সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান করছেন এক সহকারী শিক্ষক © সংগৃহীত
দূরবর্তী বিদ্যালয়ে পদায়ন, দীর্ঘ যাতায়াত, বাসস্থানের সংকট আর পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকার দুশ্চিন্তা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সদ্য নিয়োগ পাওয়া অনেক সহকারী শিক্ষকের কাছে কর্মস্থল এখন বড় বাস্তব চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে পারস্পরিক বদলির (মিউচুয়াল ট্রান্সফার) সুযোগ তাঁদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। লালমনিরহাটে প্রথমবারের মতো দুই শিক্ষকের বিদ্যালয় অদলবদল করে সংশোধিত পদায়ন আদেশ জারি করেছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। এতে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি অন্য শিক্ষকদের জন্যও সম্ভাবনার নতুন পথ খুলেছে।
রবিবার (২৫ অক্টোবর) লালমনিরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের জারি করা এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। আদেশে হাতীবান্ধা উপজেলার দুই সহকারী শিক্ষকের কর্মস্থল পারস্পরিকভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একজনের পদায়ন করা বিদ্যালয়ের জায়গায় অন্যজনের বিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করে সংশোধিত আদেশ দেওয়া হয়।
আদেশ অনুযায়ী, মাহবুবা আক্তার নূপুরের পদায়ন করা পশ্চিম ঠেংঝাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিবর্তে ডাউয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, মো. আব্দুর রহিমের পদায়ন করা ডাউয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিবর্তে পশ্চিম ঠেংঝাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশোধিত আদেশে বলা হয়, নতুন কর্মস্থলে যোগদানের জন্য সংশ্লিষ্ট দুই শিক্ষককে ১৮ অক্টোবর অপরাহ্নে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে অবমুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের ১৯ অক্টোবর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে রিপোর্ট করতে এবং ২৬ অক্টোবর সংশোধিত পদায়ন করা বিদ্যালয়ে যোগ দিতে বলা হয়েছে। বিধি অনুযায়ী, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে অবমুক্তির তারিখ থেকে তাঁরা বেতন-ভাতা পাবেন। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্গম এলাকায় দুর্গতি বেশি
সদ্য নিয়োগ পাওয়া অনেক সহকারী শিক্ষককে নিজ বাড়ি থেকে দূরের বিদ্যালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। ফলে ভোগান্তির শুরু। কিন্তু দুর্গম এলাকার বাস বা পদায়নকৃত শিক্ষকদের দুর্গতি আরও বেশি। কারণ কারও জন্য নতুন কর্মস্থলে যাতায়াত ব্যয়বহুল, কারও জন্য প্রতিদিন যাতায়াত করাই কঠিন। আবার দূরবর্তী এলাকায় বাসস্থান নিশ্চিত করা, পরিবারের দায়িত্ব পালন এবং নিরাপদে যাতায়াতের ব্যবস্থা করাও অনেকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা আরও জটিল হয়ে দেখা দিতে পারে। কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সন্তানদের দেখাশোনা, পরিবারের সদস্যদের যত্ন এবং অন্যান্য পারিবারিক দায়িত্ব সামলাতে হয় তাঁদের। দূরের বিদ্যালয়ে পদায়নের কারণে অনেককে পরিবার থেকে আলাদা থাকতে হচ্ছে, আবার কারও নিয়মিত যাতায়াতে সময় ও অর্থ—দুটিই বেশি ব্যয় হচ্ছে।
সহকারী শিক্ষক নাসরিন আক্তারের বাড়ি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায়। তাঁর স্বামীও চাকরির কারণে একই উপজেলায় অবস্থান করেন। তবে স্বামীর অবস্থানের তুলনায় তাঁর কর্মস্থল বিপরীত দিকে হওয়ায় সংসার ও কর্মজীবন সামলানো নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি। তাঁদের একটি সন্তানও রয়েছে।
নাসরিন আক্তার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, স্বামীর কর্মস্থল থেকে তাঁর বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় ২৫ থেকে ২৭ কিলোমিটার। স্বামী থাকেন পূর্ব দিকে, আর তাঁর কর্মস্থল পড়েছে পশ্চিম দিকে। ফলে সন্তানের দেখাশোনা ও পারিবারিক দায়িত্ব কীভাবে সামলাবেন, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি তিনি।
তিনি জানান, আপাতত কয়েক দিন সন্তানকে তাঁর মায়ের কাছে রেখে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করবেন। তবে দীর্ঘ মেয়াদে কীভাবে সন্তানকে দেখাশোনা করবেন এবং চাকরির পাশাপাশি পারিবারিক দায়িত্ব পালন করবেন, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে পারস্পরিক বদলির সুযোগ শিক্ষকদের কর্মস্থলসংক্রান্ত ভোগান্তি কমাতে পারে। একই পদে কর্মরত দুই শিক্ষক পারস্পরিক সম্মতি ও প্রযোজ্য বিধি মেনে একে অপরের কর্মস্থলে যাওয়ার সুযোগ পেলে তাঁদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দায়িত্ব পালন করা সহজ হবে।
নাসরিন আক্তারেরও প্রত্যাশা, পারস্পরিক বদলির সুযোগ কার্যকর হলে কর্মস্থলসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হতে পারে। এতে স্বামীর কর্মস্থল ও পরিবারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চাকরি করার সুযোগ তৈরি হলে সন্তানকে দেখাশোনা এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনের চাপও কিছুটা কমতে পারে।
এদিকে চরাঞ্চল, হাওরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য কর্মস্থলে যাতায়াত প্রায়ই বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। কোথাও নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয়, কোথাও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে হয়। প্রতিকূল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এসব এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত ও আবাসনের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রায়হান হোসেনের বাড়ি কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার পিতাবাড়ি এলাকায়। তাঁর কর্মস্থল পাহাড়তলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, যানবাহনের অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণে কর্মস্থলে যাতায়াত নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
রায়হান হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বিদ্যালয়ে যেতে হলে তাঁকে সকাল ৭টার আগেই বাড়ি থেকে রওনা দিতে হবে। শুরুর দিকে কিছুটা পাকা রাস্তা থাকলেও পরে উঁচু-নিচু কাঁচা রাস্তা দিয়ে যেতে হয়। ওই পথে নিয়মিত যানবাহন পাওয়া যায় না। ফলে সময়মতো বিদ্যালয়ে পৌঁছে হাজিরা দেওয়া নিয়েও শঙ্কা রয়েছে তাঁর।
তিনি বলেন, মোটরসাইকেলে যাতায়াতের বিকল্প থাকলেও তিনি এখনো মোটরসাইকেল চালাতে অভ্যস্ত নন। এ ছাড়া প্রতিদিন যাতায়াতে বাড়তি খরচের বিষয়টিও রয়েছে। একবার বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে গিয়ে তাঁর যাতায়াতে প্রায় এক ঘণ্টা ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লেগেছে।
রায়হান হোসেনের ভাষ্য, বিদ্যালয় ছুটি হতে হতে বিকেল সাড়ে চারটা বেজে গেলে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যেতে পারে। এলাকার নিরাপত্তা নিয়েও তাঁর কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা এবং মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে পরিবারের সদস্যদেরও দুশ্চিন্তায় থাকতে হতে পারে।
পারস্পরিক বদলির সুযোগ কার্যকরভাবে চালু হলে একই ধরনের সমস্যায় থাকা শিক্ষকেরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে কর্মস্থল পরিবর্তনের আবেদন করতে পারবেন। এতে একদিকে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ভোগান্তি কমার সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে কর্মস্থল নিয়ে অনিশ্চয়তা কমিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনে মনোযোগী হওয়াও সহজ হতে পারে।
প্রত্যাশা সহস্রাধিক শিক্ষকদেরও
সদ্য নিয়োগ পাওয়া প্রায় ১৪ হাজার সহকারী শিক্ষকের মধ্যে যাঁরা দূরবর্তী কর্মস্থল, যাতায়াতের অসুবিধা কিংবা পারিবারিক দায়িত্বের কারণে সমস্যায় রয়েছেন, তাঁদের কাছে পারস্পরিক বদলির সুযোগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। লালমনিরহাটে দুই শিক্ষকের কর্মস্থল অদলবদলের ঘটনায় অন্য শিক্ষকদের মধ্যেও এ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট অধ্যাপক হলেন ড. মো. ফজলুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিক্ষকদের জন্য কর্মস্থল কেবল চাকরির নির্ধারিত স্থান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের কাছে থাকার পাশাপাশি নিরাপদে যাতায়াত করা এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের প্রশ্নও। তাই পারস্পরিক বদলির সুযোগ সম্প্রসারিত হলে তা শুধু কর্মস্থল পরিবর্তনের প্রক্রিয়া হিসেবে নয় বরং নতুন শিক্ষকদের বাস্তব সমস্যা বিবেচনায় নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
তিনি বলেন, এ সুযোগ কতটা বিস্তৃতভাবে কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া, অনুমোদন এবং বাস্তবায়নের ওপর। পারস্পরিক সম্মতি ও প্রশাসনিক শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বদলির সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষকদের কর্মস্থলসংক্রান্ত মানবিক সমস্যাগুলো সমাধানে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।