ডিআইইউর শিক্ষার্থীরা © টিডিসি সম্পাদিত
একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। রক্তে লেখা ইতিহাসের এই দিনটি শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি নতুন প্রজন্মের চেতনা, আত্মপরিচয় ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অনুপ্রেরণা। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রভাতফেরি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে সারাদেশে পালিত হচ্ছে দিবসটি। এ উপলক্ষে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের ডিআইইউ প্রতিনিধি নুর ইসলাম। তাদের কণ্ঠে উঠে এসেছে ভাষা, পরিচয় ও দায়িত্ববোধের কথা।
ভাষা ছাড়া জাতির অস্তিত্ব কল্পনাই করা যায় না
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী তাহমিদ তারিক বলেন, ভাষা আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে অধিকার আদায়ে কীভাবে রুখে দাঁড়াতে হয়। যদি ১৯৫২ সালে ছাত্ররা প্রতিবাদ না করত, আজ হয়ত আমরা মাতৃভাষায় কথা বলার সুযোগই পেতাম না। ভাষা ছাড়া কোনো জাতির অস্তিত্ব কল্পনাই করা যায় না।
তিনি আরও বলেন, একুশ আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে। শুধু রাষ্ট্রভাষা নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রেও ভাষা আন্দোলন আমাদের জন্য পথনির্দেশক। এখন আমাদের দায়িত্ব বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করা, গবেষণা বাড়ানো এবং প্রযুক্তিতে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা। মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা মানে নিজের ইতিহাস ও শিকড়ের প্রতি শ্রদ্ধা।
একুশ আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি
ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটির ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়, এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। ভাষা আন্দোলন থেকেই বাঙালির জাতীয়তাবাদের বীজ রোপিত হয়েছে।
তার মতে, আজকের প্রজন্ম অনেক সময় ইংরেজি ব্যবহারে বেশি ঝুঁকে পড়ছে, কিন্তু মাতৃভাষাকে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ মাতৃভাষার মাধ্যমেই আমরা সবচেয়ে গভীরভাবে ভাবতে, অনুভব করতে এবং নিজেদের প্রকাশ করতে পারি। বাংলা ভাষার সাহিত্য, গান ও সংস্কৃতিই আমাদের আলাদা জাতিসত্তা তৈরি করেছে। তাই একুশ মানে নিজের পরিচয় নতুন করে আবিষ্কার করা।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের গর্বের বিষয়
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ইউনেস্কো যখন একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তখন পুরো বিশ্বের কাছে বাংলাভাষীদের আত্মত্যাগের ইতিহাস ছড়িয়ে পড়ে। এটি আমাদের জন্য বিশাল গর্বের।
তিনি বলেন, ভাষার বৈচিত্র্য রক্ষা করা মানে মানবসভ্যতার বৈচিত্র্য রক্ষা করা। পৃথিবীতে হাজারো ভাষা বিলুপ্তির পথে - এটি মানব ইতিহাসের জন্য বড় ক্ষতি। তাই শুধু বাংলা নয়, সব ভাষার প্রতি সম্মান দেখানো আমাদের দায়িত্ব। ভাষার মাধ্যমে মানুষের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জ্ঞান সংরক্ষিত থাকে।
ডিজিটাল যুগেও বাংলা ভাষার চর্চা বাড়াতে হবে
আইডিয়াল কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মো: আরমান হোসেন জিয়া বলেন, ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির বড় অংশ এখনো ইংরেজিনির্ভর। তবে বাংলা কিবোর্ড, সফটওয়্যার ও কনটেন্ট বাড়ছে, যা আশাব্যঞ্জক।
তার ভাষায়, আমাদের উচিত প্রযুক্তিতে বাংলার ব্যবহার বাড়ানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করা এবং নতুন প্রজন্মকে বাংলা সাহিত্য পড়তে উৎসাহিত করা। অনলাইনে যদি আমরা শুদ্ধ ও সুন্দর বাংলা ব্যবহার করি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভাষার প্রতি আরও আগ্রহী হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই এখন ভাষার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হচ্ছে।
একুশের চেতনায় ভবিষ্যতের পথে
ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণা। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে উঠে আসা ভাবনায় স্পষ্ট - একুশের চেতনা এখনো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হচ্ছে।
একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষা কেবল শব্দ নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং স্বাধীনতার প্রতীক। নতুন প্রজন্মের হাত ধরেই এই ভাষা ও চেতনা এগিয়ে যাবে আগামী দিনের পথে।