‘বিশেষ মর্যাদা নয়, গুণমানের ভিত্তিতেই বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ হয়ে ওঠে’

০২ জুন ২০২৫, ০১:২০ PM , আপডেট: ০২ জুন ২০২৫, ০৯:১২ PM
ড. মোর্ত্তুজা আহমেদ

ড. মোর্ত্তুজা আহমেদ © টিডিসি সম্পাদিত

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক ‘বিশেষ মর্যাদা’ প্রদানের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন। দাবিটি প্রথমে আবেগঘন মনে হতে পারে, কারণ দেশের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে গভীরভাবে বিবেচনা করলে দেখা যাবে, এই দাবির পেছনে বেশ কিছু সমস্যা ও প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। বিশেষ মর্যাদা কি সত্যিই প্রয়োজন? তা কি অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবিচার নয়? আর বিশ্বের কোথাও কি সরকারের ‘বিশেষ মর্যাদা’ ঘোষণার মাধ্যমে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিই বিশেষ হয়ে উঠতে পারে?

প্রথমেই দেখতে হবে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা আসলে কিসে নিহিত। বিশ্বের যে কোনো প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়—হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ বা মেলবোর্ন—তাদের কোনো সরকারিভাবে দেওয়া ‘বিশেষ মর্যাদা’ নেই। তাদের মর্যাদা এসেছে গবেষণার মান, নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতা, সমাজের প্রয়োজন মেটানোর যোগ্যতা এবং সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের মাধ্যমে। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রমাণ করেছে—মর্যাদা বাইরে থেকে পাওয়া কোনো শংসাপত্র নয়, বরং ভেতর থেকে অর্জিত এক সোনার মুকুট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এই ‘বিশেষ মর্যাদা’ চেয়ে যে যুক্তি তুলেছেন, সেটি ঐতিহাসিক অবদান ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কথা বলে। নিঃসন্দেহে, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা গৌরবময়। কিন্তু শুধু অতীতের অবদানকে পুঁজি করে ‘বিশেষ মর্যাদা’র দাবিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ইতিহাসের সম্মান রক্ষার চেয়ে বড় কাজ হলো, বর্তমান প্রজন্মকে বিশ্বমানের শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে গড়ে তোলা। অতীতের গৌরবের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় থমকে যাবে, নতুন উচ্চতা অর্জন করবে না।

অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘বিশেষ মর্যাদা’ দেওয়া হলে, তা শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য সৃষ্টি করে। একই দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা নিজেদের অবহেলিত বোধ করতে পারেন। শিক্ষার ক্ষেত্রে সমতা ও ন্যায্যতা রক্ষার নীতির বিরুদ্ধাচরণ হবে এটি। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় যেমন রাজশাহী, চট্টগ্রাম বা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা করে মর্যাদা দেওয়া মানে, অপ্রয়োজনীয় বিভাজন ও প্রতিযোগিতা উসকে দেওয়া। শিক্ষার জগতে প্রতিযোগিতা প্রয়োজন, কিন্তু সেটা হবে গবেষণা ও জ্ঞানের মানের ভিত্তিতে, নট প্রশাসনিক স্বীকৃতি বা ‘বিশেষ’ তকমা দিয়ে।

এছাড়া, ‘বিশেষ মর্যাদা’ সরকারের পক্ষ থেকে এলে তা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। এমনিতেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘বিশেষ মর্যাদা’ দিলে সেই বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির কাছে ‘বিশেষ’ হয়ে উঠতে পারে—যা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও শিক্ষা কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাবকে আরও পাকাপোক্ত করার একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলোও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়—বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা সরকারি ঘোষণায় আসে না। যুক্তরাষ্ট্রে বা ইউরোপের অনেক দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মর্যাদা নির্ধারিত হয় গবেষণার উৎকর্ষ, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সমাজে ইতিবাচক প্রভাবের ভিত্তিতে। হার্ভার্ডের ‘বিশেষ মর্যাদা’ সরকার দেয়নি, দিয়েছে তার গবেষণার মান আর সমাজে প্রভাব। তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও, যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘বিশেষ’ হতে হলে, তাকে নিজস্ব শক্তির মাধ্যমে তা অর্জন করতে হবে।

প্রকৃতপক্ষে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় ‘বিশেষ’ হয়ে ওঠে যখন তা সমাজে আলোড়ন তোলে, নতুন চিন্তার দ্বার উন্মুক্ত করে, এবং নিত্যনতুন সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করে। ঢাবি বা দেশের যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যদি সত্যিকার অর্থে ‘বিশেষ’ হতে চায়, তবে তাকে এই কাজগুলোতে মনোনিবেশ করতে হবে। নিজেদের গবেষণা-প্রকল্পকে আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে, ছাত্রছাত্রীদেরকে সমালোচনামূলক ও সৃজনশীল ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। স্বনির্ভরতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং উদ্ভাবনী শিক্ষার মডেলই একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘বিশেষ’ করে তোলে।

একইসঙ্গে, সরকার বা রাষ্ট্রের করণীয় হলো—বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার নামে রাজনৈতিক শংসাপত্র বিলি না করে, বরং সুষ্ঠু অর্থায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় যাতে তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা ও সক্ষমতা বিকশিত করতে পারে, সেটাই সরকারের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত গৌরব আমাদের প্রেরণা। তবে এখন সময় এসেছে অতীতের গৌরবের বাইরেও নিজেদের প্রমাণ করার। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত, বিশেষ মর্যাদা চাওয়ার বদলে নিজেদেরকে ‘বিশেষ’ প্রমাণে নিবেদিত হওয়া। গবেষণায় বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পাঠদানের গুণগত মান বৃদ্ধি—এসবই প্রকৃত মর্যাদা এনে দিতে পারে। আর তখন, দেশের জনগণই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘বিশেষ’ মর্যাদা দিতে বাধ্য হবে।

শেষ কথা—বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘বিশেষ’ হতে হয়, ‘বিশেষ’ দাবি করে নয়। সম্মান ও মর্যাদা অর্জনের পথ কখনোই প্রশাসনিক পদক্ষেপ দিয়ে হয় না। সেটি আসে জ্ঞান-সৃষ্টির ক্ষমতা দিয়ে। তাই বিশেষ মর্যাদার দাবি না তুলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের শক্তিতেই নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে। দেশবাসী ও বিশ্বের কাছে তখন স্বীকৃতি আপনাতেই আসবে।

লেখক: 
ড. মোর্ত্তুজা আহমেদ 
সহযোগী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। 

প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ফেনীর ৬২ প্রাথমিক বিদ্যালয়, দায়িত্…
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আসামি ধরতে গিয়ে হামলার শিকার পুলিশ, এসআইসহ আহত ৪
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিদ্যালয়ে আনা শিক্ষার্থীর আইফোন ভাঙলেন শিক্ষক
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নারী খেলোয়াড়দের উত্ত্যক্ত, প্রতিবাদ করার হামলা— যুবক আটক
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
‘তুই ফ্যাসিস্ট, ১৩ লক্ষ টাকা চাঁদা দে, না হয় এলাকা ছাড়’
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
টঙ্গীতে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় স্কুলছাত্র নিহত
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
FALL 2026
Application Deadline Wednesday, 16 Sept 2026
Apply Now

Admission Test Schedule

  • Test Date: Friday, 18 Sept 2026
  • Written Exam: 10:00 – 11:00 AM
  • Oral Viva: 11:30 AM onwards

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9