন্ট
০৩ মে ২০২৬, ০৮:০৫ PM , আপডেট: ০৪ মে ২০২৬, ১০:৩৪ AM
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় © ফাইল ছবি

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অনিয়ম ও বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্যতা না থাকলেও ইনক্রিমেন্ট, নির্দেশনা অমান্য করে পদোন্নতি, প্রাপ্যতার অতিরিক্ত অর্থ প্রদানসহ ১৪ খাতে ব্যাপক অসঙ্গতির প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। শুধু তাই নয়; অনলাইনে বৈঠক করলেও পূর্ণ সম্মানী দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন খাতে এসব অনিয়মের ফলে সরকারের ১২ কোটি ২৯ লাখ ২৯ হাজার টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

সম্প্রতি ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের অডিট সম্পন্ন হয়েছে। এ অডিটে এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম হয়েছে বলে জানিয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। এ ধরনের অনিয়মের মূল কারণ হলো- বিধি-বিধান, ইউজিসির পরিপত্র, জাতীয় বেতন স্কেল এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ না করা বলে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. কামরুল আলম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এটি আমাদের নিয়মিত কাজ। অডিট আপত্তির বিষয়গুলো আমরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি। এরপর তারা এ বিষয়ে জবাব দেয়। জবাব পাওয়ার পর অনিষ্পন্ন অডিটগুলোর বিষয়ে একটি সুপারিশ করা হয়।’

শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের অডিট মেমোর তথ্য অনুযায়ী, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সবচেয়ে বড় অনিয়ম হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) বরাদ্দ দেওয়া অর্থের অতিরিক্ত ব্যয় করায়। ইউজিসির পূর্বানুমোদন ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত বাজেটের বাইরে ৬ কোটি ৯১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অথচ সংশোধিত বরাদ্দ অনুমোদনের পূর্বে অতিরিক্ত ব্যয় করা যাবে না বলে ইউজিসির বিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা মানেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

ন্যূনতম চাকরির মেয়াদ পূরণ না করলেও পাঁচজন প্রভাষককে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ফলে সরকারের ৩৬ লাখ ৪২ হাজার ৯১৫ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। একইভাবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত শর্ত পূরণ না করলেও একাধিক কর্মকর্তাকে নিয়োগ ও পরে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ক্ষতি ৭৭ লাখ ৯৪ হাজার ৬৩২ টাকা।

অডিট রিপোর্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজস্ব খাতেও অনিয়মের চিত্র উদ্বেগজনক। বিভিন্ন পরীক্ষা, প্রশাসনিক কাজের জন্য কাগজ ক্রয় ও মুদ্রণ খাতে সরবরাহকারীর বিল থেকে নির্ধারিত ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট কর্তন করেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এর ফলে সরকারের ১১ লাখ ২৫ হাজার ২৪২ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিল থেকে নির্ধারিত হারে আয়কর কর্তন করা হয়নি। এর ফলে সরকারের ২ লাখ ৬৯ হাজার ১১৮ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এসআরও লঙ্ঘন করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের বেতন-ভাতার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তাদের পদোন্নতি ও পদোন্নয়ন দেওয়া হয়েছে। পদোন্নতি-পদায়নের সময় তাদের অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট দেওয়ায় হয়েছে। জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের এমন এভাবে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে বিধি লঙ্ঘন করে এক কাজ করা হয়েছে। যার ফলে সরকারের ৯৬ লাখ ৬৯ হাজার ৩৮৫ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

অডিট মেমোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বিধি বহির্ভূতভাবে বকেয়া-বেতন ভাতা পরিশোধ করা হয়েছে। এর ফলে সরকারের আরও ২ কোটি ২৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে অতীতের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ; যা অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়টির পদোন্নতি সংক্রান্ত অনিয়মও ধরা পড়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষায়। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ন্যূনতম চাকরির মেয়াদ পূরণ না করলেও পাঁচজন প্রভাষককে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। যার ফলে সরকারের ৩৬ লাখ ৪২ হাজার ৯১৫ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। একইভাবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত শর্ত পূরণ না করলেও একাধিক কর্মকর্তাকে নিয়োগ ও পরে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারের ৭৭ লাখ ৯৪ হাজার ৬৩২ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

সম্মানী দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধি মানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিধি লঙ্ঘন করে একই দিনে একাধিক সভায় অংশগ্রহণের জন্য একাধিক সম্মানী দেওয়া হয়েছে। এমনকি অনলাইনে সভায় অংশগ্রহণ করলেও পূর্ণ হারে সম্মানী দেওয়া হয়েছে। প্রাক্কলন কমিটির সদস্যদের সম্মানী দেওয়ার মাধ্যমে সরকারের মোট ১ লাখ ৫৫ হাজার ২৫০ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

ইউজিসির অনুমোদন ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ২১ লাখ ২১ হাজার ২৯৩ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এ ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি ও ইউজিসির অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও একাধিক গড়মিল পাওয়া গেছে।

লিয়েনে নিয়োগের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে অডিট রিপোর্টে। রিপোর্টের তথ্য বলছে, ৫ম গ্রেডের একজন কর্মকর্তাকে ৩য় গ্রেডে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রামে না থাকা সত্ত্বেও গ্রেড-১ অধ্যাপক পদে লিয়েনে নিয়োগ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এর ফলে ৬ লাখ ৩০ হাজার ১৪৮ টাকা অতিরিক্ত বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়েছে।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রেও ইউজিসির নির্দেশনা মানেনি ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়। অডিট মেমোর তথ্য বলছে, ইউজিসির অনুমোদন ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ২১ লাখ ২১ হাজার ২৯৩ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এ ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি ও ইউজিসির অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি।

ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও একাধিক গড়মিল পাওয়া গেছে। অডিট রিপোর্টের তথ্য বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক খাতের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ অন্য খাতে ব্যয় এক খাতের বরাদ্দ অন্য খাতে অনিয়মিতভাবে ৩৩ লাখ ৬৮ হাজার ১৫৩ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। একই সঙ্গে আরএফকিউ বা কোটেশন পদ্ধতিতে ক্রয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সিলিং অতিক্রম করে ১৯ লাখ ৩৬ হাজার ৭৬৫ টাকা ব্যয় করা হয়েছে; যা সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন বলে জানিয়েছে শিক্ষা অডিট।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ডিন ও গবেষণা ভাতা প্রদান করে ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি বিধি অনুযায়ী এ ধরনের ভাতা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

‘শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের কোনো রিপোর্ট এখনো আমাদের হাতে আসেনি। রিপোর্ট আসলে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে। কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’—অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খান, উপাচার্য, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় 

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইসলামি আরবি ‍বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপক অনিয়ম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির দিতে ইঙ্গিত করে। অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অনিয়মের বিচারের সংস্কৃতি তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধ করা সম্ভব হবে।

এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘অনলাইনে মিটিং হলেও পূর্ণ সম্মানী দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের কোনো রিপোর্ট এখনো আমাদের হাতে আসেনি। রিপোর্ট আসলে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে। কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গোপালগঞ্জে বাসের চাপায় ভ্যানচালক নিহত, আহত ৭
  • ০৪ মে ২০২৬
নিজের আসনেই হারতে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়!
  • ০৪ মে ২০২৬
ছাত্রদলের কমিটিতে পদ না পেয়ে ফেসবুক লাইভে অঝোরে কান্না, ভিড…
  • ০৪ মে ২০২৬
আসামে ফের ‘গেরুয়া ঝড়’: বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফি…
  • ০৪ মে ২০২৬
বেসরকারি মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন নিয়ে সুখবর
  • ০৪ মে ২০২৬
কেরালা বিধানসভা নির্বাচনে ধরাশায়ী বিজেপি, নিরঙ্কুশ জয়ের পথে…
  • ০৪ মে ২০২৬