ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এয়াকুব আলী © সংগৃহীত
রাত পেরোলেই মুসলানদের পবিত্র উৎসব ঈদ উল ফিতর। পবিত্র রমজান মাসের দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর শাওয়াল মাসের ১ তারিখে উদযাপিত হতে যাচ্ছে মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদ। এটি কেবল উৎসবই নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, পারস্পরিক সৌহার্দ্য, হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে ধনী-গরিব নির্বিশেষে এক কাতারে সামিল হওয়ার দিন। প্রতিটি মানুষের জীবনেই ঈদ ঘিরে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা। উৎসব-আনন্দের পাশাপাশি পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে সময় কাটানো, সালামি দেওয়া-নেওয়া এবং সবাই মিলে ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা যেন সার্বজনীন।
ব্যতিক্রম নয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের নেতৃবৃন্দের ক্ষেত্রেও। ছোটবেলায় কাটানো সুমধুর ঈদের দিনগুলো অনেকেই খুঁজে ফেরেন স্মৃতির মানসপটে। ঈদের আমেজ টা মূলত কেমন? কীভাবে কাটতো ছেলেবেলার ঈদ, কীভাবে ভাগাভাগি করতেন ঈদের সেই আনন্দ; আর বর্তমানের ঈদ ই বা কাটে কীভাবে - আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সেসব গল্প শুনতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এয়াকুব আলীর মুখোমুখি হয়েছে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস। ইবির উপ-উপাচার্যের ঈদ অভিজ্ঞতা লিখছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ওয়াসিফ আল আবরার।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: ঈদ শব্দটা শুনলে সর্বপ্রথম কোন দৃশ্যটা চোখে ভেসে ওঠে?
ড. এম এয়াকুব আলী: পবিত্র মাহে রমজান মাস সিয়াম সাধনার মাস। শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠা মাত্রই রোজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়ে যায়। ঈদ শব্দটা শুনলেই আকাশে ঈদের চাঁদ দেখা এবং ঈদগাহে সবাই মিলে নামাজ আদায় করে কোলাকুলি করার দৃশ্যটা চোখে ভেসে ওঠে। একইসাথে এটিও মনে করিয়ে দেয় যে, ঈদের আনন্দ একার নয়; পাড়া-প্রতিবেশি রোজাদারদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়াই উত্তম।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার শৈশবের ঈদ সম্পর্কে জানতে চাই
ড. এম এয়াকুব আলী: বুঝতে শেখার পর থেকে ছোট বেলা থেকেই রোজা রেখেছি। তখন আমার উপর রোজা ফরজ ছিলো না কিন্তু পরিবারের সবাইকে দেখে দেখে রোজা রাখবার ইচ্ছা জাগতো। বাসার রোজাদারদের চেয়ে আমরাই বেশি আনন্দ পেতাম, তাদের চেয়ে আমাদের এক্সাইটমেন্ট বেশি থাকতো। ঈদের দিনে নতুন কাপড় পরিধান করার ব্যাপার টা স্বাভাবিক ছিলো। এতে কোন সওয়াব না থাকলেও এটা আমাকে খুব আনন্দ দিতো। ঈদের খুশির মাত্রা বাড়িয়ে দিতো।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: ছোটবেলায় ঈদের দিন কীভাবে কাটাতেন?
ড. এম এয়াকুব আলী: ছোটকালে ঈদের দিন সকালে পরিবারের সদস্যদের সাথে ঈদের নামাজ পড়তে যেতাম। নামাজ শেষে বাড়ি এসে মিষ্টান্ন জাতীয় যেসব খাবার রান্না হতো বিশেষ করে সেমাই, পায়েস - সেগুলো খেতাম৷ তারপরেই শুরু হতো এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানো। স্কুল বন্ধ থাকায় আশপাশের আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে যেতাম। তখন তো এখনকার মতো এরকম পার্ক বা বিনোদন স্পট ছিলো না; ত পাড়ার বন্ধুবান্ধব মিলে গোল্লাছুট, ফুটবল, হাডুডু খেলে দিন কাটাতাম। কখনো কখনো ঈদের রেশ ২/৩ দিন পরেও থাকতো।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: ঈদের দিনের বিশেষ কোন স্মৃতি যা এখনো মনে পড়ে আপনার
ড. এম এয়াকুব আলী: আমার একজন মামাতো বোন ছিলো আমার মায়ের বয়সের কাছাকাছি বয়সের৷ তিনি আমার মেঝ মামার মেয়ে। আমার মা তার বাবার পরিবারের ছোট মেয়ে হওয়ায় মামারা অনেক বয়স্ক ছিল। তো ঈদের দিন যখন গ্রামে মেলা বসতো আমার সেই মামাতো বোন আমাকে আদর করে বাদাম, লজেন্স কিনে কিনে এনে দিতেন৷ এখন এই জিনিসটা এভাবে দেওয়ার কেও নাই। ওইদিনের অনুভূতি গুলো এখনো আমাকে আনন্দ দেয়।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: বর্তমানে ঈদের দিন টা কাটে কী কী করে?
ড. এম এয়াকুব আলী: আমি ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষ। বর্তমানে আমার সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয় হচ্ছে ঈদগাহে নামাজ পড়ে পরিচিত সবার সাথে কোলাকুলি করা, পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজনের সাথে কুশল বিনিময় করে সবার সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার চেষ্টা থাকে। দীর্ঘ একমাস সিয়াম পালন করে সবার বাসায় আপ্যায়ন গ্রহণ করা হয়। এখন বয়স হয়ে যাওয়ায় দূরদূরান্তে সেভাবে ঘোরাফেরা করতে পারিনা তবে ছেলেমেয়ে সন্তানদের সাথে আড্ডা দিয়ে, গল্প গুজব করে সময় কাটে।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আগের ঈদ আর বর্তমানের ঈদ, কোন পার্থক্য কী খুঁজে পান?
ড. এম এয়াকুব আলী: হ্যাঁ পার্থক্য তো রয়েছেই। দিন গড়িয়েছে, সময় পেরিয়েছে অনেক। আগের মতো ঈদের আমেজ এখন আর নেই। ঈদ উদযাপনের ধরণ যেমন বদলেছে তেমনি আমাদের পারিবারিক বা দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতাও বদলেছে। আগে সব আনন্দের যোগান দিতেন আমার বাবা-মা। সবাই কতকিছু দিতো, কতো আয়োজন করতো কিন্তু এখন আমাকেই সেসব করতে হয়। আগে সব কেনাকাটার অর্থের জোগান দিত তারা, আর এখন তাদের চিন্তা আমাকে করতে হয়৷ তখন উনারা আমার অভিভাবক ছিলেন, এখন আমি অভিভাবক।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: ছোটবেলায় নিশ্চয়ই ঈদ সালামি পেতেন, এখন নিশ্চয়ই দিতে হয়। কোনটি বেশি আনন্দের?
ড. এম এয়াকুব আলী: ঈদ সালামি নেওয়া এবং দেওয়া - সমভাবে দুটোই আনন্দের। আগে পরিবারের সবার কাছ থেকে সালামি নিতে পারতাম এটাও আনন্দ দিতো, আবার এখন আল্লাহ সবাইকে সালামি দেওয়ার সামর্থ্য দিয়েছেন, এটাও আনন্দের।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: রমজানের আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের শিক্ষা বা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যতা কতটুকু বাস্তবায়ন হয় বলে মনে করেন এখন?
ড. এম এয়াকুব আলী: প্রতিবছর রমজান মাস আমাদের মাঝে আসে আল্লাহর বান্দাদের আত্মসংযমের একটি শিক্ষা নিয়ে। আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের মূল বিষয় হচ্ছে শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকাই নয়, বরং রোজা পালনের মাধ্যমে একজন মুসলিম আত্মসংযম, ধৈর্য, সহমর্মিতা ও তাকওয়ার শিক্ষা লাভ করে। পাশাপাশি রমজান আমাদের আল্লাহর কুদরত এবং শাস্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়৷ মহানবী হযরত মোহাম্মদ (স:) এর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের জন্য রোজা ফরজ করেছেন। এখন সেই পবিত্রতা ও ভাবগাম্ভীর্যতা রক্ষার চেষ্টা করা হয়। নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচার এরশাদ রমজানে হোটেল রেস্তোরাঁ সব বন্ধের ঘোষণা দেয়। কোন মুসাফির বা ভ্রমণকারীরা দিনের বেলায় কিছু খেলেও তা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো যদিও শরীয়ত মোতাবেক এটি দোষের কিছু না। সে তুলনায় বর্তমানে রোজার শিক্ষা, পবিত্রতা, ভাবগাম্ভীর্যতা অনেকটাই রক্ষিত হয় না। রসুলুল্লাহ (সঃ) এর সময়ে বিধর্মীরাও রমজানকে বা রোজাদারদের সম্মান করতো কিন্তু এখন এটার প্রচলন খুবই কম। এখন অনেক মুসলমানও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও রোজা রাখে না। তারাও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের দ্বারা রমজানের ভাবগাম্ভীর্যতার ব্যাঘাত ঘটায়। এগুলো দেখে খুব কষ্ট পাই।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: ঈদ উপলক্ষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কোন বার্তা দিতে চান?
ড. এম এয়াকুব আলী: ঈদে আমার প্রিয় শিক্ষার্থীরা ঘরমুখো হবে, ইনশাআল্লাহ তারা পিতামাতার সাথে মিলিত হবেন। তারা যেন নিরাপদে বাড়িতে যেতে পারে এবং পরিবার পরিজনদের সাথে ঈদ করে আবার নিরাপদে ক্যাম্পাসে ফিরতে পারে সেই দোয়া করি। তোমাদের উদ্দেশ্যে বলবো, তোমরা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তোমাদের চলনে-বলনে যেন কোনপ্রকার ঔদ্ধত্য প্রকাশিত না হয়। রমজানের শিক্ষাকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করবে, আত্মীয় স্বজনের খোঁজ খবর নেবে, ঈদের আনন্দ গরীব, দুঃখী, হতদরিদ্র ব্যক্তিদের সাথে ভাগাভাগি করে নেবে, তাদের পাশে দাঁড়াবে। সবার ঈদ সুন্দর কাটুক।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: নিজে থেকে কিছু বলতে চান?
ড. এম এয়াকুব আলী: মুসলিম বিশ্বের নিপিড়ীত নির্যাতিত ফিলিস্তিন, গাজা, ইরান সবাই আজ হুমকির সম্মুখীন। সমগ্র মুসলিম উম্মাহ আজ জায়ানবাদীদের আক্রোশের শিকার। আল্লাহ রব্বুল আ'লামীনের কাছে দোয়া করি, পবিত্র রমজানে মহান আল্লাহ যেন তাদের সহায় হন; তারা যেন মুক্তি পায়, শত্রুদের কবল থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারে। এছাড়া মাতৃভূমি বাংলাদেশের নবনির্বাচিত বর্তমান সরকার ও বিরোধী দল সবাই যেন দেশ গড়ায় আত্মনিয়োগ করতে পারে সেই কামনা করি। পাশাপাশি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সেই মহান নেতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তার সহধর্মিণীর জন্য দোয়া চাই, আল্লাহ যেন তাঁদের উভয়কে জান্নাত দান করেন।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস কে সময় দেওয়ার জন্য।
ড. এম এয়াকুব আলী: তোমাকেও ধন্যবাদ। সবার ঈদ সুন্দর কাটুক। ঈদ মোবারক।