জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিবেশী (প্রথম পর্ব)

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী © ফাইল ফটো

প্রতিবেশীকে যে আত্মীয় হতে হবে এমন কোনাে কথা নেই। অনেক সময় আত্মীয় হয় না, হওয়া সম্ভবও নয়। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে প্রতিবেশী আত্মীয়ের চেয়েও কাছের খুবই কাছের, হয়তােবা পাশের বাড়িটিরই। প্রতিবেশীর সংখ্যা এখন কমে গেছে। জনসংখ্যার যে বৃদ্ধি, প্রতিবেশীর সংখ্যায় ততাে অবনতি, নিয়ম বােধকরি এটাই।

এখন আমাদের কজনেরই বা বাড়ি আছে, ভাড়া বাড়িতে থাকি, কে প্রতিবেশী খবর নেওয়ার সময় পাই না, বড়াে ব্যস্ত আমরা সবাই, বড়াে ব্যস্ত রাখা হয়েছে আমাদের। যে রাখছে আমরা তাকে দেখি না, সুতাে সেই অদৃশ্য শক্তিধরের হাতে। আগের দিনে হলে তাকে ঈশ্বর, ভাগ্য ইত্যাদি নামে ডাকা যেতাে, এখন যায় না। এখন আমরা অনেক কিছুই জানি, সেই জ্ঞান আনন্দ আনুক চাই না-আনুক।

আত্মীয়ের জন্য দরজা-জানালা খােলা থাকে ঘরের ও মনের। নিয়ম সেটাই। প্রতিবেশী তাে দেয়ালের ওপারের মানুষ। কিন্তু আত্মীয়ের সঙ্গে সব সময়ে দেখা হয়, নদীতে নদীতে সাক্ষাৎ ঘটে, তবু বানেতে বােনে ঘটে না, এ যেমন আগে সত্য ছিল, সত্য এখনাে। ‘ভাই ভাই ঠাই ঠাই’-এর বাস্তবতা যদি কমে থাকে তাহলে কমেছে শুধু এই অর্থে যে, ভাই অনেক আগেই আলাদা হয়ে গেছে ভাই থেকে, এখন বিবাহ ও মৃত্যুর অনুষ্ঠান ভিন্ন দেখাসাক্ষাৎই হয় না, সেখানেও সব ভাই যে সমানভাবে আসতে পারে তা নয়; অর্থনৈতিক দূরত্বটা কার্যকর থাকে।

৭২ সালে আমার লন্ডন প্রবাসী যে বন্ধু ঢাকায় ফিরে পুরোনো বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গিয়েছিল মহা উৎসাহ ও অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে সেই বন্ধুকেই নব্বহয়ের দশকে দেখেছি ঢাকায় এসে খুবই মনমরা। কারণ হচ্ছে এই যে, পুরনাে ঠিকানায় কাউকেই সে খুঁজে পায় নি। কে কোথায় গেছে কেউ বলতে পারে না। সে বন্ধু আজ আর বেঁচে নেই, আসবে না আর খোঁজ করতে। এলেও বড়ােই মর্মাহত হতাে।

আমার নিজের শৈশব ও কৈশোর ভাড়া বাসাতেই কেটেছে। এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে হয়েছে, কিন্তু যেখানেই গেছি খুব ভাল প্রতিবেশী পেয়েছি। বাসার জোগাড় আমার বাবাই করেছেন। কিন্তু প্রতিবেশী-প্রতিবেশী সম্পর্কটি গড়ে উঠেছে আমার মায়ের নীরব উদ্যোগ ও কর্মে।

কলকাতায় আমরা ছিলাম অল্প কিছুদিন, সেখানে আত্মীয়রা কেউ কেউ ছিলেন, কিন্তু ওই শহরে ভালাে প্রতিবেশী পাওয়ার তাে কথা নয়। তবু পাওয়া গেছে। পাশের বাড়িতে থাকতাে আধাবাঙালি কলকাতিয়া পরিবার, তাদের ছেড়ে ঢাকায় চলে আসতে আমার মায়ের খুব কষ্ট হয়েছিল। দোতলায় থাকতাে দু’টি পরিবার; উভয়ে পূর্ববঙ্গীয়। বেশ ছােট তখন আমি, হাফ প্যান্ট পরি, কিন্তু ওই পরিবারের একটির গৃহিণী ৫০ বছর পরে টেলিভিশনের এক অনুষ্ঠানে আমাকে দেখে তার মেয়ের কাছে, জন্ম যার কলকাতা ছাড়ার পরে, কৌতূহল প্রকাশ করেছেন যে এই আমি তার তখনকার প্রতিবেশীর সেই ছেলেটি কি না; আগ্রহ প্রকাশ করেছেন আমার পিতা-মাতার সঙ্গে সাক্ষাতের।

আমার বাবা ততােদিনে চলে গেছেন, মাতাও তেমন চলাফেরা করতে পারেন না, মহিলার নিজের স্বাস্থ্য ও অত্যন্ত খারাপ, তাঁর স্বামী পরলােকগত। সে দেখা সাক্ষাত আর সম্ভব হয় নি, কিন্তু আমি বড় আলােড়িত হয়েছিলাম পাশাপাশি বাসায় থাকার পুরােনাে স্মৃতিকে ধরে রাখবার ঘটনার কথা জেনে। কলকাতায় প্রতিবেশী ওই পরিবারটির সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বরঞ্চ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। যাদের সঙ্গে বেশি ছিল তারা তাে আত্মীয়ের মত হয়ে গিয়েছিল, বেশ যােগাযােগ ছিল ঢাকায় আসার পরেও।

ঢাকায় আমার কৈশোর ও যৌবনের প্রথমভাগ কেটেছে আজিমপুর কলোনি। সেখানে আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী যে পরিবার তারা এসেছিলেন পাটনা থেকে, উদ্বাস্তু হয়ে। সেটা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই-এর যুগ, কিন্তু ওই বিহারি প্রতিবেশীর সঙ্গে গভীর সহমর্মিতা স্থাপনে কোনাে বিলম্ব হয় নি। যতােদিন ওই কলােনিতে ছিলাম, ওইভাবে পাশাপাশি ছিলাম আমরা। ঝগড়া-কলহের প্রশ্নই ওঠে নি।

রিজভী সাহেব অফিসের পরে হােমিওপ্যাথি চিকিৎসা করতেন, ওই বাসাতেই দরজার ওপরে ইংরেজিতে সুন্দর একটা সাইনবাের্ড ছিল, আই এইচ রিজভী, হােমিওপ্যাথ; তাঁর নিয়মিত রােগীদের একজন ছিলেন আমার বাবা, যার ছিল গ্যাস্ট্রিকের রােগ। ওষুধ দিতেন, দাম নিতেন না, প্রশ্নই উঠতাে না নেয়ার।

রিজভী সাহেবের নাতনী ছিল আমার ছােট বােনের ঘনিষ্ঠতম বান্ধবী। বিকাল হলে আর কথা নেই, তীরের মতাে ছুটে বের হতাে দু’জনে, দেখা যেতাে চার বেণী দুলিয়ে তারা হাঁটছে আর কথা বলছে কলকল নদীর মতাে। চষে ফেলতে পাড়া। আমার মা ও রিজভী সাহেবের স্ত্রী পরস্পরের ভাষা তেমন বুঝতেন না।

কিন্তু মায়ের কারণেই প্রধানত গভীর সহমর্মিতা ছিল দুই প্রতিবেশীতে। খাবার দাবারের আদান-প্রদান চলতাে। বােধ করি সেটাই ছিল কথােপকথনের মূল ভাষা। বাকি যােগাযােগ নীরবে। এপার-ওপারের দরজা চারটি সবসময়েই বন্ধ থাকতাে, কিন্তু মনে হতাে সর্বদাই উন্মুক্ত।

আজিমপুরের সরকারি কলােনিতে প্রথম যখন আসি, আমার মা অত্যন্ত সন্তুষ্ট ছিলেন। এ কোথায় এলেন তিনি। মাটি নেই, ঘাস নেই, থাকতে হয় তিনতলার ওপরে। যেন জাহাজে চড়ে চলেছেন কোথাও, সেই যাত্রায় যার কোন অন্ত নেই। কিন্তু মা-রাই প্রতিবেশিত্ব স্থাপন করেন সবার আগে, অনেকটা প্রয়ােজনে, কিছুটা স্বাভাবিক প্রবণতায়। অল্পদিনেই অনেক প্রতিবেশী জুটে গিয়েছিল আমার মায়ের।

একটা বড়াে শুণ ছিল তাঁর। অন্যের কথা শুনতেন, নিজের কথা বলতেন খুব কম। প্রতিবেশীরা সবাই তাকে তাদের সুখ-দুঃখের, দুঃখেরই বেশি, কথা বলতে আসতেন, এসে হাল্কা করে যেতেন নিজেদের। এটাই বােধ করি প্রতিবেশী তার প্রতিবেশীর কাছ থেকে চায়, সর্বাগ্রে । আত্মার আত্মীয়ের চেয়ে হৃদয়ের বান্ধব কম প্রয়ােজনীয় নয়, বাস্তব জীবনে।

প্রতিবেশী মাত্রেই যে সজ্জন এমন কথা কেউ কখনাে শােনে নি, এই পৃথিবীতে। কেবল যে লবণ ও তেলের আদান-প্রদান ঘটে তা তাে নয়। প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর ঝগড়া-ফ্যাসাদ, মামলা-মোকদ্দমা, মারামারি-কাটাকাটি সবকিছুই হয়, হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আত্মীয়ের সঙ্গে আত্মীয়ের বিবাদ আরাে বিশ্রী, আরাে আত্মঘাতী হতে পারে, হয়ে থাকে।

বাইবেল যে বলছে, পৃথিবীতে প্রথম হত্যাকাণ্ডটি প্রতিবেশীদের মধ্যে নয় পরিবারের মধ্যেই ঘটে, বড়াে ভাই কেইন যখন হত্যা করে ছােট ভাই এবেলকে, সেটা অবিশ্বাস্য নয়। ভাইয়ের হাতে যত ভাই খুন হয়েছে, প্রতিবেশীর হাতে প্রতিবেশী হত্যা সে তুলনায় অবশ্যই সামান্য।

প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর সহানুভূতি থাকে; সেটাই বরঞ্চ ভালাে, ভালােবাসা না থাকলেও ক্ষতি নেই। ভালােবাসা বরঞ্চ বিপজ্জনক হতে পারে, কেননা আশঙ্কা থাকে ভালোবাসা ওই অনুভূতি জন্ম দেবে ঘৃণার। প্রতিবেশী প্রতিবেশীকে সাহায্য করবে, বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে এসে দাঁড়াবে, অংশ নেবে সুখেরও। অর্থাৎ সম্পর্কটি হবে বন্ধুত্বের।

আমরা প্রেমের কথা অনেক শুনেছি এবং বলেছি: বন্ধুত্বের কথা সে তুলনায় কম বলাবলি করি। বন্ধুত্ব হচ্ছে শান্ত প্রবাহ, প্রেম প্রবল স্রোত, যে স্রোতে উত্থান যেমন আছে, তেমনই থাকে পতনও। দুটোই দরকার, শান্ত প্রবাহ চাই, প্রবল স্রোতও চাই, শান্ত প্রবাহই বরঞ্চ অধিক জরুরী। প্রতিবেশী আমাদের প্রবহমান বন্ধু, তাকে ছাড়া জীবন চলবে কি করে?

[বাংলাদেশের প্রবন্ধ ২০২০ থেকে: জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিবেশী- প্রথম পর্ব

টাইমস হায়ারের সাবজেক্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে…
  • ২১ জানুয়ারি ২০২৬
ময়মনসিংহের ১১টি সংসদীয় আসনের প্রতীক বরাদ্দ 
  • ২১ জানুয়ারি ২০২৬
নিরাপদ জীবনের গণ্ডি ছাড়িয়ে অর্থপূর্ণ হওয়ার আহ্বান শহিদুল আল…
  • ২১ জানুয়ারি ২০২৬
প্রাথমিকের পরীক্ষায় ডিভাইস জালিয়াতি চেষ্টায় দুই শতাধিক বহি…
  • ২১ জানুয়ারি ২০২৬
ঝিনাইদহে ৪ আসনে প্রতীক পেলেন ২১ জন
  • ২১ জানুয়ারি ২০২৬
ইমাম-মুয়াজ্জিনদের গ্রেড ও বেতন নির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশ
  • ২১ জানুয়ারি ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SPRING 2026
Application Deadline Wednesday, 21 January, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9