নগরীর ভবনের ছবি © টিডিসি ফটো
নগর জীবনের চাকচিক্য আনন্দ-উল্লাসের অন্তরালে কত শত পাখির আর্তনাদ ও কষ্টের গল্প নিঃশব্দে লুকিয়ে আছে । আমরা কজনই বা সেই আর্তনাদ শুনতে পাই, বা শুনতে চাই? অনেকেই ভাবেন পাখিদের আবার কিসের আর্তনাদ! কাল্পনিক মনে হলেও সত্য, পাখিদেরও আছে দুঃখ, কষ্ট আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম। পাখিরা তাদের চিরজীবন মায়া আর সৌন্দর্যে পৃথিবীকে রাঙিয়ে রাখে এবং প্রকৃতিকে করে তোলে আরও জীবন্ত। কিন্তু বিনিময়ে আমরা তাদের দেই কেবল দুঃখ-কষ্ট আর অবহেলা।
একজন মানুষের ওপর আঘাত এলে কিংবা তার ঘর ভেঙে দিলে সে বিচারের আশায় ক্ষমতাবানদের দ্বারে দ্বারে ছোটে, আইনের আশ্রয় নেয়। কিন্তু নিরীহ পাখিদের যখন আঘাত করা হয় কিংবা ভেঙে ফেলা হয় তাদের তিল তিল করে গড়ে তোলা নীড়, তখন তারা নির্বাক হয়ে যায়। তাদের অভিযোগ জানানোর কোনো থানা নেই, নেই কোনো বিচারালয়, তারা কেবল স্রষ্টার দরবারেই নীরবে তাদের কষ্টের ফরিয়াদ জানায়।
পুরান ঢাকায় কয়েক বছরে বহু অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। কলতা বাজার এলাকায় যখন থাকতাম, আমার বাসার পাশে একটি ফাঁকা জায়গা ছিল গাছপালায় ভরা। সেই গাছগুলোতে ঘুঘু, চড়ুই, দোয়েলসহ নানা প্রজাতির পাখির আনাগোনা ছিল, তাদের অনেকেরই ছিল সেখানে নীড়। কিন্তু হঠাৎ একদিন সে স্থানের সব গাছ কেটে ফেলা হলো। পরে খুঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, সেখানে একটি নতুন ভবন তৈরি হবে।
সেদিন রাত্রি বেলা। বরাবরই আমার রাতে ঘুম কম হয়, সেদিনও ঘুম আসছিল না। গভীর রাত শহরজুড়ে কোমল হাওয়ার তাফালিং চলছে। জানালা দিয়ে হিমেল হাওয়া ঘরে ঢুকছিল। নিস্তব্ধ শহরতলীতে সবাই তখন ঘুমে আচ্ছন্ন। নির্ঘুম আমি সেই নীরবতার সঙ্গী হতে জানালার ধারে দাঁড়ালাম।
তখন হঠাৎ চোখে পড়ল কেটে ফেলা গাছের অবশিষ্ট ডালে বসে থাকা একটি ঘুঘু পাখি। কিছুক্ষণ পরপর সে ডাল থেকে উড়ে গিয়ে পাশের ওয়াইফাইয়ের তারে বসছে, আবার ফিরে আসছে সেই নিজস্ব গাছের ডালে। রাত তখন প্রায় ৩টা বেজে ১৫ মিনিট। অদ্ভুত এক অস্থিরতা ছিল তার মধ্যে যেন কিছু খুঁজছে, যেন কিছু হারিয়েছে। বারবার ফিরে আসা সেই ডালটির দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, হয়তো এখানেই ছিল তার নীড়, তার ছোট্ট সংসার।
রাত্রি প্রায় শেষ। পাখিটা তখনও তারের ওপর বসে ছটফট করছে। কলতা বাজার ছোট মসজিদের মুয়াজ্জিন সাহেব ফজরের আজান দিচ্ছেন। সেই সময় পাখিটা যেন নীরবে স্রষ্টার দরবারে অভিযোগ জানাচ্ছে। আজান শেষ হতে না হতেই পাখিটা উড়ে চলে গেল দূর অজানায়।
নিশীথ রাতের নিস্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে আমি অবাক বিস্ময়ে সেই দৃশ্য দেখছিলাম, আর অনুভব করছিলাম নগরীর উন্নয়নের নিচে চাপা পড়ে আছে এমন কত শত নীরব আর্তনাদ, যা আমরা কখনো শুনি না, কিংবা শুনতেও চাই না।
প্রাণের শহরখ্যাত রাজধানী ঢাকাকে আমরা দিন দিন আধুনিক শহরে রূপান্তর করছি বটে, তবে এই আধুনিকতা অনেকাংশেই শহরের প্রকৃতিকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন এবং পরিবেশবিধ্বংসী উন্নয়নযজ্ঞের ফলে কেবল মানুষের জীবনযাত্রাই বিপর্যস্ত হচ্ছে না, বরং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ পক্ষিকূল।
গত বছরের মাঝামাঝি সময়ের কথা। তীব্র রোদ আর ভ্যাপসা গরমে ক্যাম্পাস শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে একটু শান্তির খোঁজে ছুটে গিয়েছিলাম বাহাদুর শাহ পার্কের ছায়াতলে। অসহ্য গরমে অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিদিন নগরীর হাজারো মানুষ ভিড় জমায় এই পার্কের সবুজ বৃক্ষরাজির তলে। শুধু মানুষই নয়, বিশাল সব বৃক্ষ থাকায় পাখিদেরও এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল এই উদ্যান। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে গাছের উঁচু ডালে পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো উদ্যান।
কয়েক বন্ধু মিলে ঐতিহাসিক সবুজ এই উদ্যানের বিশাল কাঠগোলাপ গাছের ছায়াতলে বসতেই চোখে পড়ল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বড় কাটগোলাপ গাছের পাশেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে একটি অসুস্থ চিল। পার্কে এত মানুষের ভিড় আনাগোনা কিন্তু কারো চোখেই যেন পড়ছে না মুমূর্ষু প্রাণটি! জগতের এমন উদাসীনতা দেখে মুহূর্তেই মনটা এক গভীর বিষণ্ণতায় ছেয়ে গেল।
আকাশের 'জীবন্ত ঘুড়ি' খ্যাত চিলটি যেন আজ নিরুপায় হয়ে প্রাণভিক্ষা চাইছে। কিছুক্ষণ পরপর করুণ স্বরে চিৎকার করে সে যেন নিজের আর্তনাদই প্রকাশ করছিল। পাখিটির প্রাণ রক্ষায় আমরা কয়েকজন দ্রুত ছুটে গেলাম। কাছে গিয়ে চিলটিকে যখন হাতে নিলাম, তখন বেরিয়ে এল তার অসুস্থতার আসল কারণ।
একটি ছোট পাখির শরীরজুড়ে ঘুড়ির সুতো এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, সামান্য নড়াচড়া করলেই সুতোর বাঁধন আরও শক্ত হয়ে যাচ্ছে। মুক্তি পাওয়ার প্রতিটি চেষ্টাই তার জন্য আরও বেশি যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
পৌষসংক্রান্তি বা সাকরাইন উপলক্ষে পুরান ঢাকার আকাশ রঙিন ঘুড়িতে ছেয়ে যায়। উৎসবের পাশাপাশি এর ভয়াবহতাও রয়েছে। উৎসবের আমেজে ঘুড়ির ধারালো সুতোয় পেঁচিয়ে প্রতিবছরই অনেক পথচারী ও বাইক চালক মারাত্মকভাবে আহত হচ্ছেন। শুধু মানুষ নয়, এই মরণফাঁদে আটকে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য পাখিও । ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি জননিরাপত্তা ও প্রাণিকুল রক্ষায় আরও বেশি সচেতন হতে হবে আমাদের।
এককালে যে শহরে কাকের ‘কা কা’ ডাকে নগরবাসীর ঘুম ভাঙত, সেখানে এখন ভোর হয় যানবাহনের তীব্র হর্ন আর মানুষের কোলাহলে। শহরের পাখিরা একসময় অলিগলি, বাসাবাড়ির ছাদ এবং পথের ধারের গাছপালায় বসে নানা রকম সুরে মুখর করে তুলত চারপাশ। কিন্তু আজ সেই দৃশ্য ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে পাখিদের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে, আর শহর হারাচ্ছে তার প্রাকৃতিক প্রাণবন্ততা।
এ শহরের বাতাসে বিষাক্ত ধূলিকণা, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার স্তূপ আর অসহনীয় শব্দদূষণ সব মিলিয়ে এই নগরীর চারপাশ এখন শ্বাসরুদ্ধকর এক নরক। কদিন পরপরই সংবাদপত্রের শিরোনাম আমাদের লজ্জিত করে যখন দেখি 'বায়ুদূষণে শীর্ষস্থানে ঢাকা'। এটি কেবল একটি সংবাদ নয়, যা আমাদের জনস্বাস্থ্য ও পক্ষিকুলের জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত। সবুজকে উপড়ে ফেলে আমরা যে উন্নতির ইমারত গড়ছি, তার শেষ পরিণতি কী তা নিয়ে চিন্তাশীল মানুষের সংখ্যা এদেশে আজও খুবই সীমিত।
প্রকৃতি তার স্বাভাবিক গতি বহু আগেই হারিয়েছে। তিল তিল করে গড়ে ওঠা এই শহর আজ ধীরে ধীরে বিবর্ণ, বৃক্ষহীন ও নিষ্প্রাণ কংক্রিটের জগতে পরিণত হচ্ছে। যে শহর হওয়ার কথা ছিল প্রাণবন্ত, সেটি আজ দূষণের চাদরে ঢাকা পড়ে ক্রমশ প্রাণহীন হয়ে উঠছে। শহরের ইট-পাথরের আড়ালে শুধু মানুষের নয়, পাখিদের আর্তনাদের গল্প নীরবে লুকিয়ে আছে।
নগর থেকে পাখিদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পেছনে দায়ী আমরাই। আবার নগরীতে তাদের অনুপস্থিতি আমরাই গভীরভাবে অনুভব করি। কিন্তু পাখিদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, তা নিতে আমাদের খুব একটা আগ্রহ নেই। ফলে নগরীতে পাখির সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। নগরীতে যে কয়েক প্রজাতির পাখির দেখা মেলে সেগুলোও পরিবেশগত কারণে হুমকির মুখে।
নগরীতে পাখির কূজন ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে। নইলে একসময় হয়তো পাখি শুধু বইয়ের পাতায় আর স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।