জুলাই আন্দোলন নিয়ে এমপি নিলোফার মনির নতুন বয়ান

০২ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৬ PM , আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৭:২১ PM
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি

সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি © সংগৃহীত

ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ ও হাসিনার স্বৈরশাসনের পতনের আন্দোলন যা জুলাই আন্দোলন নামে পরিচিত তার পেছনে ‘ডিজাইন’ ছিল বলে দাবি করেছেন বিএনপি দলীয় সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি। বুধবার (০১ জুলাই) রাতে বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ে উপস্থাপক সোমা ইসলামের ‘টু দ্য পয়েন্টে’ টকশোর একজন অতিথি হিসেবে আসেন নিলোফার চৌধুরী মনি ও এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব মো. আলাউদ্দিন। 

টকশোতে সরকার দলীয় এই সংসদ সদস্যের জুলাই আন্দোলন নিয়ে এ বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিএনপির প্রধানতম সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবও ফেসবুকে টকশোতে মনির বক্তব্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। 

টক শোতে নিলোফার মনি বলেন, যার বিয়ে তার খবর নেই, পাড়া-প্রতিবেশীর ঘুম নেই। তবে পাড়া-প্রতিবেশী যদি এভাবে নির্ঘুম থাকে, খারাপও না অন্তত দলটা পাহারায় থাকে। অনেক কিছুই আমি বলতে পারি না, বলতে চাইলেও পারি না। কারণ অনেক কিছু বললে অনেকের কাপড়চোপড় ঠিক থাকবে না। কারা সেনাবাহিনীর সঙ্গে কথা বলেছে, কখন কোথায় কীভাবে দেখা করেছে, কার কী ভূমিকা ছিল এসব বিষয়ে অনেক তথ্য রয়েছে। যাদের বলা হয় আন্দোলনের মূল ব্যক্তি, তাদের ভূমিকা নিয়েও অনেক প্রশ্ন আছে।

আন্দোলনের সময়কার পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, আসলে এ আন্দোলনের মূল কারা ছিল, সেটা কেউ জানত না। একজন আরেকজনকে চিনত না। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে আন্দোলন করছিল, হঠাৎ পাশের একজন পড়ে গেছে। অনেকেই ভেবেছে, হয়ত স্বাভাবিকভাবে পড়ে গেছে। পরে জানা গেছে, সে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। গুলিটা সামনে থেকে এসেছে, নাকি পেছন থেকে এসেছে, সেটাও কেউ জানত না। অনেক ক্ষেত্রে গুলির কোনো শব্দও শোনা যায়নি। পরে বলা হয়েছে, সেগুলো স্নাইপারের গুলি ছিল।

উপস্থাপক সোমা বলেন, তাহলে কি এটা কোনো ডিজাইন ছিল? এটা কি কোনো ষড়যন্ত্র ছিল? 

এমন প্রশ্নের জবাবে মনি বলেন, ডিজাইন তো অবশ্যই ছিল। সেটা ষড়যন্ত্র ছিল কি না, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। তবে স্নাইপারের উপস্থিতির বিষয়টি সত্যি। একই সঙ্গে এটাও সত্যি, শেখ হাসিনার মতো একটি মহাস্বৈরাচারের হাত থেকে দেশ মুক্ত হয়েছে। তিনি যদি এত বড় স্বৈরাচার না হতেন, তাহলে হয়তো এমন পরিস্থিতির প্রয়োজন হতো না।

মনির এ বক্তব্যে তীব্র প্রতিবাদ জানান টকশোর অপর অতিথি মো. আলাউদ্দিন। তিনি বলেন, মনি আপা যে কথা বলছেন, তিনি নিজের কথাই নিজে প্রুফ’ করছেন। তিনি বলছেন, এখানে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল। যদি জনগণের অংশ গ্রহণ থাকে তবে কেন আওয়ামীলীগের ভাষায় বলছেন, এই আন্দোলনের পেছনে যড়যন্ত্র ছিল, আপনি তো ষড়যন্ত্রের আগ পর্যন্ত চলে গিয়েছেন! আপনি বলছেন, আন্দোলনের পেছনে ‘ডিজাইন’ ছিল। এই ডিজাইন কারা করেছে? 

প্রতি উত্তরে মনি বলেন, আসিফ ভূইয়াকে জিজ্ঞাসা করলে বের হয়ে আসবে। যে বলেছে, এই দেশটা ডীপ স্টেট। 

আপনি বলেছেন, তাদের দেখা যায় না। আপনার মনে আছে না, যাত্রাবাড়িতে জনগণ দুজন পুলিশকে ঝুলিয়ে দিয়েছিল, এই পুলিশগুলো কারা ছিল? তারা স্নাইপার ছিল। সেখানে জনগণ বাসাবাড়িতে ঢুকে খুঁজে দুজন স্নাইপারকে ধরে এনেছে। তাদের ঝুলিয়ে দিয়েছে। 

আলাউদ্দিনের এ বক্তব্যের কাউন্টার দিয়ে মনি বলেন, বাংলাদেশে কোনো স্নাইপার ছিল না আলাউদ্দিন ! পুলিশে কোনো স্নাইপার নাই ! বাংলাদেশে কোনো স্নাইপার নাই। এই স্নাইপার বাইরে থেকে এসেছে ! এটা বাইরের ! আলাউদ্দিন বলেন, আপনি শুরুতে ক্যান্টনমেন্টের কথা বললেন, এখন বলছেন,অজানা ! এটা কিভাবে অজানা থাকে? আপনি আপনাদের হীনমন্যতা ঢাকার জন্য বারবার একই কথা বলছেন।

প্রতি উত্তরে মনি বলেন, আমাদের কোনো হীনমন্যতা নাই। আমাদের ছিল শুধু উদারতা। আমার এই কথা ১০ বছর পর তুমি রিয়ালাইজ করতে পারবে যে, তুমি কী ছিলা, আমি কী ছিলাম, সোমা (টকশোর সঞ্চালক) কী ছিল, আরেকজন কী ছিল? তুমি তোমার জায়গায় নিজেকে বড় করে দেখালে বিএনপির নাম হবে। আমরাতো চাইনি বিএনপির নাম হোক। আমরা চেয়েছি, ছোট সন্তানদের নাম হোক। আমরা তো চাইনি আমাদের নাম হোক।

তিনি আরও বলেন, তবে এটাও মনে করা ঠিক হবে না যে পুরো বিষয়টি শুধু আন্দোলনে থাকা ব্যক্তিদের হাতেই ছিল। সাধারণ মানুষ, সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা তো এসব কিছু বুঝে রাস্তায় নামেনি। তারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে নেমেছিল।

একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নিলুফার মনি বলেন, আন্দোলনের সময় একজন আমাকে ফোন করে বলেছিল, ‘আপা, আমি দুই-তিনজনকে নিয়ে আসব, আমাদের একটু খেতে দেবেন?’ আমি বললাম, আসো। তখন আমার জন্যও সময়টা খুব ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আমি নিয়মিত টকশো করতাম। পরে ঢাকা কলেজের এক ছাত্রনেতা আমার বাসায় এলো। সে কান্না করে বলছিল, মোহাম্মদপুরে মিছিল করার সময় তার পাশের একজন হঠাৎ পড়ে যায়। তখন সে বুঝতেই পারেনি কী হয়েছে। পরে জানতে পারে, সে মারা গেছে। গুলির কোনো শব্দও তারা শোনেনি।

তিনি বলেন, ছেলেটি আমাকে বলেছিল, তাদের খাবারের অভাব ছিল না। কোথা থেকে খাবার আসছিল, সেটাও তারা জানত না। কিন্তু কয়েক দিন ধরে ভাত না খাওয়ায় তার শুধু ভাত খেতে ইচ্ছা করছিল। সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আপনার বাসায় ভাত আছে?’ আমি বাসায় ফোন করে জানতে পারি ভাত আছে, তারপর তাকে আসতে বলি। পরে খবর নিয়ে জানতে পারি, যে এলাকায় সে ছিল, সেখানে আরও দুই-তিনজন নিহত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সেই ছেলেটিও মারা যায়।

তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, ঢাকা কলেজের ছাত্রনেতা হওয়া সত্ত্বেও সে আশপাশের কাউকেই চিনত না। কে কোথা থেকে এসেছে, কে কোথায় যাচ্ছে কেউ কারও পরিচয় জানত না।

এ এমপি বলেন, আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাল কারা? সেখানে তো কোনো পুলিশও ছিল না। পুলিশের গুলি হলে তো সামনে থেকেই আসত। তাহলে কি কোনো বাসার ওপরতলা থেকে টার্গেট করে গুলি করা হয়েছিল? হতে পারে। কিন্তু এসব প্রশ্নের অনেকগুলোরই উত্তর আজও আমার কাছে নেই। আমি বিষয়টি নিয়ে অনেক পড়াশোনা ও বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছি। কিন্তু একটি জায়গায় গিয়ে দেখি, আর কোনো উত্তর খুঁজে পাই না।

প্রসঙ্গত, হাসিনার শাসনামলে নিলোফার চৌধুরী মনির রাজনৈতিক দল বিএনপি দীর্ঘ প্রায় দেড়যুগ দেশে জনগণের বাক স্বাধীনতা, ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্র ফেরাতে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করে। এই আন্দোলন-সংগ্রামে দলটির ৭‘শর বেশি নেতাকর্মীকে গুমের শিকার হতে হয়। কয়েক হাজার নেতাকর্মী অকাতরে জীবন দেয়, মামলা-হামলা-নির্যাতনের শিকার হয় লাখ লাখ নেতাকর্মী। কিন্তু আন্দোলনে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে না পারায় হাসিনা একের পর এক বিনা ভোট, দিনের ভোট রাতে করে ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনের উপর ভর করে দিব্যি শাসন করে যায়। 

অবশেষে চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে গঠিত অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে’র ব্যানারে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ফ্যাসিস্ট হাসিনার স্বৈরশাসন থেকে দেশকে মুক্ত করতে রাজনীতির বাইরের সাধারণ জনগণের রাস্তায় নেমে আসে। সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব এই সাড়া হাসিনা বিরোধী আন্দোলনকে তুঙ্গে নিয়ে যায়। সাধারণ জনতা, ছাত্র-অছাত্র, শ্রমিক, মজুর সব শ্রেণির মানুষের বুকের রক্ত ও জীবনের বিনিময়ে অবশেষে ওই বছরের ৫ আগস্ট অগণতান্ত্রিক হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এক পর্যায়ে জনরোষের ভয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাশের দেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় জবিতে চালু হচ্ছে ‘জেএনইউ কুইক রেসপ…
  • ০২ জুলাই ২০২৬
আইসিডিডিআর,বির ট্রাস্টি বোর্ডে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ও দুই…
  • ০২ জুলাই ২০২৬
শিক্ষা খাতে কোনো ধরনের আর্থিক অনিয়ম গ্রহণযোগ্য হবে না: শিক্…
  • ০২ জুলাই ২০২৬
হত্যার হুমকি পাওয়া পলিটেকনিক সভাপতির সাথীপদ বাতিল, খোয়ালেন …
  • ০২ জুলাই ২০২৬
গবেষণা: বিতর্ক অর্থায়নের নয়, আস্থার
  • ০২ জুলাই ২০২৬
টঙ্গীতে চাঁদাবাজি-অস্ত্র প্রদর্শন: যুবদল নেতা নাজমুলসহ ১৯ জ…
  • ০২ জুলাই ২০২৬