ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র থেকে যেভাবে অর্থনীতির জটিল জগতে মুহিত

ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র থেকে যেভাবে অর্থনীতির জটিল জগতে মুহিত
  © ফাইল ছবি

ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র আবুল মাল আবদুল মুহিত দীর্ঘ কর্মজীবনে কখনও সরকারি কর্মকর্তা, কখনও কূটনীতিক, কখনও আবার অর্থনীতিবিদ, লেখক বা গবেষকের ভূমিকায় তিনি অবতীর্ণ হয়েছেন। তবে ইতিহাস হয়ত তাকে টানা এক দশক অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলানো একজন রাজনীতিবিদ হিসেবেই মনে রাখবে।

মন্ত্রিত্ব থেকে মুহিত অবসর নিয়েছিলেন বছর চারেক আগেই; শুক্রবার মধ্যরাতে ৮৮ বছর বয়সে তিনি জীবন থেকেও চিরবিদায় নিলেন। সিলেট-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল মাল আবদুল মুহিতের জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটে।

বাবা অ্যাডভোকেট আবু আহমদ আবদুল হাফিজ ছিলেন সিলেট মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মা সৈয়দ সাহার বানু চৌধুরীও মহিলা মুসলিম লীগের নেত্রী ছিলেন।

কৈশোরে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় জড়িয়ে পড়া মুহিত মুকুল ফৌজে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৯ সালে সিলেট সরকারি পাইলট হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক শেষ করে ১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম হন তিনি।

মুহিত যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যে পড়তে এলেন, পূর্ব পাকিস্তান তখন রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে উত্তাল। সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়া মুহিত সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভিপিও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে একাত্তর ব্যাচের শিক্ষার্থী হোসনে আরার হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন ১৯৫৫ সালে এমএ করা আবুল মাল আবদুল মুহিত।

১৯৫৪ সালে স্নাতক (সম্মান) এবং পরের বছর স্নাতকোত্তর শেষ করে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি) যোগ দেন মুহিত। পরের সিকি শতাব্দী পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। 

সরকারি চাকরিতে থাকাকালেই ১৯৫৭-৫৮ সালে তিনি অক্সফোর্ডে লেখপড়া করেন, ১৯৬৪ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএ ডিগ্রি পান।

১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সরকার মুহিতকে কূটনৈতিক দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিল ওয়াশিংটন দূতাবাসে। একাত্তরের জুন মাসে তিনি পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক-রাজনৈতিক মহলে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন।

স্বাধীনতার পর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে দায়িত্ব পালন করে সচিব হিসেবে ১৯৮১ সালে স্বেচ্ছা অবসরে যান মুহিত। এরপর ‘অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হিসেবে’ কাজ শুরু করেন ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও আইএফএডি-তে।

১৯৮২-৮৩ সালে তখনকার এইচ এম এরশাদ সরকারের সময়ে প্রথমবারের মত অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্বে আসেন মুহিত। তারপর দীর্ঘদিন বিশ্ব ব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে কাজ করার পর দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

দিন বদলের ইশতেহার নিয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য মুহিত পান অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। টানা দশ বছর সেই দায়িত্ব পালন করা মুহিত ২০১৮ সালে অবসরে যান।

বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে রেকর্ড সংখ্যক ১২টি জাতীয় বাজেট দিয়েছেন মুহিত; সমসংখ্যক বাজেট দিয়েছিলেন প্রয়াত এম সাইফুর রহমানও।

২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভার উত্তরসূরি আ হ ম মুস্তফা কামালের হাতে তুলে দেওয়ার দিনে মুহিত শুনিয়েছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র থেকে তার অর্থনীতির জটিল জগতে জড়িয়ে যাওয়ার গল্প।

“আমি সিভিল সার্ভিসে যোগ দিই ১৯৫৬ সালে। এরপর পাকিস্তান আমলে রেলওয়ে মন্ত্রণালয় হল, সেখানে আমার চাকরি হল। সেই চাকরির সুবাদে বাজেটের সঙ্গে আমার পরিচয়।

“রেলওয়ে বাজেটটা আমাদের প্রথম বানাতে হল ১৯৬২ সালে। সেই জন্য কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকার আমাদের কিছু ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করল। আমরা পিন্ডিতে গেলাম। কাজী আবদুর রহিম অর্থ মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি আর আমি, দুজন গেলাম পাকিস্তানে।

“সেই বছর আরেকটা নতুন জিনিস পাকিস্তানে সৃষ্টি হয়েছে যে এক্সপেনডিচারের মধ্যে নিউ এক্সপেনডিচার দুটি আইটেম করা হয়েছে। যতগুলো নিউ এক্সপেনন্ডিচার আসবে, সেটা সম্বন্ধে প্রজেকশন দিতে হবে যে ৩, ৪ বা ৫ কত বছর লাগবে? সেটার জন্য একটা বাজেটের ছক তৈরি করতে হবে।

“সেই কাজটায় সম্ভবত এম এম খান এবং গোলাম ইসহাক এই দুজন মূল্যবান অবদান রাখেন। এই আমার হাতে খড়ি হল ফাইন্যান্সের সাথে। তারপর এটা-সেটা কাজ করেছি, ফাইন্যান্সেও কাজ করেছি। বিশেষ করে প্ল্যানিংয়ে কাজ করেছি বেশ কয়েক বছর।”

মুহিতের ভাষায়, চাকরিজীবনে কর্মস্থল কম পরিবর্তন হওয়ার কারণে ‘একটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ’ হয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছিলেন।

“সিভিল সার্ভেন্ট হিসেবে প্রত্যেকের ক্যারিয়ার যদি দেখেন, দেখবেন প্রত্যেকের ২০/২৫টা করে পোস্টিং। আর আমার ক্যারিয়ারে দেখবেন ৩টা-৪টা পোস্টিং। এজন্য আমাকে ধন্যবাদ দিতে হবে তদানিন্তন যারা সিভিল সার্ভেন্টের উচ্চ পদে ছিলেন, তারা আমাকে একই লাইনে বহাল রাখেন। এরপর আমি প্ল্যানিং আর ফাইন্যান্সের বাইরে আর যাইনি।

“আমার সারাটা জীবনই, বাংলাদেশে তো এর বাইরে আর কাজ করি নাই। বিদেশে ছিলাম, সেখানে প্রধান কাজ ছিল প্ল্যানিং এবং ফাইন্যান্সের ওপরই। এটাতে একটা সুবিধাও হয়েছে, আমি শুধু অভিজ্ঞতা পাইনি, একইসঙ্গে অনেক জ্ঞানও অর্জন করতে পেরেছি।”

২০০১ সালে আমি অবসরের চিন্তা করেছিলেন মুহিত; কিন্তু পরে তা থেকে সরে আসেন তিনি। “তখন আমার মনে হল এটা অসময় চিন্তা। অনেক কিছুর স্বপ্ন দেখলাম এটা সেটা.. তার কোনো কিছুই অর্জন করা হয়নি। কিন্তু এখন আমার সেটা আর নেই।”

মুহিত অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময়টায় বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ধরনের অগ্রগতির পথে এগিয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা হওয়ার কারণেই সেটা সম্ভব হয়েছে বলে তিনি মনে করতেন।  

মুহিত সেদিন বলেছিলেন, “আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা বিশ্বের শীর্ষ ২০ অর্থনীতির দেশ হিসেবে জি টোয়েন্টিতে দাওয়াত পেয়ে অংশগ্রহণ করতে পারব বলে আমি আশাবাদী।”


x

সর্বশেষ সংবাদ