লেখক ও তার স্ত্রী © সংগৃহীত
ঈদ মানেই আনন্দ, মিলন আর ঘরে ফেরার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সেই আনন্দের সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালনা। সড়কে এখন যেন গতি আর ঝুঁকির প্রতিযোগিতা চলছে; কে কত দ্রুত যাবে, কে কতটা দুঃসাহস দেখাতে পারবে এটাই যেন হয়ে উঠেছে এক অঘোষিত প্রবণতা।
প্রশ্ন হলো এই উচ্ছ্বাস কি সত্যিই আনন্দের, নাকি এক ধরনের অন্ধ আবেগ, যা সচেতনতার লাগাম ছিঁড়ে ফেলছে? বাড়ি ফেরার তাড়না, বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি কিংবা মুহূর্তটাকে ‘উপভোগ’ করার নামে অনেকেই ভুলে যাচ্ছেন সড়ক কোনো খেলাঘর নয়। এখানে একটি ভুল মানেই শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ থমকে যাওয়া।
গতি যখন বিপদের পূর্বাভাস:
ঈদ ঘনিয়ে এলে শহর থেকে গ্রাম সব পথেই বাড়ে মানুষের চাপ। বাস-ট্রেনের সীমাবদ্ধতার কারণে মোটরসাইকেল হয়ে ওঠে সহজ বিকল্প। কিন্তু এই ‘সহজ’ পথই অনেক সময় হয়ে ওঠে সবচেয়ে বিপজ্জনক।
মহাসড়কে ভারী যানবাহনের ফাঁক গলে এগিয়ে যাওয়া, হঠাৎ লেন পরিবর্তন, অতি দ্রুতগতিতে চালানো এসব যেন এক ধরনের স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়েছে। অনেক চালক মনে করেন, ছোট বাহন বলে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা নির্মম—একটি গর্ত, একমুঠো বালু বা একটি হঠাৎ ব্রেকই যথেষ্ট সবকিছু শেষ করে দেওয়ার জন্য।
ঈদের সময় সড়কে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আর সেই চাপের ভেতরেই অসতর্কতার ঝুঁকি হয়ে ওঠে বহুগুণ মারাত্মক।
গ্রাম থেকে শহর একই চিত্র:
শুধু মহাসড়ক নয়, গ্রামাঞ্চলের সড়কগুলোতেও দেখা যায় একই অবস্থা। দুই আসনের মোটরসাইকেলে তিন-চারজন আরোহী, কারো মাথায় হেলমেট নেই, চালকের সামনে বসে আছে শিশু এসব দৃশ্য এখন প্রায় স্বাভাবিক।
কিন্তু এই “স্বাভাবিকতা”ই সবচেয়ে বড় অস্বাভাবিকতা। একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই ভেঙে দিতে পারে একটি পরিবারের সব স্বপ্ন। কোনো মা হারায় তার সন্তানকে, কোনো শিশু হারায় তার বাবার স্নেহ। আনন্দের দিনে হঠাৎ নেমে আসে শোকের দীর্ঘ ছায়া, যেখানে হাসির শব্দ ডুবে যায় কান্নার ভারে।
উচ্ছ্বাস নাকি আত্মঘাতী প্রবণতা?
ঈদের দিন বিকেলে তরুণদের মোটরসাইকেল স্টান্ট, রেসিং কিংবা দলবেঁধে বেপরোয়া চলাচল এখন নতুন এক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “ভাইরাল” হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেককে ঠেলে দিচ্ছে ঝুঁকির মুখে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সড়ক কোনো প্রদর্শনীর মঞ্চ নয়। এটি দায়িত্ববোধ, সংযম এবং জীবনের নিরাপত্তার জায়গা। একজনের ভুল শুধু তার নিজের ক্ষতি করে না; এটি অন্যের জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে।
সচেতনতার বিকল্প নেই:
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বড় কোনো জটিল সমাধান দরকার নেই দরকার শুধু কিছু মৌলিক সচেতনতা। মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার, নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেক এড়িয়ে চলা, ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি না চালানো এই সাধারণ নিয়মগুলোই বাঁচাতে পারে অসংখ্য জীবন। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো আমরা নিয়ম জানি, কিন্তু মানতে চাই না। আর এই অবহেলাই একসময় আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গন্তব্য নয়, জীবন আগে:
ঈদ মানে প্রিয়জনের কাছে ফেরা। কিন্তু সেই ফেরাটাই যদি না হয়, তাহলে উৎসবের সব আনন্দই অর্থহীন।একটু ধৈর্য, একটু দায়িত্ববোধ, আর সামান্য সচেতনতা এই তিনটিই পারে অসংখ্য দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে। মনে রাখতে হবে। জীবনের চেয়ে দ্রুত কোনো গন্তব্য নেই। কারণ শেষ পর্যন্ত, নিরাপদে ফিরে আসাই ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক