ঢাবি ক্যাম্পাসে হকার দেখলে আমাদের ‘অহমে আঘাত’ লাগে কেন?

২৭ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:০৩ PM
রাজু নূরুল

রাজু নূরুল © টিডিসি সম্পাদিত

আপনি যখন টোকাই, ভবঘুরে বা উদ্বাস্তুদের ভেতর দিয়ে হেঁটে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে যান, যে সমস্যাটা তখন আপনার হয়, ওটার নাম অহম। আপনার অহমে আঘাত লাগে। যে অহম দেখানোর জন্য আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো লাগানো হুডি পড়ে ঘুরে বেড়ান। আপনার বাস যানজটে পড়লে লাফ দিয়ে বাস থেকে নেমে রিকশাওয়ালা পথচারীকে পিটানো যায়, কারণ তারা তো আর আপনার মতো ‘চান্স পেয়ে দেখা’তে পারে নাই।

আপনি ভুলে গেছেন যে, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়টা এমন একটা শহরে যেখানে কমপক্ষে দুই কোটির বেশি মানুষ বসবাস করে। স্থান সংকুলান আর রাস্তার অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝখান দিয়ে মানুষকে চলাচল করতে হয়। আপনি নিজের গণ্ডি থেকে বের হয়ে দেখেন, সারা পৃথিবীই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের নিচ দিয়ে সরকারি রাস্তা রাখে, সেই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন লাখলাখ গাড়ি যাতায়াত করে। উন্নয়নশীল দেশে তো করেই, কারণ এসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয় চলেই মানুষের টাকায়। বিশ্ববিদ্যালয় বানানোই হয়েছিল পড়াশোনা ও উন্নততর গবেষণা করে সেই দেশের মানুষের ভাগ্য পাল্টানোর জন্য!

আপনাকে এটাও মনে রাখা দরকার, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে যে রিকশা চালায়, যে ক্যান্টিন চালায়, হলের যে দোকানদার, যে ক্লিনার, আপনার মেসের বুয়া—তাদের সবার বাচ্চা-কাচ্চা, স্বামী-স্ত্রী-ই রাস্তার পাশে বাদাম বেচে, পিঠা বেচে, হকারি করে। মেসের বুয়া ছাড়া, হলের ক্যান্টিনে রান্না ছাড়া, রাস্তায় রিকশা ছাড়া আপনি একবেলা চলতে পারবেন? না পারলে রাস্তার হকারকে আপনাকে মেনে নিতে হবে! শুনতে রূঢ় লাগলেও এটাই বাস্তবতা!

ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারি মিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অন্তত ৬০–৭০ হাজার মানুষের পরিবার। এই পৌনে এক লাখ মানুষকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকে আরও কয়েক লক্ষ মানুষ। তাদের মধ্যে হকার আছে, উদ্বাস্তু আছে, পাগল আছে, ভবঘুরে আছে, কুকুর-বেড়াল আছে। এটা একটা ইকোসিস্টেম। দুনিয়া এভাবেই চলে। এসব মানুষ, এসব কুকুর-বেড়াল-কাঠবিড়ালি জানে, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা তাদের জন্য নিরাপদ। এখানে কেউ তাদের ডিস্টার্ব করবে না। কেউ তাদের দিকে ঢিল ছুঁড়বে না। সেই জন্য পল্টনের কুকুর আর টিএসসির কুকুরের শরীরের ভাষা আলাদা!

আমাদের আম্মারা উঠানে ধান শুকাতে দিলে হাঁস-মুরগী তাড়ানোর জন্য লাঠি নিয়ে বসে থাকে। কিন্তু পাশের বাড়ির কবুতর, গাছের অজানা পাখি তাড়ায় না। আমরা যদি তাড়াতে যেতাম, উল্টা বলতো, আহারে! খাক না। পাখিরও হক আছে। গাছের উপরের দিকের কাঁঠালটা পাড়ে না—ওইটা কাঠবিড়ালি খাবে। ধান কাটার সিজনে আপনার আশেপাশের পশু-পাখিদের দিকে খেয়াল করে দেখেছেন কখনো? গ্রামের কৃষকের মুখে প্যান। স্যান্ডু গেঞ্জি পরা কৃষকের তেলতেলে শরীর, ঠেসে বেরিয়ে আসা শিশুর পেট, পরিপুষ্ট পাখি, কাঁচা খড় খেয়ে ক্লান্ত গরু—মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কৃষকের ফলানো ধান খেয়ে সবাই খুশি। এই হলো ইকোসিস্টেম! আমাদের মতো একটা দেশ এভাবেই চলে! আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এমন।

আপনি তো আবার এখন নতুন বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর—জুলাই যোদ্ধা! আপনার সিলেবাসে তো আবার কুকুর হারাম, বিড়াল হারাম, লম্বা চুল হারাম, হিজাব না থাকলে নারী হারাম, রাস্তার পাশের ভবঘুরে হারাম কারণ সে গাঁজাখোর, ফলে তাদের লাঠি-ওষ্ঠা মারাও হালাল। কথায় আছে, ‘ছাগল স্বাধীনতা পেলে প্রথমেই আশেপাশের চারাগাছ খেয়ে ফেলে!’

টোকাইয়ের পেটে লাথি মারার আগে, রাস্তার পাশে স্যান্ডেল বেচা কারো দিকে জুতা ছুঁড়ে মারার আগে মনে রাখবেন, যে জুলাই আপনাদেরকে ছাত্রলীগের লুঙ্গির তলার গুপ্ত অবস্থায় থেকে বের করে শিবিরের নেতা বানিয়েছে, সে জুলাইয়েই পথশিশু মারা গেছে ১৬৮ জন, যার পেটে এখন লাথি মারছেন; সেই শ্রমিক মারা গেছে ২৮৪ জন; ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মারা গেছে ১২০ জন। তাদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে আপনি এখন শিবির করছেন। সেই অভ্যুত্থানে আপনাদের ঢাবির কোনো একজনও মারা যায়নি। বরং ওইসব মানুষের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে আপনারা ভবঘুরে তোফাজ্জলকে দুইটা ভাত ভিক্ষা দিয়ে নৃশংসভাবে মেরেছেন।

ঢাবির বাইরের পৃথিবী আপনি দেখেননি এই কথা মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে, শুধু বাংলাদেশ নয়; পৃথিবীর যেকোনো বড় শহরের ইউনিভার্সিটিতে গেলে দেখবেন, সারা শহরের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ভবঘুরে ও উদ্বাস্তুদের সংখ্যা বেশী। এর কারণ আমার জানা নেই; সম্ভবত এরা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরাপদ বোধ করে? সম্ভবত খুব সহজে সামান্য খাবার জুটে যায়?

করোনার সময় আমি উদ্বাস্তু মানুষদের জন্য একটা ফান্ড গঠন করছিলাম। প্রায় পনেরো লাখ টাকা সেই ফান্ডে জমা হলো। তার সঙ্গে আলাদা আরেকটা ফান্ড গঠন করে জাহাঙ্গীরনগরের কুকর-বিড়ালদের জন্য খাবারের বন্দোবস্ত করেছিলাম। হল বন্ধ, ছেলে-মেয়েরা সব বাড়ি চলে গেছে। এখন এসব কুকুর-বেড়াল খাবার পাবে কোথা থেকে? জাবির একটা সংগঠন একদিন অন্তর অন্তর খিচুড়ি রান্না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পয়েন্টে দিয়ে আসতো!

সবাইকে এসব ভাবতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। আপনি তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেই আসছেন নিজেকে গাঁজাখোর, টোকাই, ভবঘুরে থেকে আলাদা করতে, নিজেকে জাতে তুলতে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঘুরে বেড়ানো উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন করাও আপনার দায়িত্ব না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়েরও দায়িত্ব না—এই দাবিও আমি মানি! কিন্তু এসব মানুষের পুনর্বাসনের প্রয়োজন আছে, তাদের প্রতি মানবিক হওয়া দরকার; এটা আপনি যতক্ষণ না বুঝবেন, মনে রাখবেন, আপনার ইউনিভার্সিটি আপনাকে কিছুই শেখায়নি।

আপনি তো ডাকসুর দায়িত্ব এক বছরের জন্য পেয়েছেন। দেখতে দেখতে সেই এক বছর শেষও হয়ে যাবে। একদিন এই আপনার হেডম ভাঁজ দেখানো ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে বের হয়ে যাবেন। বছর কয়েক বাদে যখন সেই একই ইউনিভার্সিটিতে ঘুরতে যাবেন, দেখবেন সেই উদ্বাস্তু লোকটা বস্তা মুড়ে চারুকলার সামনের রাস্তার একপাশে ঘুমাচ্ছে। বাদাম বিক্রি করা ছোট্ট আল-আমিন এখন রাস্তার পাশে পাকোড়া বেচে, আরেক তোফাজ্জল লুঙ্গি পড়ে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। যখন দেখবেন আপনার সেই হেডম দেখানো ক্যাম্পাসে আপনাকে আর কেউ চিনে না, তখন নিজেকে এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উদ্বাস্তু মনে হবে। আপনার সেই উদ্বাস্তু মনকে যদি সামান্য আন্দোলিত করতে পারে, সেটা হবে ওই চা দোকানদার আল-আমিন যখন আপনাকে ডেকে জিজ্ঞেস করবে, ‘আরে সর্বমিত্র মামা না? ভালো আছেন? চা খাবেন?’

রাজু নূরুল: লেখক, অনুবাদক, গবেষক
যোগাযোগ: raju_norul@yahoo.com 


জামায়াতের আরও এক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল
  • ০৪ জানুয়ারি ২০২৬
ঢাবির ব্যবসায় ইউনিটের ফল প্রকাশ, দেখুন এখানে
  • ০৪ জানুয়ারি ২০২৬
ঢাবির ব্যবসায় ইউনিটের ফল প্রকাশ, ৯০ শতাংশই ফেল
  • ০৪ জানুয়ারি ২০২৬
দুয়েকদিনের মধ্যে বিএনপির চেয়ারম্যান হচ্ছেন তারেক রহমান: মির…
  • ০৪ জানুয়ারি ২০২৬
প্রতি রিফ্রেশেই ফলোয়ার হারাচ্ছে কলকাতা
  • ০৪ জানুয়ারি ২০২৬
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন বিভাগে নেবে শিক্ষক, পদ ২৩, আবে…
  • ০৪ জানুয়ারি ২০২৬