বাংলাকে উপেক্ষা করে ভিনদেশী ভাষার চর্চা নয়

০২ মার্চ ২০১৯, ১০:৪২ PM
ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া

ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া

ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছর পূর্ণ হলো। ৫২র ফাল্গুনে বাংলার ভাষাসৈনিকেরা মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের জন্য যে আত্মত্যাগ করেছিলো সেই আত্মত্যাগের সম্মান করছে সমগ্র বিশ্ব। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের মাধ্যমে দিনটিতে বিশ্ববাসী তাদের নিজ নিজ মাতৃভাষার প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশের পাশাপাশি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে সেইসব ভাষা শহীদদের, যাদের কাছে প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয় ছিলো তাদের মাতৃভাষা। কিন্তু যাদের আত্মত্যাগে বিশ্ববাসী নতুনভাবে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা উপলব্ধি করলো আমরা সেই বাংলাদেশীরা কতটা সম্মান করছি, ভালোবাসছি বাংলা ভাষাকে? কিংবা আদৌ কোনো সম্মান ভালোবাসা রয়েছে কি আমাদের বাংলা ভাষার প্রতি?

ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যে এখনো শহীদ মিনারে মানুষের ঢল নামে। কিন্তু কথা বলার ক্ষেত্রে আমরা বর্তমান বাঙালী তরুণ প্রজন্ম বেছে নেই বাংলা, ইংরেজি আর হিন্দির সংমিশ্রণে অদ্ভুত এক জগাখিচুড়ি‎ ভাষাকে। আমাদের পাঁচ শব্দের একটা বাক্যে তিনটি থাকে ইংরেজি শব্দ, একটি থাকে হিন্দি আর অবশিষ্ট একটি শব্দ থাকে বাংলা। এই প্রজন্মের কাছে শুদ্ধ বাংলা বলতে পারার থেকে বাংলা বলতে না পারাটা অধিক গর্বের। বর্তমান বাঙালী শিশুরা মা’র স্থলে মাম্মাম ডাকতে বেশি অভ্যস্ত, এ বছরে ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছর পূর্ণ হলো। ৫২র ফাল্গুনে বাংলার ভাষাসৈনিকেরা মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের জন্য যে আত্মত্যাগ করেছিলো সেই আত্মত্যাগের সম্মান করছে সমগ্র বিশ্ব। প্রতিবছর একুশে...র বাচ্চাটি ধন্যবাদ শব্দটি জানার পূর্বে পরিচিত হয় ইংরেজি শব্দ থ্যাংক ইউর সাথে।

সন্তানের ইংরেজি বলতে না পারাটা আমাদের বাঙালী বাবা মাকে যতটা চিন্তিত করে তোলে সন্তানের সঠিকভাবে বাংলা বলতে না পারাটা তার এক দশমাংশ চিন্তাও সৃষ্টি করেনা। বর্তমান বাঙালী মায়েরা তাদের বাচ্চাদের ঐ দেখা যায় ‘চাদঁ মামা’ ছড়া শোনানোর থেকে ‘টুইংকেল টুইংকেল লিটল স্টার’ শোনাতে বেশি পছন্দ করেন। বাচ্চাদের মুখে ‘আয়রে আয় টিয়ে’ ছড়ার তুলনায় ‘জনি জনি ইয়েস পাপা’ আমাদের কাছে অধিক সুমধুর মনে হয়।

শুধুমাত্র প্রাত্যাহিক কথাবার্তাই নয় আমাদের বিনোদন জগতটাও সম্পূর্ণ বিদেশী শিল্পীদের দখলে বলা চলে। বিদেশী শিল্পীদের সকল তথ্য আমাদের আত্মস্থ থাকলেও বাঙালী বিখ্যাত শিল্পীদের অনেকের নামই আমাদের অজানা। এমনকি যেই ভাষা শহীদরা বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছিলো তাদের স্মরণসভাতেও আজকাল শোনা যায় হিন্দি গান। ৫২তে বাঙালীর ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিলো তৎকালীন পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠী। আর একুশ শতকে এসে বাংলা ভাষাকে কেড়ে নিচ্ছে আমাদের আধুনিকতার মুখোশধারী অনুকরণপ্রিয় মানসিকতা।

বিজ্ঞান বলে প্রতিটি মানুষের জিনোমের মাঝে তার পূর্বপুরষের সকল বৈশিষ্ট্য নিহিত থাকে। পারিপার্শিক প্রভাবে কিছু জিনের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। যা তার স্বভাব চরিত্র নির্ধারণ করে আর কিছু জিনের বৈশিষ্ট্য সুপ্ত থাকে। দীর্ঘ দুইশত বছর ব্রিটিশ শাষিত তৎকালীন কিছু কিছু বাঙালীর মাঝে আধুনিকতার সংজ্ঞা হিসেবে ইংরেজ তথা অন্যদের অনুকরণের যে মানসিকতা গড়ে উঠেছিলো তা হয়তো জিনগত পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে একুশ শতকের বাঙালীর মধ্যে প্রবলভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। তাই আমরা নিজেদের ভাষা সংস্কৃতি ত্যাগ করে ভিনদেশী ভাষা আর সংস্কৃতি রপ্ত করার চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছি। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে প্রানের ভাষা বাংলা ভবিষ্যতে হয়তো কেবল ইতিহাসের পাতাতেই স্থান পাবে।

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে পৃথিবী মানুষের হাতের মুঠোই এসে গেছে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সাথে সহজেই যোগাযোগ গড়ে উঠেছে। এর পাশাপাশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে তাই আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজীসহ অন্যান্য ভাষার চর্চা অত্যাবশক। তবে তা নিজের ভাষাকে উপেক্ষা করে নয়। পৃথিবীতে আজকে আমরা যাদের উন্নত জাতি বলছি, তারা কেউই তাদের ভাষা কিংবা সংস্কৃতি ত্যাগ করে উন্নত জাতিতে পরিণত হয়নি। আমাদেরও উন্নত জাতিতে পরিণত হতে হলে বাঙালী ঐতিহ্য সংস্কৃতিকে ধারণ করেই উন্নত হতে হবে। আর তার জন্য আমাদের ক্রোমোজোমে সুপ্ত সেই সাহসী বাঙালীদের জিনসমূহের পুনর্জাগরণ প্রয়োজন।

যারা সর্বদা আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আকড়ে ধরে উন্নতি সাধনের চেষ্টা করেছিলেন। এই পুনর্জাগরণের জন্য প্রয়োজন আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তন। আর এ পরিবর্তনের দায়িত্বটি নিতে হবে আমাদের সরকার এবং রাষ্ট্রের সুশীল ব্যক্তিবর্গসহ সাধারণ মানুষ সকলের। তরুণ সমাজকে বোঝাতে হবে বাংলা ভাষা আমাদের অস্তিত্ব— এ ভাষা আমাদের আত্মপরিচয় বহন করে। নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে কখনো উন্নতি সম্ভব নয়। আধুনিকতা বা উন্নয়ন মানে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি ত্যাগ নয় বরং নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করে তুলতে পারাই আধুনিকতা। শিক্ষার প্রতিটি ধাপে শুদ্ধ বাংলা ভাষা চর্চার উপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। একজন শিশু যেনো তার শৈশব থেকেই উপলব্ধি করতে পারে, বাংলা কেবল আমাদের মাতৃভাষা নয় বাংলা ভাষা আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার।

ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।
ই-মেইল: annymony@gmail.com

হাদি হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে: পরর…
  • ০৩ জানুয়ারি ২০২৬
‎হবিগঞ্জের চার আসনে ১০ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল, বৈধ ১৯
  • ০৩ জানুয়ারি ২০২৬
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে এহসানুল হুদার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা
  • ০৩ জানুয়ারি ২০২৬
ডিসেম্বরে সম্পাদনার শীর্ষে হাদি, দ্বিতীয় খালেদা জিয়া, কী আছ…
  • ০৩ জানুয়ারি ২০২৬
ময়মনসিংহ-৭ আসনে বিএনপি প্রার্থীসহ ৬ জনের মনোনয়ন বাতিল
  • ০৩ জানুয়ারি ২০২৬
মোস্তাফিজের ছবি ফেসবুক পেজ থেকে মুছে দিল কেকেআর
  • ০৩ জানুয়ারি ২০২৬
X
APPLY
NOW!