৩ বছর পর রহস্য উদঘাটন
রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ (ইনসেটে নিহত কিশোর আশরাফুল) © টিডিসি সম্পাদিত
সমকামিতার সম্পর্ক থেকে বিরোধের জেরেই ৩ বছর আগে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের স্কুলছাত্র আশরাফুল ইসলাম নিখোঁজ হয়েছিলেন বলে দাবি করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্তের বরাত দিয়ে সিআইডি বলছে, অপহরণের পর আশরাফুলকে হত্যা করে তার লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় মূল অভিযুক্ত মো. রফিকুল ইসলামকে (৫৪) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী স্কুলছাত্র আশরাফুল উপজেলার জামিরতা গাড়াদহ গ্রামের সন্তান। ঘটনার সময় সে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করত। অপরদিকে রফিকুল ইসলাম একই এলাকার মৃত নুর হোসেন মোল্লার ছেলে। এর আগে তিনি আরেক সমকামী প্রেমিকের পুরুষাঙ্গ কেটে দেওয়ার ঘটনায় ৭ বছরের সাজা ভোগ করেছিলেন।
সিআইডির অনুসন্ধান বলছে, কিশোর আশরাফুল তার দুই বন্ধুর সঙ্গে এক যৌনকর্মীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার জেরে তাকে অপহরণের পর হত্যা করেছেন রফিকুল।
সিআইডি জানায়, ২০২৩ সালের ৩১ আগস্ট সন্ধ্যার পর রফিকুল মোবাইল ফোনে আশরাফুলকে একাধিকবার ফোন করে বাড়ি থেকে ডেকে জামিরতা বাজারে নিয়ে যায়। এরপর আশরাফুল আর বাড়িতে ফিরে আসেনি। রাতে পরিবারের সদস্যরা তার অপেক্ষায় থাকলেও সে বাড়িতে না ফেরায় বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরদিন তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়। আত্মীয়-স্বজন সম্ভাব্য স্থানে খোঁজ করেও আশরাফুলের সন্ধান না পাওয়ায় তার বাবা শাহজাদপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
আরও পড়ুন: ঢাবিতে ফের সমকামিতার অভিযোগ, দুই ছাত্রকে হল থেকে বহিষ্কার
আশরাফুলের নিখোঁজের পর তার পরিবারের সদস্যরা রফিকুলের কাছে গিয়ে আশরাফুলের বিষয়ে জানতে চাইলে রফিকুলের অবস্থান ও কথাবার্তায় তারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। দীর্ঘদিন ধরে আশরাফুলের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তার মা ১৩ নভেম্বর আদালতে তিনজনকে আসামি করে পিটিশন মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে আদলত মামলাটির তদন্ত ভার সিআইডি সিরাজগঞ্জ এর উপর ন্যস্ত করেন।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বলছে, মামলাটি ছিল আপাত ক্লু-লেস শিশু অপহরণ মামলা। দীর্ঘদিন তদন্ত করেও ভুক্তভোগীর অবস্থান বা তার সঙ্গে কী ঘটেছে সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। পরবর্তীতে মামলার তদন্তভার এসআই (নিরস্ত্র) মো. আজমল হোসেনের ওপর অর্পিত হলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোনালিসা বেগমের নির্দেশনায় তদন্তের গতিপথে নতুন মাত্রা যোগ হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার আরজি পুনঃবিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ এবং স্থানীয়ভাবে গোপন ও প্রকাশ্য তদন্ত শুরু করেন।
আরও পড়ুন: চমেকের ইন্টার্ন চিকিৎসকের সমকামিতার তথ্য প্রকাশ্যে, বয়কটের ঘোষণা
তদন্তের একপর্যায়ে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য ও ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র পাওয়া যায় এবং প্রধান আসামি মো. রফিকুল ইসলামের ভূমিকা বিশেষভাবে সামনে আসে। মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর হওয়ায় অধিকতর নিবিড় তদন্তের স্বার্থে তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে মামলাটি পিটিশন মামলা থেকে নিয়মিত এফআইআর হিসেবে শাহজাদপুর থানায় রুজুর আবেদন করেন। আদালতের আদেশে মামলাটি নিয়মিত এফআইআর হিসেবে রুজু হওয়ার পর তদন্ত আরও গতিশীল হয়।
এর ধারাবাহিকতায় গত ১২ আগস্ট দুপুর দেড়টায় জামিরতা বাজার এলাকা থেকে রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদে আশরাফুলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার অন্তরালে থাকা চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।
জিজ্ঞাসাবাদে রফিকুল জানায়, ভুক্তভোগী আশরাফুলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ শারীরিক সম্পর্ক ছিল। তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা অবস্থায় রফিকুল জানতে পারে যে, আশরাফুল তার আরও দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে একজন যৌনকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছে। বিষয়টি রফিকুলের কাছে অত্যন্ত অপমানজনক ও ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে সেই ক্ষোভ থেকেই সে আশরাফুলকে হত্যার পরিকল্পনা করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন রফিকুল মোবাইল ফোনে আশরাফুলকে ডেকে যমুনা নদীর পাড়ে নিয়ে যায়। সেখানে যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট দেওয়ার কথা বলে রফিকুল কৌশলে আশরাফুলকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ায়। ওষুধের প্রভাবে আশরাফুল অচেতন হয়ে পড়লে রফিকুল তাকে যমুনা নদীর পানিতে ফেলে দেয়। পরে নদীর স্রোতে আশরাফুলের মরদেহ ভেসে যায় বলে জিজ্ঞাসাবাদে রফিকুল জানায়।
রফিকুল ইসলাম পরবর্তীতে স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানের আগ্রহ প্রকাশ করলে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন।
তদন্তে আরও জানা যায়, রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বেও গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার ইতিহাস রয়েছে। প্রায় ১২ বছর আগে উল্লাপাড়া থানা এলাকায় মন্টু মিয়া নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে তাঁতের কাজে সহযোগিতা করার সময় তার বড় ছেলে শাহিনের সঙ্গে রফিকুলের অনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়। পরবর্তীতে শাহিনের বিয়ের বিষয় জানতে পেরে রফিকুল ক্ষুব্ধ হয়ে একপর্যায়ে ঘুমন্ত অবস্থায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে শাহিনের পুরুষাঙ্গের অংশবিশেষ কেটে দেয়। এ ঘটনায় মন্টু মিয়া বাদী হয়ে ২০১৫ সালের ২৩ জুন শাহজাদপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ রফিকুলের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে এবং বিচারিক কার্যক্রম শেষে তিনি সাত বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে সাজা ভোগ করেন।
এদিকে সিআইডির তদন্তে আশরাফুলকে অপহরণের আড়ালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটিত হলেও তার মরদেহ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সিআইডি জানিয়েছে, রফিকুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এবং সম্ভাব্য অন্যান্য উৎস থেকে মরদেহের সন্ধান অব্যাহত রয়েছে। যমুনা নদীর ভাটি অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে অজ্ঞাতনামা মরদেহ সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে এবং সরেজমিনে সংশ্লিষ্ট থানার রেজিস্টার ও নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে।
সিআইডি বলছে, মরদেহ উদ্ধার, আসামির দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই ও ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা উদঘাটনে সিআইডির তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।