মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান: দেশপ্রেম, বীরত্ব ও সাহসিকতার অনন্য উদাহরণ 

০৬ আগস্ট ২০২৫, ০৮:২৯ PM , আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২৫, ০৮:৫৪ AM
রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহাবুব আলী খান

রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহাবুব আলী খান © টিডিসি সম্পাদিত

যুগে যুগে মহৎ কর্ম মানুষকে অমর করে রেখেছে। কাজের মাধ্যমে তাঁরা স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন। তেমনি সাহসিকতা, নির্ভীক দেশপ্রেম আর জনকল্যাণ মূলক কাজের জন্যই বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে আছেন প্রয়াত রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহাবুব আলী খান।
 
১৯৩৪ সালের ৩ নভেম্বর সিলেটের বিরাহিমপুরের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম হয় এক নক্ষত্রের। আহমেদ আলী খান ও জুবাইদা খানমের কোল আলোকিত করা মাহবুব আলী খান আমৃত্যু তার এই আলো ছড়িয়ে গেছেন। তাঁর শৈশবের বেশির ভাগ কাটে সিলেট এবং অবিভক্ত ভারতের প্রথম মুসলিম ব্যারিস্টার পিতার কর্মস্থল কলকাতায়। সেখানেই শুরু হয় তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন। পরবর্তীতে চলে আসেন ঢাকায়। ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। সারাজীবনে শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি কখনো দ্বিতীয় হননি। ১৯৫২ সালে ক্যাডেট হিসেবে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যের দরমাউথে রয়্যাল নেভাল কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেন। ১৯৬৩ সালে মাহবুব আলী খানকে ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথ বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করেন।
 
১৯৭১ সাল। মাহবুব আলী খান তখন কর্মস্থল করাচিতে। পাকিস্তানিরা তখন বাঙালি অফিসারদের অবিশ্বাস ও সন্দেহ করতে থাকে। মাহবুব আলী খান যখন দেশ মাতৃকার টানে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তাঁকে সপরিবার নজরবন্দী করা হয় ক্যান্টনমেন্টে। কিন্তু তিনি ব্যাকুল হয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য। সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। একদিন আসে পাকিস্তানি বাহিনীর আগলমুক্ত হওয়ার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সাজানো সংসারের সব কিছু ফেলে এক কাপড়ে চলে আসার সময় স্ত্রী আফসোস করলে তিনি প্রিয়তমা স্ত্রীকে বলেন, ‘আমি যে তোমাকে স্বাধীনতা দেব।’ এরপর প্রথম সুযোগ পেয়েই দেশের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। সঙ্গে নারী ও শিশুদের নিয়ে কখনো হেঁটে, কখনো খচ্চরের পিঠে চড়ে পৌঁছান আফগানিস্তান। সেখান থেকে ভারত হয়ে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ফিরে আসেন প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে।
 
দেশে ফিরেই বিধ্বস্ত দেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে চট্টগ্রামের মার্কেন্তাইল একাডেমিতে কমাড্যান্ট হিসেবে যোগ দেন মাহবুব আলী খান। ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলাদেশ নেভির অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ অব নেভাল স্টাফে উন্নীত হন। তিনি হন বাংলাদেশ নেভাল শিপ ‘ওমর ফারুকের’ ক্যাপ্টেন । তাঁর নেতৃতে বি এন এস ‘ওমর ফারুক’ আলজেরিয়া , যুগোস্লাভিয়া, মিসর, শ্রীলংকা, সৌদি আরবসহ পৃথিবীর বিভিন্ন নৌবন্দরে ভ্রমণ করে এবং বাংলাদেশের নৌশক্তিকে বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দেন। ১৭৭৯ সালে তিনি চিফ অব নেভাল স্টাফ হন। ১৯৮০ সালে রিয়ার অ্যাডমিরাল পদমর্যাদা লাভ করেন মাহবুব আলী খান।
 
নৌবাহিনীকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সমাজ কল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত থেকেছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে তিনি স্থাপন করেছেন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল। সমাজের অবহেলিত শিশুদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত ‘সুরভি’ মাহবুব আলী খানের অনুপ্রেরণায়ই গড়ে উঠেছে। স্ত্রী সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু ও বড় কন্যা শাহিনা খান জামান সুরভির মাধ্যমে ছিন্নমূল অসহায় শিশুদের সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করেছেন।
 
পারিবারিক জীবনে মাহবুব আলী খান ছিলেন খুবই সাধারণ। স্বামী হিসেবে তিনি ছিলেন খুবই বন্ধুপ্রতিম। পরিবারের প্রত্যেকের মতামতকে খুবই গুরুত্ত দিতেন। এমনকি ছোটদের মতামতকেও প্রাধান্য দিতেন। বড় ভাই ও বড় বোনের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ায় শাশুড়িকে খুবই সম্মান করতেন।
 
স্নেহময় বাবা মাহবুব আলী খান সন্তানদের নিয়মানুবর্তিতা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতেন সবচেয়ে বেশি। তিনি বিশ্বাস করতেন শিক্ষার পাশাপাশি নিয়ম মেনে চলা সুন্দর চরিত্র গঠনে সহায়তা করে। তাই সমাজকল্যাণে তাঁর কন্যাদের ছোটবেলা থেকেই উৎসাহিত করতেন তিনি। তিনি বলতেন, ‘বড় কিছু পাওয়া মানে অহংকারী না হওয়া’। বিনয় নম্রতা ছিল মাহবুব আলী খানের সবচেয়ে বড় গুণ। সন্তানদের সর্বদা বিনয়ী হওয়ার শিক্ষাই দিয়েছেন। ছোট-বড় সবার সঙ্গে সমানভাবে মিশার শিক্ষাও তিনি সন্তানদের দিয়েছেন।
 
নারী শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মাহবুব আলী খান। স্ত্রী সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুকে বিবাহর পরও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ জুগিয়েছেন । তাঁরই অনুপ্রেরণায় তিনি ফাইন আর্টসে পড়াশোনা শেষ করেন। শিল্প ও সংগীত অনুরাগী মাহবুব আলী খানের আগ্রহে তিনি শিখেছেন পিয়ানো বাদন। সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু একজন প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী হিসাবে আজও নিরলসভাবে শিল্পচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন।
 
খেলাধুলার প্রতি ছিল তাঁর প্রচণ্ড আসক্তি। তরুণ বয়সে খেলেছেন ফুটবল। টেনিস আর সুইমিঙের প্রতি তাঁর ছিল আলাদা টান। মাহবুব আলী খান ছিলেন হ্যান্ডবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সফল আয়োজক ছিলেন তিনি।
 
পড়াশোনার পাশাপাশি মাহবুব আলী খান তার মেয়ে শাহিনা খান জামান ও জুবাইদা রহমানকে সব সময় খেলাধুলা, সংগীতচর্চায় উৎসাহ দিয়েছেন। সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু স্বাধীনভাবে সমাজ কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন তাঁরই অনুপ্রেরণায়। সাংসারিক কাজের পাশাপাশি জাতীয় মহিলা সংস্থার প্রেসিডেন্ট, সুরভির প্রতিষ্ঠাতা ও নৌবাহিনীপ্রধানের স্ত্রী হিসেবে অনেক সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন। আর নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী মাহবুব আলী খান সব সময় তাঁর স্ত্রীকে পাশে থেকে অনুপ্রাণিত করেছেন । বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে প্রথম নারী অফিসার নিয়োগের ক্ষেত্রে রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের অবদান সবচেয়ে বেশি।
 
বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে আধুনিক করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মাহবুব আলী খানের অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের জলসীমা রক্ষা, তালপট্টি দ্বীপের দখল নিশ্চিত করা, বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূল জলদস্যুমুক্ত করার নেতৃত্বে ছিলেন রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ নৌবাহিনী একটি শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। এমনকি সেই সময় ভারতীয় নৌবাহিনীও বাংলাদেশের নৌসীমায় প্রবেশের সাহস পায়নি। 
 
১৯৮২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাহবুব আলী খান এবং মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালে ৬ আগস্ট সকালে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনা তদন্তে বিমানবন্দরে গেলে কর্তব্যরত অবস্থায় হৃদযন্ত্রের ব্যথা অনুভব করলে তাকে সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যান এই ক্ষণজন্মা পুরুষ।
 
বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, বাংলাদেশের গর্ব রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানকে তাঁর দেশপ্রেম, বীরত্ব, সাহসিকতা, জনকল্যাণমূলক কাজ ও মহানুভবতার জন্য বাংলাদেশের মানুষ সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করবে।
 
লেখক: যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সাংবাদিক

সদরঘাটে লঞ্চ সংঘর্ষ: ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
দেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কেমন হওয়া উচিত?
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ঈদযাত্রায় হতাহতের ঘটনায় শোক ও উদ্বেগ জামায়াত ইসলামীর
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
রাজধানীতে ১,৭৭১ ঈদ জামাত, জাতীয় ঈদগাহে বহু স্তরের নিরাপত্তা
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
আপন ভাই ও বোনকে জাকাত দেওয়া যাবে কী?
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
৭ মুসল্লি নিয়ে ঈদের নামাজ আদায়, এলাকায় চাঞ্চল্য
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence