বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো © সংগৃহীত ও সম্পাদিত
সরকারি অনুমোদন পেয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু বছর পেরোনোর সঙ্গে বদলেছে সরকার, পরিবর্তন হয়েছে দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের বাস্তবতাও—তবুও শুরু হয়নি শিক্ষা কার্যক্রম। এর মধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের প্রায় এক দশক পার হয়ে গেছে, আরেকটির আট বছর। কোথাও নেই শ্রেণিকক্ষের কোলাহল, নেই শিক্ষার্থী ভর্তি বা একাডেমিক কার্যক্রমের দৃশ্যমান উপস্থিতি।
দীর্ঘ সময়েও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে না পারা এমন তিনটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে এবার নড়েচড়ে বসেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে পৃথকভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, ফাইল প্রস্তুত এবং আইনি অবস্থান পর্যালোচনার কাজ চলছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ইতিমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী, নতুন কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রথমে সাত বছরের জন্য সাময়িক অনুমোদন দেওয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু, অবকাঠামোগত শর্ত পূরণ, নির্ধারিত জমি ও ক্যাম্পাসের ব্যবস্থা এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করে চূড়ান্ত সনদের জন্য আবেদন করতে হয়।
১০ বছরেও চালু হয়নি রূপায়ণ একেএম শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয়
২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় রূপায়ণ এ. কে. এম. শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয় সরকার। বিশ্ববিদ্যালয়টির উদ্যোক্তা ও ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান। নারায়ণগঞ্জে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতা শামীম ওসমানের পিতা প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম শামসুজ্জোহার নামে নামকরণ করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির।
তবে অনুমোদনের প্রায় ১০ বছর পরও বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়টির নামে পরিচালিত ওয়েবসাইটে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্দেশে একটি সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, নির্দিষ্ট একটি ডোমেইন ছাড়া অন্য কোনো ওয়েবসাইট তাদের নয় এবং প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
তবে ওয়েবসাইটটির তথ্য যাচাই করে বেশ কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। সেখানে উপাচার্য, বিভিন্ন অনুষদের ডিন ও শিক্ষক হিসেবে যেসব ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে, তার কয়েকটির সঙ্গে বাস্তব ব্যক্তিদের পরিচয়ের মিল পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রদর্শিত বেশ কয়েকটি নাম ও ছবি প্রকৃত পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ওয়েবসাইটে আরও দাবি করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৯ হাজার ৭২০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। এর মধ্যে ১১৫ জন বিদেশি শিক্ষার্থী। শিক্ষক রয়েছেন ৫১৫ জন, যাদের মধ্যে ১৮৮ জন পিএইচডিধারী। পাশাপাশি ৩১০ জন কর্মকর্তা ও ৬৫০ জন কর্মচারী থাকার তথ্যও দেওয়া হয়েছে।
তবে ইউজিসির একাধিক সূত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়টি বহু বছর ধরে কমিশনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে না। কমিশনের পক্ষ থেকে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন না থাকা অবস্থায় ওয়েবসাইটে হাজারো শিক্ষার্থী ও শত শত শিক্ষক থাকার দাবি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পাওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি, সেগুলোর বিষয়ে ইউজিসি প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা করছে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ফাইল প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের পর সাত বছরের মধ্যেও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে না পারা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়।—অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন, সদস্য, ইউজিসি
আট বছরেও শুরু হয়নি শাহ মখদুম ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটি
২০১৮ সালে রাজশাহীতে অনুমোদন পায় শাহ মখদুম ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জারি করা সাময়িক অনুমোদনপত্রে নির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করা হয়নি। এর প্রতিষ্ঠাতা বি. এম. শামসুল হক, যিনি নিজেকে সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন।
অনুমোদনের আট বছর পার হলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ওয়েবসাইটে অষ্টম সমাবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সেখানে উপাচার্য, প্রো-ভিসি, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিসেবে একাধিক ব্যক্তির ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে। এসব পরিচয়ের কয়েকটির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিশ্ববিদ্যালয়টির উপস্থিতি রয়েছে। ফেসবুকে পরিচালিত একাধিক পেজে ট্রাস্টি চেয়ারম্যানের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আলোচনা ও বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে। অন্য একটি পেজে শিক্ষার্থী ভর্তির প্রচারণাও দেখা গেছে।
ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়টির বিষয়ে তদন্ত কমিটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তদন্তে বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করার পর একটি প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও করা হয়েছে।
সময় ফুরিয়ে আসছে মাইক্রোল্যান্ড ইউনিভার্সিটির
২০২০ সালের ১৬ জুন অনুমোদন পায় মাইক্রোল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম শরীফ বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা। অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হতে এখনো প্রায় এক বছর বাকি থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়ার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। ইউজিসির কর্মকর্তারা বলছেন, সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই বিশ্ববিদ্যালয়টির অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে। নির্ধারিত শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হতে পারে।
আইনে কী বলা আছে
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী, নতুন কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার থেকে সাময়িক অনুমোদন নিতে হয়, যার মেয়াদ থাকে সর্বোচ্চ সাত বছর। এই সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু, নিজস্ব জমি অধিগ্রহণ, স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও একাডেমিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে সরকার প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত তথ্য চাইতে পারে এবং সন্তুষ্ট না হলে শুনানির সুযোগ দিয়ে আবেদন নামঞ্জুর করার ক্ষমতা রাখে। একই সঙ্গে নামঞ্জুর আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যায় এবং সেই আবেদন ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হয়—যার পর সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।
ইউজিসির নজরদারিতে প্রতিষ্ঠানগুলো
ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদনের সাত বছরের বেশি সময় পার করেও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে না পারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিষয়ে কমিশন সমন্বিত পর্যালোচনা শুরু করেছে। শাহ মখদুম ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটির বিষয়ে তদন্ত কমিটির কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। অনুমোদনের সময়সীমা অতিক্রম এবং বিভিন্ন জটিলতার প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়টি সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে।
একই সূত্র জানায়, রূপায়ণ একেএম শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়েও ইউজিসিতে পৃথক ফাইল প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অনুমোদনের সাত বছরের বেশি সময় পার করেও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে না পারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিষয়ে কমিশন পর্যালোচনা করছে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি বিধান লঙ্ঘনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। মাইক্রোল্যান্ড ইউনিভার্সিটিসহ একই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে পৃথক ফাইল প্রস্তুতের কাজও শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউজিসির দায়িত্বশীল সূত্র।
‘সাত বছরে চালু না হওয়া উদ্বেগের বিষয়’
এ বিষয়ে ইউজিসির সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পাওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি, সেগুলোর বিষয়ে ইউজিসি প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা করছে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ফাইল প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের পর সাত বছরের মধ্যেও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে না পারা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। ইউজিসি বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে।
অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের মতে, অনুমোদন পাওয়ার পরও কেন কিছু বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ সময়েও কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি, সেটি এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তিনি বলেন, প্রয়োজনে সরকার এ বিষয়ে বিশেষ পর্যালোচনা বা তদন্তের উদ্যোগ নিতে পারে। একই সঙ্গে অনুমোদন প্রক্রিয়ার কোথাও কোনো ঘাটতি ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে যাতে কেবল বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সক্ষমতা, আর্থিক সামর্থ্য ও বাস্তব প্রস্তুতি থাকা উদ্যোক্তারাই অনুমোদন পান, সে বিষয়েও নীতিগতভাবে আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।