সচেতনতায় এক চুলও ছাড় নয়

সচেতনতা
সচেতনতায় এক চুলও ছাড় নয়  © সংগৃহীত

বাংলাদেশে প্রায় দেড় বছর পর শ্রেণিকক্ষের জংধরা তালা খোলার মাধ্যমে মৃতপ্রায় শিক্ষাঙ্গন শিক্ষার্থীদের বিচরণে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার শুভ সংবাদ যাতে দুঃসংবাদ বয়ে না আনে সেজন্য আমাদের সর্বোচ্চ সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস এন্ড চিলড্রেনস হসপিটাল অ্যাসোসিয়েশনের একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, স্কুল খোলার এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় আড়াই লক্ষ শিশুর কোভিড ১৯ পজিটিভ ফলাফল এসেছে। এ পরিসংখ্যানটি বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও একটি আগাম সতর্কবার্তা। আমাদের দেশে যাতে শতকরা ১ ভাগও অপ্রত্যাশিত কিছু না হয় সেজন্য শতভাগ সাবধান থাকতে হবে। কথায় আছে সাবধানের মার নেই। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার জন্য প্রণীত গুরুত্বপূর্ণ নিয়মকানুন আমরা সবাই জানি। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে নিয়ম কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সে নিয়ম কতজন মানছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার জন্য যে নিয়ম ই তৈরি করা হোক সেগুলো যাতে শিক্ষার্থীরা মেনে চলে সেজন্য কার্যকর পন্থা অবলম্বন করাই আমার আলোচ্য বিষয়। বাড়ন্ত বয়সের দূরন্ত ছেলে মেয়েরা নিয়ম মানতে চাইবে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শিক্ষক, অভিভাবক এবং সরকারের দায়িত্ব তাদের নিয়ম মানতে অনুপ্রাণিত করা। বন্ধুদের সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে দুষ্টামি করা ছেলেটা কেন একাকি এক বেঞ্চে বসে ক্লাস করবে সে বিষয়টা তাকে বুঝাতে হবে নাহয় তার মঙ্গলের জন্য প্রণয়ন করা নিয়ম তার কাছে এক প্রকার শাস্তি মনে হতে পারে।

সংকীর্ণ অবকাঠামো এবং অত্যধিক শিক্ষার্থীর কারণে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা খুবই কঠিন। তাছাড়া, দীর্ঘ দিন পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললে শিক্ষার্থীরা বন্ধুদের সাথে হৈ-হুল্লোর এবং বাঁধ ভাঙা আনন্দে মেতে ওঠবে। এমতাবস্থায় স্বাস্থ্য বিধি বজায় রাখা আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে তবুও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য আমাদেরকে সে চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করতে হবে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীদের সচেতন করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করলেও সেটা কার্যকর হবে বড়জোর অর্ধেক কিন্তু দুই দিক থেকে অর্থাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষকরা এবং বাড়ি থেকে বাবা মা যদি তাদেরকে সচেতন করার চেষ্টা করে তাহলে তাদের মাঝে পুরোপুরি সচেতনতা সৃষ্টি করা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি।

একটি উদাহরণের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি স্পষ্ট করা যাক। একজন শিক্ষার্থীর মাস্ক ব্যবহার করা প্রথম ও প্রধান সচেতনতা আর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করা শিক্ষকের দায়িত্ব। কিন্তু শিক্ষার্থীর ব্যবহৃত মাস্কটি যদি অনেক দিনের পুরাতন হয় তার জন্যও কি শিক্ষক দায়ী? নিশ্চই না, এজন্য পরিবার দায়ী। একজন শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন নতুন মাস্ক দেওয়া এবং ইউনিফর্ম পরিষ্কার রাখা এ বিষয়গুলো পারিবারিক সচেতনতার অন্তর্ভুক্ত।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা যাদের বাবা মা শিক্ষিত না এবং করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে নিজেরাই সচেতন না তারা কিভাবে সন্তানকে সচেতন করবেন? এ প্রশ্নে আমার উত্তর হলো সরকারি উদ্যোগে গঠিত কোনো টিম কিংবা বিভিন্ন এনজিও এক্ষেত্রে বাবা মা এবং সন্তানদের নিয়ে গ্রাম, মহল্লায় বিশেষ সচেতনতা ক্যাম্প করতে পারেন। এতে বাবা মা সচেতন হবেন একই সাথে শিক্ষার্থীদের মাঝেও আরো বেশি সচেতনতা সৃষ্টি হবে। বিশেষত, যাদের প্রতিদিন ক্লাস হবে তাদের অন্তত প্রতি সপ্তাহে একদিন বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্য কর্মীর মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো জরুরি এবং তাদের দীর্ঘদিনের মানসিক অস্থিরতা যাতে দ্রুত কাটে সেজন্য স্বাস্থ্য বিধি মেনে চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষার্থীরা যারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ক্লাস করতে পারছেনা তাদের জন্য বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সর্বশেষ আমাদের একটি বড় সমস্যার কথা উল্লেখ করছি সেটি হলো আমরা প্রথম প্রথম সব কিছুতেই অত্যন্ত যত্নশীল ও সচেতন থাকি কিন্তু কিছুদিন গেলেই আমাদের মাঝে খামখেয়ালি শুরু হয়ে যায়। আমাদের মনে রাখতে হবে এবারের বিষয়টি জাতির ভবিষ্যত নিয়ে। স্কুল কলেজে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বয়স সাধারণত ১৮ এর নিচেই থাকে অর্থাৎ তারা এখনো ভ্যাকসিন নেয়নি। তাই তাদের নিয়ে সৃষ্ট শঙ্কায় আপাতত সচেতনতাই একমাত্র সমাধান। শিক্ষক, অভিভাবক ও সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সুরক্ষিত রাখতে পারব এমনটাই প্রত্যাশা।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ