ইউজিসি লোগো ও প্রতীকী ছবি © টিডিসি সম্পাদিত
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির ঘটনা প্রায় সময়ই মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়াতে আসে। অন্যদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ঘটনা ঘটলেও তা প্রকাশ্যে আসতো না। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির ঘটনা নিয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলে নড়েচড়ে বসে দেশের উচ্চশিক্ষার তদারক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এরপর চলতি বছরের শুরুতে একটি কমিটিও করে দেওয়া হয়। বিষয়টি দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাব জানানো হলে কমিটির কাছে অভিযোগও আসছে।
কমিশন সূত্রে জানা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি ভয়হীন ও নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করবে এই কমিটি। এছাড়া কমিটি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করবে এবং নীতি নির্ধারণী বিষয়ে কমিশনকে সরাসরি সহায়তা প্রদান করবে। কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি বা ডিজিটাল সহিংসতার ঘটনা ঘটলে, এই কমিটি সেটি তদন্ত করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করবে।
ছয় সদস্যের এই কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. নাহরিন আই খানকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফওজিয়া মান্নান, ইউজিসির উপ-সচিব (লিগ্যাল) রাজিনা খান। ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের উপ-পরিচালক নাসিমা আক্তার খাতুন। কমিটির সদস্য সচিব ইউজিসির সহকারী পরিচালক বি.এম সোহেল রানা।
এই কমিটির কার্যপরিধির মধ্যে রয়েছে, নারী শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য যৌন হয়রানি, সাইবার বুলিং, র্যাগিং মুক্ত শিক্ষাঙ্গণ/ক্যাম্পাস নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করা; কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক গৃহীত কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করা; নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে কমিশনকে সহায়তা করা; কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি এবং ডিজিটাল সহিংসতাসহ এধরণের কোন কিছু ঘটলে তা তদন্তপূর্বক সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন কমিশনে দাখিল করা; বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সংশ্লিষ্ট ডিলিং কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত দিয়ে কমিটিকে সহায়তা করবে।
ইতোমধ্যে যৌন হয়রানি ও ডিজিটাল ভায়োলেন্স-সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে কমিশন জানায়, তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চাকরিবিধি, সার্ভিস রুল ও শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা বিধির সত্যায়িত অনুলিপি জরুরি ভিত্তিতে জমা দিতে হবে। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যৌন হয়রানি ও ডিজিটাল ভায়োলেন্স প্রতিরোধে ইউজিসি একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে।
কমিশন সূত্রে জানা যায়, হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে গঠিত এ কমিটি ইতোমধ্যে কমিটি গণ বিশ্ববিদ্যালয় ও বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি অভিযোগ তদন্ত করছে এই কমিটি। কোনো শিক্ষার্থী নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটির ওপর আস্থা না পেলে তিনি সরাসরি ইউজিসির কমিটির কাছেও অভিযোগ করতে পারেন। এ লক্ষ্যে সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করতে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ব্যবস্থা, শৃঙ্খলা বিধি ও অভিযোগ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া সম্পর্কিত তথ্যও সংগ্রহ করছে কমিটি। অভিযোগ পাওয়ার পর সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করাই কমিটির মূল দায়িত্ব বলে জানা গেছে।
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিটির এক সদস্য দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, কমিটি ইতোমধ্যে গণ বিশ্ববিদ্যালয় ও বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি অভিযোগ নিয়ে কাজ করছে। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত এগিয়ে চলছে। বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিযোগ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় অভিযোগকারী শিক্ষার্থী ঘটনার কয়েক মাস পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ জানান। ভিকটিমের বিভাগীয় প্রধান (হেড) অভিযোগটি যথাযথ গুরুত্ব দেননি। তদন্তে দেখা হচ্ছে অভিযোগের প্রকৃতি, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং প্রমাণ— কারণ এটি একটি সংবেদনশীল বিষয়। বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ এবং পরে তার পক্ষে ও বিপক্ষে পৃথক লিখিত বক্তব্য ইউজিসির কাছে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার পর কমিটি পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
এ বিষয়ে কথা বলতে কমিটির সদস্য অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি কমিটির মুখপাত্র না, আদালতের ডিরেক্টরি অনুযায়ী আমি কমিটির কার্যক্রম নিয়ে কোনো কথা বলতে পারবো না।
কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. নাহরিন আই খানের মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি পাওয়া গেছে। তবে এসব কমিটির কার্যকারিতায় নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দাবি করে তারা অভিযোগ কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি করছে, কিন্তু ভুক্তভোগীরা পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করেন। এই ব্যবধান দূর করে সংবেদনশীল অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের লক্ষ্যেই ইউজিসি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করেছে।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু অভিযোগ তদন্ত নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে কোনো শিক্ষার্থী ভয় বা মানসিক চাপে থাকবে না।
কমিটির অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি আরও জানান, চলতি বছরের শুরুতে একজন নারী অধ্যাপকের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হলেও তিনি ব্যস্ততার কারণে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি। পরে সম্প্রতি কমিটি পুনর্গঠন করা হয় এবং বর্তমানে সদস্যদের সহযোগিতায় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।