নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের ভাবনায় যা যা রয়েছে 

০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:২৬ PM , আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:২৮ PM
নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের ভাবনা 

নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের ভাবনা  © টিডিসি ফটো

আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দেশের প্রতিটি গ্রাম-শহর, অলি-গলি, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডায় উত্তেজনায় ভরা। কিন্তু এর মধ্যেই শিক্ষার্থীরা ভাবছে ভিন্ন কিছু। তাদের কাছে নির্বাচন কেবল একজন প্রার্থীকে জয়ী করা নয়; বরং আগামী পাঁচ বছরে কেমন দেশ, কেমন শিক্ষার পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকবে, সেটাই মূল প্রশ্ন। শিক্ষার্থীরা আশা করে এমন নেতৃত্ব আসবে, যারা শিক্ষাকে স্লোগান নয়, বাস্তব উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে দেখবেন। নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের ভাবনা তুলে ধরছেন শেরপুর জেলা প্রতিনিধি আরফান আলী-


নির্বাচন আমার ভবিষ্যতের প্রশ্ন
আমি একজন শিক্ষার্থী। তাই নির্বাচন আমার কাছে কেবল একটি রাজনৈতিক আয়োজন নয়; এটি আমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। আজ যাঁরা নির্বাচিত হবেন, তাঁদের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে আমাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং একটি নিরাপদ জীবনের পথ।

একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার প্রথম ও প্রধান প্রত্যাশা—একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। কারণ ভোটের ওপর আস্থা না থাকলে রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর আস্থাও টেকে না। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, আর সেই ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ।

আমরা এমন নেতৃত্ব চাই, যারা শিক্ষাকে স্লোগান হিসেবে নয়, বরং বাস্তব উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে দেখবে। পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা আজ আমাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা। ডিগ্রি হাতে নিয়েও যখন চাকরির নিশ্চয়তা থাকে না, তখন হতাশা তৈরি হয়। তাই আমরা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয়, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পরিকল্পনা দেখতে চাই।

শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ নিয়েও আমাদের প্রত্যাশা কম নয়। ক্যাম্পাস হোক জ্ঞানচর্চা, মুক্ত চিন্তা ও সৃজনশীলতার জায়গা। সহিংসতা, দখলদারিত্ব কিংবা ভয়ভীতির সংস্কৃতি শিক্ষার পরিবেশকে ধ্বংস করে দেয়। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি চাই নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও শিক্ষাবান্ধব ক্যাম্পাস।

এবারের নির্বাচনে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। আমরা দেখেছি পোস্টারবিহীন নির্বাচন। পোস্টার ছাড়াও যে নির্বাচন করা যায়, তা আগে ভাবতেও পারিনি। পোস্টারের যন্ত্রণা না থাকায় স্বস্তি মিলছে। এই পরিবর্তন আমাদের মনে নতুন করে আশা জাগিয়েছে—যে পরিবর্তন সম্ভব, যদি সদিচ্ছা থাকে। আমার কাছে নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়া নয়; এটি আমার স্বপ্ন, সম্ভাবনা এবং আগামীর বাংলাদেশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

গুলফাম শেখ রুবেল
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
শেরপুর সরকারি কলেজ

নির্বাচন মানে প্রকৃতপক্ষে নেতা নির্বাচন
নির্বাচন শব্দটি আমাদের কাছে আর গৎবাঁধা নয়। শিক্ষার্থীদের মননে এর একটি নতুন অর্থ আছে। নির্বাচন মানে বেছে নেওয়া—ভালো ও মন্দের পার্থক্য করা। ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ ও ন্যায়পরায়ণ দেশপ্রেমিককে আলাদা করে দেখা একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা প্রতিবারই সেই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছি। যার প্রমাণ মেলে অসংখ্য সাবেক সংসদ সদস্যের দুর্নীতি, লুটপাট ও মানিলন্ডারিংয়ের ঘটনায়। যদিও বিগত সময়ে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি, তবুও আমাদের বিবেকের রশিতে খুব একটা টান লাগেনি—আমরা প্রতিবাদ করিনি।

এবার একটি যুগসন্ধিক্ষণ তৈরি হয়েছে। দেশের মানুষ ব্যাপক প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। আর এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়বদ্ধ আমরা শিক্ষার্থীরা—যারা জাতির মেরুদণ্ডের ধারক ও বাহক। আমরা স্বপ্ন দেখি, আমাদের বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। আমরা চাই একটি সুন্দর রাষ্ট্র, আর সুন্দর রাষ্ট্র গড়তে হলে প্রয়োজন সুশাসন।
সুশাসনের ভিত্তি গড়ে ওঠে সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের মাধ্যমে। সেই নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। যিনি দেশের ও দশের উন্নয়ন করবেন, তাকেই জাতীয় সংসদে পাঠাতে হবে। যদি আমরা বেছে নিতে ভুল করি, তাহলে তার দায়ভার আমাদেরই। নিদ্রিত বিবেককে আগামী প্রজন্ম কোনো দিন ক্ষমা করবে না।

তাই এখনই সময় জেগে ওঠার। একই সঙ্গে জনগণকল্যাণমুখী নেতাকে জাতীয় সংসদে পাঠানোর সমস্ত উদ্যোগ গ্রহণ করার। আমাদের দেখিয়ে দিতে হবে—নির্বাচন মানে অন্ধ ভোট নয়, নির্বাচন মানে স্বৈরাচার নয়; নির্বাচন মানে প্রকৃত অর্থেই নেতা নির্বাচন।

শোয়াইব আল হাসান
শিক্ষার্থী
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ,
শেরপুর সরকারি কলেজ

সুস্থ নির্বাচন, সুন্দর দেশ
একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, এবারের নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পেশিশক্তি বা বংশপরিচয়ের চেয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতা, নৈতিকতা এবং মেধাকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত তথাকথিত “পলিটিক্যাল ক্যাডার” কালচার থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষিত ও জনবান্ধব প্রতিনিধি বাছাই করা।

জুলাই বিপ্লবের সময় শিক্ষার্থীরা যে “রাষ্ট্র সংস্কারের” স্বপ্ন দেখেছিল, তা যেন নির্বাচনের পর হারিয়ে না যায়। আমার মতে, নির্বাচন কেবল একটি ভোটের দিন নয়; বরং এটি এমন একটি প্রক্রিয়া হওয়া উচিত যা বিচার বিভাগ, প্রশাসন এবং পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখবে। পরিশেষে আমার একটাই চাওয়া—“একটা সুস্থ নির্বাচন, একটা সুন্দর দেশ।”

আব্দুস সালাম
শিক্ষার্থী
গণিত বিভাগ
শেরপুর সরকারি কলেজ

নির্বাচন আমার কাছে শুধু রাজনীতি নয়
একজন শিক্ষার্থী হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। আমি বিশ্বাস করি, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই এমন নেতৃত্ব আসবে, যারা শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক ও সময়োপযোগী করে গড়ে তুলবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপকরণ, বই, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সুবিধা যেন সহজেই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যায়—এটাই আমার প্রত্যাশা।

আমি চাই, ভবিষ্যতের নেতৃত্ব কোচিং-নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সৃজনশীলতা, চিন্তাশক্তি ও ব্যক্তিনির্ভর শেখার পরিবেশ তৈরি করবে। মুখস্থবিদ্যার বদলে গবেষণা, বিশ্লেষণ এবং বাস্তবভিত্তিক জ্ঞানের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। আধুনিক কারিকুলাম, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করাই হওয়া উচিত আগামীর লক্ষ্য।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আমার মতো শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এই শিক্ষা ব্যবস্থা ভবিষ্যতে কতটা প্রসার ঘটাতে পারবে, কতটা আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে পারবে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। আমি চাই একটি স্থিতিশীল ও উন্নয়নমুখী পরিবেশ, যেখানে নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করা যাবে, গবেষণায় মনোযোগ দেওয়া যাবে, উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস পাওয়া যাবে এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পথ সুগম হবে।

শিক্ষাক্ষেত্রের উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা একটি স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। আমি বিশ্বাস করি, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে এবং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে।

আমার কাছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়—এটি আমার স্বপ্ন, সম্ভাবনা এবং দেশের আগামীর শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

এস এম মিনাল
শিক্ষার্থী, শেরপুর সরকারি কলেজ

নির্বাচন মানে আমাদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা
নির্বাচন মানেই আমাদের চারপাশে এক অদ্ভুত উত্তেজনা। মাইকের আওয়াজে শহর-গ্রাম মুখর থাকলেও আমরা শিক্ষার্থীরা একটু ভিন্নভাবে ভাবছি। আমাদের কাছে নির্বাচন মানে শুধু একজন প্রার্থীকে জয়ী করা নয়, বরং আগামী পাঁচ বছর আমরা কেমন পরিবেশে বেড়ে উঠবো, সেই নিশ্চয়তা পাওয়া।

সত্যি বলতে, একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়। আমরা এমন একটি দেশ চাই যেখানে ক্লাসরুম থেকে বের হওয়ার পর আমাদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন হবে, এবং চাকরির পেছনে বছরের পর বছর হন্যে হয়ে ঘুরতে হবে না।

আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আমরা সবাই অনেক সচেতন। প্রার্থীরা যখন বড় বড় প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছোড়ে, আমরা তখন মনে মনে হিসাব করি—এর বাস্তবায়ন কতটুকু সম্ভব। তরুণ প্রজন্ম এখন আর কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে বিশ্বাসী নয়।

আমরা চাই পড়ার টেবিলে শান্তি, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা, আর ভবিষ্যতে সম্মানজনক কর্মসংস্থান। আমরা এমন নেতা চাই, যিনি ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জগুলো বুঝবেন এবং আমাদের দক্ষতাকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখবেন।

নির্বাচন এলে অনেক সময় অস্থিরতা বাড়ে, যা আমাদের পড়াশোনার ওপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা হলো—রাজনীতি যেন শিক্ষার পরিবেশকে নষ্ট না করে, বরং আরও সমৃদ্ধ করে।

একজন প্রথমবার ভোটার হওয়া শিক্ষার্থীর কাছে একটি ‘সিল’ কেবল ভোট নয়, বরং তার সুন্দর ভবিষ্যতের প্রতি এক বিশাল ভরসা। আমরা চাই আমাদের ভোট এমন কাউকে নির্বাচিত করুক, যিনি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেবেন এবং তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গড়বেন। দিনশেষে আমরা কেবল একটা সুন্দর ভোট উৎসব চাই না, বরং একটি কার্যকর পরিবর্তন চাই।

রাশেদুল ইসলাম বরাত
শিক্ষার্থী, শেরপুর সরকারি কলেজ

শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন রাজধানীর এক প্রার্থী
  • ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মেস থেকে জবি শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
  • ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পটুয়াখালীতে গর্ভবতী জামায়াত নেত্রীর পেটে লাথি, প্রতিবাদ কেন…
  • ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
যবিপ্রবিতে নিয়োগ বন্ধের ষড়যন্ত্র, মন্ত্রণালয়-ইউজিসিতে ‌‘উড়ো…
  • ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রশাসন ক্যাডারে প্রথম জগন্নাথের গুলজার
  • ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
উত্তাপ তুঙ্গে, শেষ মুহূর্তের লড়াই দুই প্রার্থীর মধ্যে
  • ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬